বিশ্বব্যাপী উচ্চ মূল্যস্ফীতিই বড় চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ০৩ জুন ২০২২, ০৪:১৪

করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বব্যাপী মার্কিন ডলারের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। ফলে প্রায় প্রতিটি দেশেই মার্কিন ডলারের বিপরীতে তাদের স্হানীয় মুদ্রার মান কমাতে বাধ্য হয়। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া চলমান থাকায় জ্বালানি তেলসহ অন্যান্য আবশ্যিক উন্নয়ন উপকরণের মূল্যও অস্বাভাবিক গতিতে বাড়তে শুরু করে। একই সময়ে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো শুরু হয় রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ।

এই যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল, খাদ্যপণ্যসহ প্রতিটি পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ১৩০ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়। পরবর্তী সময়ে রাশিয়া কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান ঊর্ধ্বমুখী মূল্য কিছুটা স্তিমিত হয়ে আসে। কিন্তু রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ শিগগিরই বন্ধ না হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এই যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ব্যাপকভাবে পড়বে বলেই অর্থনীতিবিদগণ মনে করছেন। জ্বালানি তেল, গ্যাস ও খাদ্যপণ্য, বিশেষ করে গমের সরবরাহের জন্য বিশ্বের অনেক দেশই রাশিয়া এবং ইউক্রেনের ওপর নির্ভর করে। যুদ্ধের কারণে রাশিয়া ও ইউক্রেন জ্বালানি তেল ও গমের জোগান দিতে পারছে না। পাশাপাশি ভবিষ্যতে দেশ দুটিতে গমের উত্পাদন সাংঘাতিকভাবে কমে যাবে।

কাজেই নিকট ভবিষ্যতে বিশ্বব্যাপী মার্কিন ডলারের মূল্য বা বিনিময় হার কমে সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। দেশে দেশে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ঊর্ধ্বমুখী থাকার অর্থই হচ্ছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে মূল্যস্ফীতি অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাওয়া। এই অসহনীয় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে প্রয়োজনীয় পণ্যসমূহ স্হানীয়ভাবে উত্পাদনের মাধ্যমে ভোক্তা চাহিদা পূরণের ব্যবস্হা করা। কিন্তু এটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আর সব দেশ চাইলেই তাদের ভোক্তাদের চাহিদা স্হানীয়ভাবে পণ্যের উত্পাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে মেটাতে পারবে না। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বিশ্ব একটি ‘গ্লোবাল ভিলেজ’-এ পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এবং রাজনীতির গতি-প্রকৃতির প্রতিটি দেশকেই প্রভাবিত করে। মার্কিন ডলার তার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতার কারণে অনেকটাই আন্তর্জাতিক মুদ্রার রূপ পরিগ্রহ করেছে। 

কয়েক বছর আগের এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বিশ্বের মোট বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ৬২ শতাংশই মার্কিন ডলারে সংরক্ষণ করা হয়। মার্কিন ডলার সাম্প্রতিক সময়ে শুধু শক্তিশালী হয়েছে। বিশ্বের আর কোনো দেশের মুদ্রা মার্কিন ডলারের মতো এতটা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অনেক দেশই রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। রাশিয়া এই অবস্হা থেকে উত্তরণের জন্য মার্কিন ডলারের পরিবর্তে রুবলের মাধ্যমে লেনদেন শুরু করে। তারা পরিষ্কার জানিয়ে দেয়, যেসব দেশ রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল ও গ্যাসসহ অন্যান্য পণ্য আমদানি করবে তাদের আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য রুবলের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত অনেক দেশই রাশিয়ার কাছ থেকে গোপনে রুবলের মাধ্যমে এসব পণ্য ক্রয় করতে থাকে। যারা মনে করেছিলেন, রাশিয়ার এই পালটা ব্যবস্হার কারণে বিশ্বব্যাপী মার্কিন ডলারের অবস্হান কিছুটা হলেও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, ইতিমধ্যেই ভুল ভেঙে গেছে। মার্কিন ডলার আরো শক্তিশালী হয়েছে।

এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার ৮ শতাংশ অতিক্রম করে গেছে। বিগত ৪০ বছরের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি আর কখনোই এতটা ঊর্ধ্বমুখী হয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে ভোক্তাদের ক্রয় করার প্রবণতা কিছুটা হলেও হ্রাস পেয়েছে। আর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে উদ্বৃত্ত অর্থ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করছে। ফলে মার্কিন ডলারের অবস্হান আরো দৃঢ় হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়ানোর ফলে দেশটির উদ্বৃত্ত অর্থের মালিকরা বাইরে বিনিয়োগের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এই ধারাবাহিকতায় ভারত থেকে মার্কিন বিনিয়োগ উঠে যাচ্ছে। এশিয়াসহ প্রতিটি দেশের স্হানীয় মুদ্রা ব্যাপক দরপতনের শঙ্কার মধ্যে রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক, ২০২১ সালের মে মাস থেকে ২০২২ সালে মে মাস পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশের স্হানীয় মুদ্রা টাকার দরপতন হয়েছে ৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ। ভারতীয় মুদ্রার দরপতন হয়েছে ৬ দশমিক ১১ শতাংশ। পাকিস্তানি রুপির দরপতন হয়েছে ২০ দশমিক ৭৪ শতাংশ। জাপানি ইয়েনের দরপতন হয়েছে ১৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ। অন্যান্য দেশের মুদ্রার মধ্যে ভিয়েতনামি মুদ্রা ডং শূন্য দশমিক ৩৫ শতাংশ, ব্রিটিশ পাউন্ড ১২ দশমিক ২৪ শতাংশ, ইউরো ১৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ, চীনা মুদ্রা ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ, অস্ট্রেলীয় ডলার ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ অবমূল্যায়ন করা হয়েছে।

বিশ্ববাণিজ্যের ৯০ শতাংশই সম্পাদিত হয় মার্কিন ডলারে। বিশ্বে প্রতি বছর যে ঋণ প্রদান করা হয় তার ৪০ শতাংশই গৃহীত হয় মার্কিন ডলারে। বিশেষ করে বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ যে ঋণ প্রদান করে তা মার্কিন ডলারেই প্রদান করে। প্রতিটি দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে মার্কিন ডলার থাকতেই হয়। নন-আমেরিকান ব্যাংকগুলো দায়দেনার দুই-তৃতীয়াংশই মেটানো হয় মার্কিন ডলারে। ২০২১ সালে বিশ্বের মোট রিজার্ভের মধ্যে ৭ দশমিক ৮৭ ট্রিলিয়ন সংরক্ষিত হয় মার্কিন ডলারে। আর ইউরোতে রিজার্ভ সংরক্ষণের পরিমাণ হচ্ছে মাত্র ৩৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। রাশিয়া এবং চীন নানাভাবে চেষ্টা করছিল তাদের স্হানীয় মুদ্রায় রিজার্ভ সংরক্ষণের জন্য। কিন্তু তারা এতে সফল হয়নি।

এখন প্রশ্ন হলো, মার্কিন ডলারের বাজারে এমন অস্হিতিশীলতার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি কীভাবে প্রভাবিত হবে? মার্কিন ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় সাংঘাতিকভাবে বেড়ে গেছে। গত অর্থবছরের পুরো সময়ে বাংলাদেশ ৬ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করেছিল। এ বছর ৯ মাসেই বাংলাদেশ ৬ হাজার ১৫২ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। রপ্তানি বেড়েছে কিন্তু তা আমদানির মতো এতটা বৃদ্ধি পায়নি। বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে আড়াই হাজার কোটি মার্কিন ডলার। গত অর্থবছরে প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল ৩৬ দশমিক ১০ শতাংশ। এ বছর প্রথম ৯ মাসে এক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। 

চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক মোট পাঁচ বার স্হানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটিয়েছে। সাধারণত প্রতি বারে ২০ পয়সা হিসাবে স্হানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন করা হয়। কিন্তু শেষ বারে ৮০ পয়সা অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ১৯৯৩ সাল থেকে মুদ্রাবাজারে ফ্লোটিং এক্সচেঞ্জ রেট চালু করে। ফ্লোটিং এক্সচেঞ্জ রেট চালু হওয়ার ফলে মুদ্রা বাজারে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ করার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশ ব্যাংক পরোক্ষভাবে মুদ্রাবাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। মার্কিন ডলারের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু মার্কিন ডলার বাজারে বিক্রি করে দেয়। এতে মার্কিন ডলারের জোগান বৃদ্ধি পায়। ফলে মার্কিন ডলারের ঊর্ধ্বমুখী মূল্যপ্রবণতা কিছুটা হলেও রোধ হয়। আবার বাজারে কোনো সময় ডলারের জোগান বেড়ে গেলে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে কিছু মার্কিন ডলার কিনে নেয়। এতে বাজার স্হিতিশীল থাকে। কিন্তু এবার সে ধরনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া যাচ্ছে না। কারণ ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ হ্রাস পেতে শুরু করেছে।

২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২৭২ কোটি মার্কিন ডলার। পরবর্তী বছর তা ৩ হাজার ৬০৪ কোটি মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়। ২০২০-২০২১ অর্থবছরে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৬৩৯ কোটি মার্কিন ডলার। ২০২১-২০২২ অর্থবছরে রিজার্ভ কমে ৪ হাজার ২০০ কোটি ডলারে নেমে আসে। অবশ্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতে, বাংলাদেশের প্রকৃত রিজার্ভের পরিমাণ প্রদর্শিত রিজার্ভের চেয়ে অন্তত ৭০০ কোটি ডলার কম। অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন, ব্যক্তি খাতে উচ্চ মাত্রায় বিনিয়োগ এবং স্ফীত রিজার্ভ একটি দেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে ভালো অবস্হানের নির্দেশক। এমনকি তুলনামূলক স্বল্পরিজার্ভ এবং উচ্চ মাত্রায় বিনিয়োগও কাঙ্ক্ষিত হতে পারে। কিন্তু বিনিয়োগবিহীন স্ফীত রিজার্ভ কোনোভাবেই কাম্য নয়। কারণ এটা অর্থনীতির স্হবিরতার লক্ষণ। এখন স্হানীয়ভাবে বিভিন্ন পণ্যের উত্পাদন বৃদ্ধি এবং ভোগপ্রবণতা কমানোর মাধ্যমে পরিস্হিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।

লেখক: ব্যাংকার এবং অর্থনীতিবিষয়ক লেখক

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন