আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী: মর্ত্য থেকে অমর্ত্যে

আপডেট : ০১ জুন ২০২২, ০৮:৪৬

দেশের মাটিতেই সমাহিত হলেন তিনি। তার সময়ের তিনিই বোধহয় শেষ কলমযোদ্ধা, যার পরে নিয়মিত কলমযোদ্ধা হয়ে আর কেউ-ই বোধ হয় ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রইলেন না! আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী নিজেই কলাম-সাংবাদিকতায় এক ইতিহাস সৃষ্টি করে গেলেন।

কিডনি জটিলতায় চার বার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। শেষে সেখান থেকে ফিরে ২৮ নভেম্বর, রবিবার, ২০২১ ইত্তেফাকে তিনি লিখেছেন, ‘দুজন ডাক্তারই তাকে জানিয়েছেন দুটি কিডনিই তার বিকল, আর বড়জোর সাত মাস বাঁচতে পারি।’ ডাক্তারদের ভবিষ্যদ্বাণী তিনি মিথ্যা প্রমাণ না করেই গেলেন। তবে যাওয়ার আগে তার সেজো মেয়ে বিনীতার ১৩ এপ্রিল ২০২২, অকালপ্রয়াণের শোক তাকে সয়ে যেতে হলো! পিতার সামনে সন্তানের মৃতু্য সত্যি নিদারুণ দুঃখ ও দুর্ভাগ্যজনকই বটে!

তার অগণিত সাড়াজাগানো কলাম পড়ে বিস্ময়-বিমুগ্ধ চিত্তে ভেবেছি, এত তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন, এত অনুপুঙ্খ ঘটনার গভীর বিশ্লেষণ তিনি কীভাবে দেন! অতীত উদাহরণ তুলে এনে বর্তমানের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে কী করে পালটা যুক্তি খণ্ডন করেন! তিনি যে জাতিস্মর—এ বিষয়ে তাই দ্বিমত একদমই কম।

খবর পাচ্ছিলাম, বেশ কিছু দিন থেকে তিনি অসুস্হ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। কিন্তু এ যাত্রায় তার আর ভালো হওয়া, মানে শেষ রক্ষা হলো না। পাড়ি জমালেন মর্ত্য থেকে অমর্তে্য। গেল ১২ ডিসেম্বর, ২০২১ ছিল তার ৮৭তম জন্মদিন। সন্দেহ নেই, দিনটি তার কাছে কিছুটা ব্যতিক্রমই ছিল। কারণ তিনি তো জানতেন—এ-ই তো শেষ জন্মদিন!

কালপুরুষ তিনি। প্রায় ৮৮ বছর বেঁচেছেন! সন্দেহ নেই সাংবাদিকতার ইতিহাসে এপার-ওপার দুই বাংলায় তো বটেই; গোটা বিশ্বেই এমন আয়ুর বরপুত্র কমই আছেন। তার চেয়েও বড় কথা, এর মধ্যে তার তো আবার সাহিত্য-সাংবাদিকতার জীবনই ৭৫ বছরের!

অষ্টম শ্রেণির ছাত্রাবস্থায়ই তিনি ‘বরিশাল হিতৈষী’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন। পিতৃবন্ধু শ্রী দুর্গামোহন সেনের কাছেই তার সাংবাদিকতার হাতে খড়ি। বরিশাল হিতৈষী পত্রিকা দিয়ে শুরু; এরপর দৈনিক ইনসাফ, সংবাদ, মাসিক সওগাত, নকীব, দিলরুবা, দৈনিক ইত্তেফাক, মেঘনা, চাবুক, দৈনিক আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী, দৈনিক জেহাদ, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা, দৈনিক আওয়াজ, দৈনিক পূর্ব দেশ, জয়বাংলা, বাংলার বাণী ছাড়াও প্রবাসজীবনে বাংলার ডাক, নতুন দিন, পূর্ব দেশ, জাগরণ ইত্যাদি পত্রিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। এর বাইরে তিনি কলাম লিখেছেন দৈনিক ইত্তেফাক, আজকের কাগজ, জনকণ্ঠ, প্রথম আলো, ভোরের কাগজ, যুগান্তর, সমকাল, ডেসটিনি, কালের কণ্ঠ, স্টেটসম্যান, ইনডিপেনডেন্ট, সাপ্তাহিক যায়যায়দিন, বিচিত্রা, মৃদুভাষণসহ আরো বেশ কিছু পত্রিকায়। তার কলম চলেছে কালের মতোই নিরবধি।

লেখালেখি ছাড়া তার জীবনে আর অন্য কর্ম ছিল না। তবে হ্যাঁ, ছাত্রজীবনে রাজনীতি শেষে সংসারধর্ম পালন করেছেন সত্য; তবে তা সাংবাদিকতা ও লেখালেখির ধর্মকে বাদ দিয়ে একদমই নয়। ভেবে বিস্মিত হই, একজন মানুষ গোটা জীবনই কীভাবে লেখালেখিতে কাটিয়েছেন এবং সংবাদপত্রের সঙ্গেই থেকেছেন! কী এক আশ্চর্য ক্ষমতা ও নেশা ছিল তার। কলাম লেখার সংখ্যায় তো ছিলেন বিশ্বে এক জীবন্ত কিংবদন্িত! মানি আর না মানি, তিনি এ ক্ষেত্রে এক অপার বিস্ময়। এক জীবনে তিনি যশ-খ্যাতি, অর্থ-বিত্ত, প্রভাব-পরিচিতি, স্বীকৃতি-সম্মান, পদক পুরস্কার— সবই পেয়েছেন এবং নিজের পেশাজীবন উপভোগও করেছেন। আবার আলোচনা-সমালোচনা, নিন্দা-প্রশংসা সবই কুড়িয়েছেন। তাকে নিয়ে যত বিতর্ক হয়েছে, তেমনটা খুব কম সাংবাদিককে নিয়েই হয়েছে, তবে কোনো অবস্থাতেই দমে যাননি। এটাই তার সাহস, মনোবল ও বুদ্ধিমত্তা।

ঢাকা কলেজের ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্রাবস্থায় একুশে ফেব্র‚য়ারি নিয়ে তিনি যে কাঁচা হাতে পাকা গানটি লিখেছেন ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্র‚য়ারি’, সেটি ২০০৬ সালে বিবিসি বাংলার শ্রোতা জরিপে যে পাঁচটি গান সেরা বিবেচিত হয়েছে, তারই আলোকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কুড়িটি বাংলা গানের বিবিসি বাংলার তালিকায় তৃতীয় স্থান পেয়েছে, যার সুরারোপ করেছেন আলতাফ মাহমুদ। ১৯৫২ থেকে ২০২১—এত বছরেও যে গানটির আবেদন এতটুকুও ম্লান হয়নি, বরং সময়ান্তরে আরো বাড়বে বলেই মনে হচ্ছে।

আ গা চৌ সারা জীবন বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে কলম চালনা করেছেন, সশস্র মুক্তিযুদ্ধের কালে তিনি মুজিবনগর সরকারের মুখপত্র ও স্বাধীন বাংলার প্রথম পত্রিকা সাপ্তাহিক জয়বাংলার প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের তথা স্বাধীনতার সপক্ষ সরকারের অনুকূলে তার সুস্পষ্ট ও বলিষ্ঠ সমর্থন ও অবস্থান ছিল সদা বিদ্যমান।

হাজি ওয়াহেদ রেজা চৌধুরীর তিন স্ত্রীর ঘরে আট সন্তান। তিন পুত্র, পাঁচ কন্যা। আ গা চৌ তৃতীয় স্ত্রীর সন্তান। তার মায়ের নাম জহুরা খাতুন। ’৭৩ সাল থেকে লন্ডনপ্রবাসী আ গা চৌ মৃতু্যকালে এক পুত্র ও চার কন্যা রেখে গেছেন (অনুপম, তনিমা, চিন্ময়ী, বিনীতা, ইন্দিরা-- শুধু বিনীতা নেই)। সবাই ব্রিটিশ নাগরিক এবং উচ্চশিক্ষিত। তার স্ত্রী সেলিমা আফরোজ প্রয়াত হয়েছেন ২০১২ সালের ১৮ ডিসেম্বর।

পুনশ্চ : আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্র‚য়ারি’ গানটি গাওয়া হয়েছে এ অবধি বাংলাসহ ১২টি ভাষায়—মালয়, আরবি, জার্মান, নেপালি, হিন্দি, ফরাসি, স্পেনীয়, রুশ, ইংরেজি, চীন ও ইতালীয়।

লেখক: সাংবাদিক 

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন