পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায়—

আপডেট : ৩১ মে ২০২২, ১০:৩২

আজ বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২২ সালে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে— ‘তামাকমুক্ত পরিবেশ, সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এর যথার্থতা রয়েছে এবং প্রতিপাদ্যটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। কারণ, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা বিশ্বব্যাপী বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় আলোচ্য বিষয়। জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় বৈশ্বিকভাবে ঐকমত্য গড়ে তোলা হচ্ছে। ভুক্তভোগী এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশও রয়েছে।

বাংলাদেশে ১৯৮৮ সালে তামাকমুক্ত দিবসটি সীমিত পরিসরে উদ্যাপন শুরু হয়। তবে ১৯৯০ সালের পর থেকে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর উদ্যোগে দিবসটি ব্যাপক পরিসরে উদ্যাপন এবং তামাকের বিরুদ্ধে সামাজিক এই আন্দোলনটি গতিশীল হয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে।

২০০৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে জেনেভায় অনুষ্ঠিত এক স্বাস্থ্য সম্মেলনে বাংলাদেশ তামাকের নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক চুক্তি ‘ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল— এফসিটিসি’তে প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে স্বাক্ষর করে এবং ২০০৪ সালে পুনরায় র্যাটিফাই করে। মূলত, এর পরেই দেশে তামাক নিয়ন্ত্রণের ভিত্তি স্থাপিত হয়। কারণ, ‘এফসিটিসি’র আলোকেই দেশে তামাকবিরোধীদের প্রধান অস্ত্র ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ)’ প্রণীত হয় ২০০৫ সালে। তামাকের বহুমাত্রিক ক্ষয়ক্ষতি রোধে বর্তমান সরকারের উদ্যোগে আইনটি অধিকতর শক্তিশালী করতে ২০১৩ সালে সংশোধনী পাশ করে মহান জাতীয় সংসদ। ২০১৫ সালে বিধিমালা প্রণীত হয়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে তামাকজাত দ্রব্যে ১ শতাংশ হারে স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ আরোপ ও ২০১৭ সালে এসংক্রান্ত নীতি প্রণয়ন, জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে ২০১৬ সাল থেকে তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে তামাক ব্যবহারের ক্ষতিসংবলিত ছবিসহ স্বাস্থ্য সতর্কবাণী প্রচলন করা হয়। তাছাড়া সপ্তম এবং বর্তমানে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাতেও তামাক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি অন্তভু‌র্ক্ত করা হয়েছে। এমন আরো কিছু উল্লেখযোগ্য অর্জন রয়েছে।

জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষা এবং সার্বিক উন্নয়নে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো ‘তামাক’। এ কথা সর্বমহলে স্বীকৃত। তামাক চাষে প্রচুর সার ও কীটনাশক ব্যবহূত হয়, যা মাটি ও পানিদূষণ করে এবং মাছসহ জলাশয়ের উদ্ভিদচক্রের মারাত্মক ক্ষতি করে। উদাহরণ হিসেবে দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র হালদা নদীর কথা বলা যায়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে দেখা যায়, নদীর উত্পত্তিস্থল খাগড়াছড়ি জেলার রামগড়, মানিকছড়ি ও নদীর তীরসংলগ্ন পাহাড়ের ধারে দীর্ঘদিন ধরে তামাক চাষের কারণে তামাকের নির্যাস ও চাষে ব্যবহূত সার এবং রাসায়নিক মিশ্রিত পানি সরাসরি গিয়ে পড়ছে নদীতে। এতে হালদার পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। তামাক চাষের জমি তৈরিতে প্রচুর বনাঞ্চল ধ্বংস করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, ১৯৭০ সাল থেকে তামাকের কারণে বিশ্বব্যাপী (গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে) আনুমানিক ১.৫ বিলিয়ন হেক্টর বন বিলুপ্ত হয়ে গেছে, যা ২০ শতাংশ বার্ষিক গ্রিনহাউজ গ্যাস বৃদ্ধির কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে! তামাক পাতা প্রক্রিয়াজাত করতে চুল্লিতে প্রচুর পরিমাণে কাঠ পোড়ানো হয়। ৩০০টি সিগারেট তৈরি করতে প্রায় একটি সম্পূর্ণ গাছ প্রয়োজন হয়!

উল্লেখ্য, জেনেভায় অনুষ্ঠিত এফসিটিসির কনফারেন্স অব দ্য পার্টিসে (কপ-৮) বিশেষভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, উক্ত চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো অবিলম্বে তামাক চাষ নিরুত্সাহিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

করোনার চাইতে তামাকের কারণে মৃতু্যহার এবং অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি বেশি, অনেক বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বাংলাদেশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। এদিকে বিশ্বের শীর্ষ ১০টির মধ্যে একটি অধিক তামাক ব্যবহারকারী জনগণের দেশও ‘বাংলাদেশ’। সুতরাং জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর তামাক নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নেই। তামাক কোম্পানিগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার সময় এসেছে। পরিবেশ সুরক্ষার দোহাই দিয়ে প্রবাহ, সামাজিক বনায়নের নামে লোক দেখানো নাটক বন্ধ করতে হবে। তামাকের কারণে পরিবেশ ও জনস্বাস্থে্যর যে অপূরণীয় ক্ষতির চিত্র এবং তামাক কোম্পানির কালো মুখোশ জনসম্মুখে উন্মোচন এবং তার জন্য জবাবদিহি ও ক্ষতিপূরণ দাবি করতে হবে। এজন্য সরকারের নীতিগত অবস্থান আরো সুদৃঢ় করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রক্রিয়াধীন আইন ও নীতিসমূহ দ্রুত পাশ এবং এফসিটিসিসির আলোকে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনটি আরো শক্তিশালী ও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। সর্বোপরি তামাক কোম্পানির সঙ্গে সব অংশীদারিত্ব বর্জন করতে হবে। বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। উন্নয়নের এই অগ্রগতিকে অব্যাহত রাখতে তামাকের আগ্রাসন থেকে আগামী প্রজন্ম, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ রক্ষার বিকল্প নেই।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা (মানস)

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন