এত অবহেলা কেন?

আপডেট : ০২ জুন ২০২২, ০৬:০১

‘শুরু করা সহজ, চালিয়ে যাওয়া কঠিন’—দেশের বিভিন্ন খাতে অবস্থাপনা—দায়িত্বে অবহেলার প্রশ্নে প্রবাদটি সত্য হইয়া উঠিয়াছে। সময়ে সময়ে দেশের সেবামূলক বিভিন্ন খাতে গতিশীলতা আনয়নে নানাবিধ প্রকল্প গ্রহণ করা হইয়াছে। এই সকল প্রকল্প শুরু হয় বিপুল সম্ভাবনা, তোড়জোড় লইয়া। কিন্তু মাঝপথে কিংবা অনেক ক্ষেত্রে শুরুতেই হোঁচট খাইয়া মুখ থুবড়াইয়া পড়িতেছে আশা জাগানিয়া এই সকল প্রকল্পের অধিকাংশই। সাম্প্রতিক সময়ে ‘কমিউনিটি বেজড হেলথ কেয়ার’ প্রকল্পের আওতায় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে হাওরাঞ্চল সুনামগঞ্জ ও জামালগঞ্জে চালু হয় নৌ-অ্যাম্বুলেন্স। প্রধানমন্ত্রীর উপহারস্বরূপ প্রদেয় দুইটি অ্যাম্বুলেন্সের একটিতে রোগী বহনের প্রথম দিনেই যান্ত্রিক ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়; দীর্ঘ সময় বিকল হইয়া পড়িয়া থাকিয়া একসময় বন্যার পানিতে ডুবিয়া নিঃশেষ হইয়াছে উহা। অন্যটি উদ্বোধনের দিনেই যাত্রী লইয়া মাঝনদীতে আটকা পড়ে, চার বছর ধরিয়া অকার্যকর অবস্থায় পতিত হইয়া নিশ্চিহ্নের পথে রহিয়াছে।

রোগীর কল্যাণে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া উপহারের যদি এই ‘হাল’ হয়, এই জাতীয় অন্যান্য প্রকল্প কী অবস্থায় রহিয়াছে—অবাক বিস্ময়ের বিষয়। দায়িত্ব পালনের ঘাটতি এবং অব্যবস্থাপনার এই একটি চিত্রই প্রশ্ন তুলিতে যথেষ্ট—প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের আসলে কাজটা কী? হাওরাঞ্চল কিংবা উপকূলীয় জনগণকে প্রতিকূল পরিবেশে টিকিয়া থাকিবার সুবিধার্থে নানামুখী প্রকল্প-প্রচেষ্টা লওয়া হয় সত্য, কিন্তু সেইগুলির ঠিকঠাক বাস্তবায়নের পরিসংখ্যান ‘হাতেগোনা’। শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে দায়িত্ব পালনে অনিয়ম-অবহেলা-অরাজকতা জনগণের অনেকটা গা-সওয়া হইয়া গিয়াছে, কিন্তু ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়ণ, বাঁধ নির্মাণ, পার্ক উন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য উন্নয়নের মতো প্রকল্পগুলোতে এই সকলের ধারাবাহিক পুনরাবৃত্তি অত্যন্ত দুঃখজনক।
বিগত সময়ের কথা বাদ দিয়া যদি শুধু করোনা মহামারির সময়ের কথাই ধরা হয়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বহাল তবিয়তে রহিয়াছেন। ২০ লাখ সরকারি চাকুরে নিয়মিত বেতন-ভাতা পাইয়াছেন, অথচ সেই সময় নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত হইয়া মানুষ ‘হাহাকার’ অবস্থার কবলে পড়ে। আজ নানা প্রতিকূলতায় সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠিলেও ততটা উত্তাপ পোহাইতে হইতেছে না সরকারি চাকুরিজীবীদের। কিন্তু দায়িত্ব পালনের বেলায় তাহারা কতটুকু দায়িত্ববান-কর্তব্যনিষ্ঠার স্বাক্ষর রাখিতেছেন তাহা বিশদ গবেষণার বিষয়। মুজিববর্ষে প্রধানমন্ত্রী গৃহহীন-আশ্রয়হীন-ছিন্নমূল মানুষকে মাথা গোঁজার ঠাঁই করিয়া দিতে ঘর উপহার দিয়াছেন। মূলধারায়-মূলস্রোতে ফিরাইতে প্রধানমন্ত্রীর এই মহতী উদ্যোগের ক্ষেত্রেও দায়িত্ব পালনে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযোগ উঠিতে দেখা গিয়াছে—যা নিতান্তই অনাকাঙ্ক্ষিত। দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির তোয়াক্কা না করিয়া রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি অনেক সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তাকে এই আশ্রয়ণ প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতে জড়াইয়া পড়িতে দেখা গিয়াছে। এই রকম বহু প্রকল্প অনিয়ম-অবহেলায় নিষ্প্রাণ হইয়াছে। ব্যাপক উত্সাহ-উদ্দীপনা লইয়া ঢাকার চারিপাশে বৃত্তাকার নৌপথ চালুর উদ্যোগ শুরু হইয়াছিল। রাজধানীর যানজট নিরসনের পাশাপশি পর্যটনশিল্পের বিকাশে ভূমিকা রাখিবার প্রত্যয় লইয়া প্রকল্প শুরু হইয়াছিল বটে, অনিয়ম-অরাজকতায় বছর না ঘুরিতেই প্রকল্পের চাকা ঘুরিতে থাকে উলটা দিকে। বর্তমানে দেশে বেশ কিছু মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নের পথে রহিয়াছে; মানুষের জীবনমান উন্নয়নে প্রজেক্টকেন্দ্রিক বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হইতে দেখা যাইবে স্বভাবতই। অতীতের ঘটনাগুলি থেকে শিক্ষা লইয়া ‘অতি উত্সাহীদের অতিসৃজনশীল’ প্রকল্পগুলি চুলচেরা বিশ্লেষণ করিয়া তবেই সেগুলোর অনুমোদন দিবার বিষয় ভাবিতে হইবে। বিশেষত পদ্মা সেতুর মতো প্রজেক্টগুলোতে শ্রীবৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ মতামতকে প্রাধান্য দিলে সেবা-সফলতা দীর্ঘস্থায়ী হইবে। অন্যথায়, স্বপ্নের প্রজেক্টগুলির মধ্য দিয়া দেশ সাজাইবার প্রচেষ্টা হামাগুড়ি খাইতে থাকবে পশ্চাত্পথে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতির বাড় বাড়িতে দেখা যাইতেছে। এমতাবস্থায়, পরিস্থিতি বিচেনায় কার্যকর ব্যবস্থা না লইতে পারিলে কিংবা প্রকল্পগুলিতে অনিয়ম-দুর্নীতির ঊর্ধ্বমস্তককে ছাঁটিতে না পারিলে ভোগান্িত-খেসারত বাড়িতেই থাকিবে। প্রতিটি সেক্টরে অনিয়ম-দুর্নীতির সাগরে অবগাহন করা কর্তাবাবুদের উদ্দেশ্যে এই অকাট্য সত্যটি বারবার বলা হইতেছে—নিজের সীমা ভুলিয়া গিয়া অধিক বাড়াবাড়ির ফলাফল সুখকর হইবে না।

ইত্তেফাক/ ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন