গোটা বিশ্বে জঞ্জাল ব্যবস্থাপনা ও পুনর্ব্যবহারের গুরুত্ব বেড়ে চলেছে। ভারতের মতো জনবহুল দেশে এখনো এ ক্ষেত্রে বড় সমস্যা রয়ে গেছে। তবে বেসরকারি উদ্যোগে পরিস্থিতি বদলানোর নানা প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে দেশটিতে।
পশ্চিমা বিশ্বের সুবিধাভিত্তিক সংস্কৃতির ছাপ ভারতেও অনেক পরিবর্তন আনছে। জঞ্জালের বিশাল পরিমাণ সেই প্রবণতার অন্যতম সূচক।
ভারত আনুমানিক দৈনিক দেড় লাখ টন কঠিন বর্জ্য সৃষ্টি করে। অনেক পশ্চিমা দেশের তুলনায় সেই পরিমাণ কম হলেও ২০২৫ সালের মধ্যে সেটি দ্বিগুণ হয়ে ওঠার কথা। টক্সিক্স লিংক সংগঠনের সতীশ সিনহা বলেন, ‘‘পরিমাণ বেড়েই চলেছে। প্রতি বছর আমরা নতুন ধরনের বর্জ্য যোগ করছি। ফলে জঞ্জালের উপাদানও বদলে চলেছে। ব্যাটারি, সিএফএল বাতির মতো বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো আলাদা পদ্ধতি আমাদের নেই। তাই মানুষকে উৎস অনুযায়ী বর্জ্য আলাদা করতে বাধ্য করা বা উৎসাহ দেওয়ার নানা উপায় খোঁজা হচ্ছে।''
‘সোর্স সেগ্রিগেশন'-এর অর্থ, সবার আগে শক্ত ও তরল বর্জ্য আলাদা করে সংগ্রহ করা। ভারতের শহরগুলিতে সেটা এত কম করা হয় বলে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে ভারতের পৌর স্তরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের অগ্রাধিকার স্থির করা আছে। তহবিলের সিংহভাগই শুধু বর্জ্য সংগ্রহ ও পরিবহণে ব্যয় হয়। ফলে ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য সামান্য অর্থ অবশিষ্ট থাকে।
যে সব শিল্পশাখা বিশাল পরিমাণ বর্জ্য সৃষ্টি করে, বলিউডও তার অন্যতম। সেট তৈরি থেকে শুরু করে অনেক মানুষের জন্য ক্যাটারিং সার্ভিস দৈনিক তিনবার খাদ্য সরবরাহের কারণে জঞ্জাল জমে যায়। সাধারণত সেগুলি ভাগাড়ে ফেলে দেওয়া হয়। কিন্তু আজ ফিল্ম সেটে ব্যতিক্রমী কিছু ঘটছে। ওয়াইআরএফ প্রোডাকশনসের সার্থক শিণ্ডে জানান, ‘‘আমাদের মৌলিক টিমের কর্মীর সংখ্যা দেড়শোর মতো, যাঁরা প্রতিদিন সেটে থাকেন। এছাড়া দুই থেকে আড়াইশো অস্থায়ী কর্মীও যোগ দেন। প্রথমদিকে মানুষ এ বিষয়ে মাথা ঘামাতো না। বিষয়টি না বুঝলেও এখন মানুষকে কমপক্ষে বোঝানো হচ্ছে যে ময়লা ফেলার দুটি বিন রয়েছে, ফলে আলাদা করে ফেলতে হবে।''
দিব্যা রবিচন্দ্রন শুটিংয়ের সময়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বপ্রাপ্ত কোম্পানির মালিক। ২০১৭ সালে তিনি ‘স্ক্র্যাপ' নামের এই কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। দিব্যা বলেন, ‘‘এমন সাধারণ শুটিংয়ের ফলে ১৫ থেকে ৩০ হাজার কিলো বর্জ্য সৃষ্টি হতে পারে। প্রত্যেক মাসে গড়ে শুটিং-প্রতি আট থেকে দশ হাজার কিলো বর্জ্য দেখা যায়।''
স্ক্র্যাপ কোম্পানির প্রথম প্রকল্প ছিল ‘উইকেন্ডার এনএইচসেভেন' সংগীত উৎসব। দুই দিনের এই কনসার্টে কোম্পানিটি সাত টনেরও বেশি বর্জ্য সামলেছে। প্রায় ৮০ শতাংশ বর্জ্য প্রসেস করা হয়েছে, যা সাধারণত ভাগাড়ে ফেলে দেওয়া হয়। দিব্যা রবিচন্দ্রন বলেন, তিনি নিজে বছরে মাত্র ১০০ গ্রাম বর্জ্য সৃষ্টি করেন। ‘জিরো ওয়েস্ট' জীবনযাত্রাই তাঁর লক্ষ্য।
‘জিরো ওয়েস্ট' এমন এক দর্শন, যার লক্ষ্য যত কম সম্ভব বর্জ্য সৃষ্টি করা। একেবারেই কোনো বর্জ্য সৃষ্টি না করা আদর্শ। এর প্রবক্তারা জীবনের সব ক্ষেত্রেই সেই দর্শন প্রয়োগ করতে চান – যেমন খাদ্যে বর্জ্য এড়িয়ে চলা, ভ্রমণের সময়ে যতটা সম্ভব কার্বন নির্গমন কমানো এবং ভাগাড় থেকে দূরে রাখতে জিনিসপত্রের পুনর্ব্যবহার ইত্যাদি। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে দিব্যা রবিচন্দ্রন বলেন, ‘‘২০১৬ সালে মুম্বইয়ের দেওনার আবর্জনা ক্ষেত্রে বিশাল অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে আগুন জ্বলেছিল। প্রথম বার আমি নিজের বাসার ময়লা ফেলার বিনের দিকে তাকিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করেছিলাম, এ সব জঞ্জাল কোথায় যায়। এই ডাম্পিং গ্রাউন্ডই বা কী, সেখানে কেন আগুন লেগেছে?''
বর্জ্য কমাতে হলে একাধিক ক্ষেত্রে সমান্তরালভাবে চেষ্টা চালাতে হয়। পুরানো দিনের মতো কোনো বস্তুর পুনর্ব্যবহারের উপায় নতুন করে আবিষ্কার করতে হবে। একমাত্র এভাবেই আমরা নিজেদের তৈরি বিপর্যয় থেকে বেরিয়ে আসতে পারবো।
