কবি নজরুলকে বাংলাদেশের সকল পর্যায়ের মানুষই চেনেন। কারণ তার কবিসত্তা এবং গান-কবিতা ও অন্য সব সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষও কিছু-না-কিছু ধারণা রাখেন। হয়তো নজরুলবোদ্ধা নজরুল গবেষক, নজরুল বিশেষজ্ঞ, নজরুলপ্রেমী ছাড়া ভেতরের নজরুলকে অনেকে বুঝতে পারেন না। আর সেভাবে জানতে বা চিনতে হলে নজরুল সাহিত্য পড়তে হবে। থাকতে হবে নজরুল অনুরাগ। কি ধর্মনিরপেক্ষতা, কি সাম্যবাদ, কি দ্রোহ, কি প্রেম, কি বিরহ, কি সৌখিনতা—কী নেই নজরুল সাহিত্যে? বরং আশ্চর্যই হতে হয় তার এসব অমর সৃষ্টি দেখে। কারণ তার সক্রিয় সাহিত্য রচনাকাল ছিল সর্বোচ্চ ২৫ বছর। যতই নজরুল সাহিত্য পড়া যায় মনে হয় যেন তাকে আবার নতুনভাবে আবিষ্কার করা হলো। এই যে এত সব সাহিত্যকর্ম বিভিন্ন ভাষা ব্যবহার করে, বিভিন্ন ধর্মকে উপলক্ষ্য করে, বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতিকে বিবেচনায় নিয়ে করেছেন তা সে সব দেশ, ভাষা, সংস্কৃতির কাছে অবশ্যই নিয়ে যেতে হবে।
আশার কথা, কবির নামে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহে নজরুল গবেষণা বেগবান করা হচ্ছে। নজরুল গবেষণা যাতে আরো বেশি বেগবান হয়, সেজন্য সেখানে ‘ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ’ নামে ডেডিকেটেড একটি নজরুল গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সেখানে নজরুলের ওপর সার্টিফিকেট কোর্স, ডিপ্লোমা কোর্স, মাস্টার্স, এমফিল, পিএইচডি ইত্যাদি বিভিন্ন গবেষণামূলক ডিগ্রি অফারের প্রক্রিয়া কোনোটা চলমান আবার কোনোটা সামনে চালুর প্রক্রিয়াকরণ করা হচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরুল গবেষণার এক পথিকৃত্ প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। আর এর মাধ্যমেই নজরুলকে বহির্বিশ্বে পরিচিত করার সুযোগ রয়েছে।
নজরুলকে বহির্বিশ্বে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন নজরুল গবেষণা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করা। সেসব চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রথমে নজরুল সাহিত্যকে অনুবাদের ব্যবস্হা করা। কোনো সাহিত্যকর্মকে অনুবাদ করলেই তা বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের কাছে বোধগম্য হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিশ্বকবি খ্যাত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যদি তার গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রম্হটি ‘দ্য সং অব অফারিংস’ নামে ইংরেজিতে অনুবাদ না করতেন এবং ব্রিটিশ লেখক ডব্লিউ বি ইয়েটস যদি ইংরেজিতে এর ভূমিকা না লিখতেন, তাহলে হয়তো তিনি নোবেল পুরস্কার নাও পেতে পারতেন। কাজেই ইংরেজি একটি প্রমাণ আন্তর্জাতিক ভাষা হওয়ার কারণে এবং সেটি ইংরেজিতেই অনূদিত হওয়ার জন্য বাংলা সাহিত্যের এমন বিশ্ব স্বীকৃতি ও সমৃদ্ধি ঘটেছে।
কবি নজরুল নিজে অনেক বিদেশি ভাষার সাহিত্যকর্ম বাংলায় অনুবাদ করেছেন। কাজেই নজরুলকে আমরা যারা ভালোবাসি, নজরুলকে আমরা যারা শুধু বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে বিশ্ব পরিমণ্ডলে পরিচিত করতে চাই তাদের প্রথম ও প্রধান কাজ হলো নজরুল সাহিত্যকে বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করা এবং সেটি যাতে সহজেই হতে পারে তারও ব্যবস্হা নেওয়া। নজরুলকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক চুক্তি (গবসড়ত্ধহফঁস ড়ভ টহফবত্ংঃধহফরহম-গঙট) স্বাক্ষর করেছি আমরা। তার একটি হলো ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্ধমান জেলার কবিতীর্থ খ্যাত আসানসোলে কবির জন্মস্হানে স্হাপিত ‘কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়’-এর সঙ্গে, অপরটি হলো নজরুলের সাহিত্যে বহুবার আসা কবি ফেরদৌসি ও সিরাজীর দেশ ইরানের কবি ফেরদৌসির নামে প্রতিষ্ঠিত ‘ফেরদৌসি ইউনিভার্সিটি অব মাশাদ’-এর সঙ্গে। এসব চুক্তির প্রধানতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে শুধু কবি নজরুলকে তাদের দেশ ও ভাষাতে তুলে ধরা। অপর দিকে আরো দুটি বিভাগের কাজের সঙ্গেও আন্তর্জাতিক দুটি সমঝোতা স্মারক চুক্তি হয়েছে। সে দুটির একটি হলো এ বিশ্বদ্যিালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সঙ্গে চীনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং আরেকটি হলো চারুকলা বিভাগের সঙ্গে মালয়েশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের।
এছাড়া ইতিমধ্যে সৌদি আরবের একটি বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় যার র্যাংকিং বিশ্বের প্রথম সারির দিকে সেটি ‘কিং আব্দুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়’। এ বিশ্ববিদ্যালয় কতৃর্পক্ষ সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে আমাদের জাতীয় কবির ইসলামি গান ও গজল অনুবাদ করে তাদের দেশ-উপযোগী হিসেবে তা সেখানে ছড়িয়ে দেওয়ার আগ্রহ ব্যক্ত করেছে। নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় কতৃর্পক্ষ উক্ত আগ্রহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে সম্মতি জানিয়ে রেখেছে। এভাবে কবি নজরুলের আন্তর্জাতিকীকরণ করা হচ্ছে। তাছাড়া আরো নানা উপায়ে আমরা কবি নজরুলকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে পারি।
