সকল সমস্যার মূলে শিক্ষার অভাব এবং আর্থিক অক্ষমতা

আপডেট : ৩০ মে ২০২২, ১০:০৪

বিশ্বব্যাপী নানা প্রতিকূলতায় কর্মসংস্থানের ক্রমসংকোচনের কারণে উপার্জন নিম্নমুখী হইয়া গিয়াছে। জনজীবনে নামিয়া আসিয়াছে স্থবিরতা, অস্থিরতা। পরিস্থিতির সঙ্গে মানাইয়া লইতে দৈনন্দিন পণ্যসামগ্রী ক্রয়ের ক্ষেত্রে সস্তায় খঁুজিবার প্রবণতা আজ সর্বত্রই দৃশ্যমান। বলা হইয়া থাকে, সস্তার তিন অবস্থা। উন্নয়নশীল বিশ্বে দেখা যায়, শিক্ষার অভাব এবং আর্থিক অসংগতি। এই দুইয়ের বাইপ্রডাক্ট হিসাবে নিম্নমানের পণ্য সস্তায় ক্রয়ের প্রবণতা দেখা যায়। ইহা বহুকালের সমস্যা। আর এই সুযোগটিকেই কাজে লাগাইয়া থাকেন ‘চতুর’ কিছু মানুষ। তাহারা অবৈধ ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ ভেজাল-নকল ঔষধের রমরমা কারবার করেন। আর্থিকভাবে দুর্বল ও অশিক্ষিত মানুষের মাথায় কাঁঠাল ভাঙিয়া খান তাহারা। সহজপ্রাপ্য বিধায় অশিক্ষিত ও নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ এই সস্তা ঔষধ ক্রয় করিতেছেন অবলীলায়। অর্থাত্, নকল ঔষধ বিষ হইয়া প্রবেশ করিতেছে মানবশরীরে। নব্বইয়ের দশকে ফ্ল্যামোডল নামক প্যারাসিটামল সিরাপ সেবনে ৭৬ জন শিশুর মর্মান্িতক মৃতু্য হয়। ২০০৯ সালে রিড ফার্মার তৈরি প্যারাসিটামল সিরাপ সেবনে মারা যায় ২৮ শিশু। নকল ঔষধের দৌরাত্ম্য শুধু এই দেশেই নয়, ব্রিটেন, আমেরিকার মতো উন্নত দেশেও নকল ঔষধের ঘটনা দেখা যায়। ২০০৭ সালে নকল হেপারিন সেবনে যুক্তরাষ্ট্রে ১৪৯ জনের প্রাণহানি ঘটে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, ভেজাল, নকল ও নিম্নমানের ঔষধ সেবনের ফলে ২০১০ সালে বিশ্বে ৬ লাখ ৫৫ হাজার লোক মারা গিয়াছে। তবে উন্নত বিশ্বের নাগরিকরা উন্নয়নশীল বিশ্বের তুলনায় অনেক বেশি শিক্ষিত ও সচেতন এবং আইনের প্রয়োগও সেই সকল দেশে অনেক বেশি ঘটে বিধায় তাহাদের দেশের মানুষের মাথায় কাঁঠাল ভাঙিয়া খাওয়া খুব সহজ নহে।

ঔষধশিল্পে বাংলাদেশ বেশ সমৃদ্ধ। ৯৮ শতাংশ স্থানীয় চাহিদা পূরণের পর বিশ্বের ১৫০টি দেশে বাংলাদেশ ঔষধ রপ্তানি করিতেছে। বিদেশের মাটিতে এই দেশের ঔষধ সুনাম অর্জন করিতে পারিলেও দেশের বাজারগুলিতে নকল ঔষধ স্থায়ী আসন পাতিয়া বসিয়াছে। নকল ঔষধের কারখানাগুলি যুগ যুগ ধরিয়া চলিতেছে বটে, তবে নকল ঔষধ রোগমুক্তির পরিবর্তে রোগের কারণ হইয়া উঠিতেছে। প্রশ্ন উঠিতে পারে, জনগণ কম টাকায় নিম্নমানের ঔষধ কিনিতেছেন কেন? এই ক্ষেত্রে একটি যুক্তি প্রণিধানযোগ্য। মোটা দাগে দুইটি কারণ আমরা আগেই বলিয়াছি—শিক্ষার অভাব এবং আর্থিক অক্ষমতা। মূলত, অশিক্ষিত মানুষ জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে এই সত্য বুঝিতে পারেন না যে স্বল্পমূল্যের মেডিসিনের পিছনে অন্য কারণ থাকিতে পারে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পিছনের সত্যটা জানিবার পরও অর্থের অভাবে নিম্নমূল্যের ঔষধে পরিত্রাণ খঁুজিবার বৃথা চেষ্টা চালান অনেকে।

দেশে ভেজাল-নকল ঔষধের উৎপাদন-বিপণন বন্ধে বিভিন্ন সময় নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হইয়াছে সত্য, তবে ধারাবাহিকতা বজায় রাখিতে না পারিবার কারণে ঔষধ প্রস্ত্ততকারী অসাধু ব্যবসায়ীদের মূলোত্পাটন সম্ভবপর হয় নাই। সম্প্রতি দেশব্যাপী অনিবন্ধিত ক্লিনিক, নার্সিংহোম বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে দেখা যাইতেছে। এই উদ্যোগের সফল ধারাবাহিকতা বজায় রাখিবার পাশাপাশি নকল ঔষধ তৈরির কারখানাগুলির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ অনিবার্য হইয়া উঠিয়াছে। শুধু ঔষধ নহে, উৎপাদনমুখী প্রতিটি সেক্টরে ভেজালবিরোধী নিয়মিত অভিযান সময়ের দাবি। অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট নিশ্চিহ্নে ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি জনগণকে সতর্ক করিবার বিষয়টি লইয়াও ভাবিতে হইবে। এই ক্ষেত্রে ব্যক্তি সচেতনতার উপর গুরুত্বারোপ অধিক ফলপ্রসূ হইতে পারে। তবে এটা স্মরণে রাখিতে হইবে, যে পর্যন্ত না মানুষ সচেতন হইতেছে, শিক্ষিত হইয়া উঠিতেছে—সেই অবধি এই সমস্যা দূরীভূত হইবার সম্ভাবনা ক্ষীণ। দারিদ্রে্যর বেড়াজাল ছিন্ন করিয়া শিক্ষার আলোয় আলোকিত হইয়া উঠিতে পারিলে মানুষ আসল-নকলের তফাত বুঝিতে পারিবে। সস্তায় পণ্য মিলিবার আড়ালের ঘটনার কারণানুসন্ধান করিতে পারিবে আপনা হইতেই। স্বভাবতই তখন স্বল্পমূল্যে মানহীন পণ্যের পরিবর্তে নিয়মিত-ন্যাঘ্যমূল্যে গুণমানসম্পন্ন পণ্য খঁুজিবেন। আর্থিক অসংগতির ইতি ঘটাইয়া শিক্ষার আলোর বেসাতি ছড়াইয়া সেই পরিস্থিতিকাল সৃষ্টি করিতে কতটা সময় লাগিবে—নিশ্চিত করিয়া বলিতে পারা মুশকিল।

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন