আগা খান অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার ২০২২-এ সংক্ষিপ্ত তালিকার ১৬টি প্রকল্পের মধ্যে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশের দুটি স্থাপত্য। এসব স্থাপত্যকর্মের ছবি লন্ডনের কিংস ক্রসে আয়োজিত এক প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে কক্সবাজারের টেকনাফে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে নির্মিত কমিউনিটি স্পেস ও ঝিনাইদহের আরবান রিভার স্পেস।
বৃহস্পতিবার (২ জুন) আগা খান অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার-এর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ ও ওয়েবসাইটে এবছরের মনোনীত প্রকল্পগুলোর তালিকা প্রকাশ করা হয়। রোহিঙ্গা শিবিরের কমিউনিটি স্পেসের স্থপতি রিজভী হাসান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন খাজা ফাতমি ও সাদ বিন মোস্তফা। প্রথাগত পদ্ধতিতে কোনো নকশা বা মডেল তৈরি না করে তাঁরা সরাসরি রোহিঙ্গা কারিগরদের সঙ্গে কাজ করেছেন ও নির্দেশনা দিয়েছেন। স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা কাঁচামালে তৈরি করেছেন টেকসই ও পরিবেশবান্ধব স্থাপনা।
অপরদিকে ঝিনাইদহের 'আরবান রিভার স্পেস'-এর স্থপতি খন্দকার হাসিবুল কবির ও সোহেলি ফারজানা। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষক হাসিবুল কবির কো.ক্রিয়েশন আর্কিটেক্টসের প্রধান। নিজ এলাকা ঝিনাইদহের নদীর তীরঘেষে হাঁটার রাস্তা ও বাগানের ফাঁকে ফাঁকে আড্ডা ও সংস্কৃতিচর্চার জায়গা তৈরি করেছেন তিনি, যা পুরো এলাকার চিত্র বদলে দিয়েছে। পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীলতার পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক নগরায়ণের অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে এটি।

আগা খান অ্যাওয়ার্ডের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পাওয়া স্থপতি রিজভী হাসান ২০২০ সালের আগস্টে জাতিসংঘের 'রিয়েল লাইফ হিরো' স্বীকৃতি পান। মানবিক কার্যক্রমে সংবেদনশীল স্থাপত্যের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে বিশ্বের নজর কেড়েছেন তিনি। কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাঁর কাজ নিয়ে প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে যুক্তরাজ্যের ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকায়, যার শিরোনাম ছিল 'বিশ্বের সেরা ১০টি নতুন স্থাপনা'। স্থাপত্য সমালোচক ও সাংবাদিক রোয়ান মুরের ওই প্রতিবেদনে রিজভীর প্রকল্প ‘বিয়ন্ড সারভাইভাল: এ সেফ স্পেস ফর রোহিঙ্গা উইমেন অ্যান্ড গার্লস’ এর কথা তুলে ধরা হয়।
নারীবান্ধব ওই প্রকল্পের মাধ্যমে শরণার্থী হিসেবে আসা রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীদের জন্য আঙিনা তৈরি করা হয়েছে। রোহিঙ্গা নারীদের কাউন্সিলিংসহ নানা দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও আছে সেখানে। আকর্ষণীয় ও পরিবেশবান্ধব এই প্রকল্পের নকশায় রিজভীর ব্যতিক্রমী ভাবনার প্রতি সম্মান দেখিয়ে ইউএনওসিএইচএ তাঁকে 'রিয়েল লাইফ হিরো' হিসেবে পরিচয় দিয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশনের (আইওএম) হয়ে কক্সবাজারে কর্মরত রিজভী হাসানের বাড়ি গাজীপুরে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) স্থাপত্য বিভাগ থেকে ২০১৭ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি। বুয়েটের ছাত্র থাকা অবস্থায় ২০১৪ সালে কেনিয়ার স্থপতি এরিক সেজালের এক কনফারেন্সে অংশ নিয়ে মানবিক স্থাপত্য নিয়ে কাজ করার অনুপ্রেরণা পান তিনি। তখন থেকেই চেয়েছেন গৎবাঁধা দালান তৈরির বাইরে গিয়ে গণমুখী কাজ করবেন, যার মাধ্যমে পুরো একটি জনগোষ্ঠী উপকৃত হবে।
স্নাতক সম্পন্নের পর রিজভী পেশাচর্চার তালিম নিয়েছেন খন্দকার হাসিবুল কবিরের কাছে। তিনিই এবার রিজভীর সঙ্গে রয়েছেন আগা খান অ্যাওয়ার্ডের সংক্ষিপ্ত তালিকায়। খ্যাতিমান এই স্থপতি 'কমিউনিটি আর্কিটেক্ট' হিসেবে পরিচিত। হাসিবুল কবিরের সঙ্গে কাজ করতে গিয়েই রিজভীর ভাবনার ডালপালা আরও বিস্তৃত হয়। এর কারণ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক হাসিবুল কবিরের অনন্য পরিচয়—তিনি 'গরীবের স্থপতি'। এই শিক্ষক একসময় বসবাস করতেন ঢাকার করাইল বস্তিতে। সেখানকার মানুষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশে তিনি কাজ করেছেন, তাদের জন্য তৈরি করেছিলেন 'আশার মাচা'।
স্থাপত্যের একজন শিক্ষক বস্তিতে থেকে বস্তির মানুষদের জন্য কাজ করছেন, এই বিষয়টি সেসময় আলোড়ন সৃষ্টি করে। হাসিবুল কবিরের তৈরি করা ওই আশার মাচা ছিল বাঁশের তৈরি। এর উপর বসে করাইলের বাসিন্দারা আড্ডা দিতেন, কখনো এতে বাচ্চারা পড়াশোনা বা খেলাধুলা করতে জড়ো হতো। সেসময় এটি একটি কমিউনিটি স্পেস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গাছপালা ও লতাপাতায় বেষ্টিত ছিল আশার মাচা।
নিজ শহর ঝিনাইদহের জন্য প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছেন স্থপতি খন্দকার হাসিবুল কবির। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে দেখিয়েছেন স্বল্পখরচে মানসম্মত বাসস্থান তৈরির প্রক্রিয়া। সেখানে ওই জনগোষ্ঠীর মানুষেরা নিজেরাই ইট-কাঠ-পাথর ব্যবহার করে নিজেদের ঘর বানিয়েছেন, যেখানে ছিল তাদের আত্মিক অংশগ্রহণ। বাইরে থেকে মিস্ত্রী প্রয়োজন না হওয়ায় খরচও হয়েছে অল্প। এছাড়া শহরের সৌন্দর্য্যবর্ধন ও এলাকাগুলোর মধ্যে আন্তঃসম্পর্কীয় যোগাযোগের উন্নয়নের পাশাপাশি গণপরিসর নিয়ে কাজ করছেন তিনি। ভূমিকা রাখছেন সমাজ পরিবর্তনে। ‘কো-ক্রিয়েটিং স্পেস’ বা মিলেমিশে স্থান নির্মাণই কবিরের কাজের প্রধান উপজীব্য।
খন্দকার হাসিবুল কবির ২০০০ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্যে স্নাতক সম্পন্ন করেন। ২০০৫ সালে যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্যে স্নাতকোত্তর করেন, যেখানে তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল 'হোমস্টিড'। পরে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যে বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।
কবিরের একসময়কার 'শিষ্য' রিজভী হাসান ঝিনাইদহ থেকে ফেরার পর যোগদান করেন ব্র্যাকে। কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরের জন্য সাইক্লোন সেন্টার নির্মাণের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি দেখতে পান বিভিন্ন সংস্থা সেখানে স্বল্পখরচে আবাসনের ব্যবস্থা করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এরপর পুরোদমে কাজে নেমে পড়েন রিজভী। ইউনিসেফ, ইউএনএইচসিআর, ইউএনওমেন, ব্র্যাকের মতো প্রতিষ্ঠানের জন্য সাতটি সেন্টার গড়েছেন তিনি। প্রতিটি স্থাপনাই ব্যতিক্রম। এসব স্থাপনার মাধ্যমে বহু নারীকে নিরাপদে সেবা ও প্রশিক্ষণ দিতে সক্ষম হচ্ছে ব্র্যাক এবং ইউনিসেফ। এসব স্থাপনার প্রধান কাঁচামাল বাঁশ, টিন, বেত, চাটাই। স্থানীয়ভাবে তা সংগ্রহ করে সরাসরি রোহিঙ্গাদের অংশগ্রহণেই নির্মাণ করা হয় স্থাপনাগুলো।
স্থাপত্য পুরস্কারের ক্ষেত্রে আগা খান অ্যাওয়ার্ড অন্যতম প্রাচীন ও সম্মানজনক পুরস্কার। এই পুরস্কার দেওয়া শুরু হয় ১৯৭৭ সাল থেকে। প্রতি তিন বছর পর এই সম্মাননা দেওয়া হয়। সমকালীন নকশা, সামাজিক গৃহায়ণ, সামাজিক অগ্রগতি ও উন্নয়নসহ অনেক দিকই বিবেচনা করা হয় এতে। এই পুরস্কার কেবল স্থাপত্যের নান্দনিক দিকটির দিকেই খেয়াল করে না, সার্বিকভাবে জীবনের গুণগত মানোন্নয়নের দিকেও খেয়াল রাখে। স্থাপনা বা ব্যক্তির পাশাপাশি এটি প্রকল্প, সম্প্রদায় ও এর অংশীদারদেরও স্বীকৃতি দেয়। পরিকল্পনা এবং ঐতিহাসিক সংরক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি উদ্ভাবনী ধারণায় স্থাপনাটি কতটা পরিবেশবান্ধব, সেটি দেখা হয়। এ পুরস্কারের জন্য নির্বাচনও হয় অত্যন্ত কঠোর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত বিজয়ীরা ১০ লাখ ডলার অর্থমূল্যের পুরস্কার ভাগ করে নেবেন।
এর আগে ২০১৯ সালে স্থপতি সাইফ উল হকের নকশা করা কেরানীগঞ্জের দক্ষিণ কানারচরের আর্কেডিয়া এডুকেশন প্রজেক্ট আগা খান পুরস্কার লাভ করে। ২০১৬ সালে এই পুরস্কার জিতেছিলেন দুই বাংলাদেশি স্থপতি মেরিনা তাবাশ্যুম ও কাশেফ মাহবুব চৌধুরী। স্থপতি মেরিনা তাবাশ্যুমের করা বায়তুর রউফ মসজিদের নকশায় রয়েছে সুলতানি স্থাপত্যের অনুপ্রেরণা। আর ফ্রেন্ডশিপ সেন্টারের নকশায় স্থপতি কাশেফ মাহবুব চৌধুরী এনেছেন মহাস্থানগড়ের আবহ। তাঁদের আগে বাংলাদেশের তিনটি স্থাপত্য এ পুরস্কার জিতলেও সেগুলোর স্থপতিরা ছিলেন বিদেশি। ওই স্থাপত্যগুলো হলো জাতীয় সংসদ ভবন, গ্রামীণ ব্যাংক হাউজিং প্রকল্প ও দিনাজপুরের রুদ্রপুরের মেটি স্কুল। তবে মেটি স্কুলের স্থপতি জার্মান নারী আনা হেরিঙ্গারের সঙ্গে সহযোগী হিসেবে খন্দকার হাসিবুল কবিরও যুক্ত ছিলেন। এছাড়াও বেশকিছু প্রকল্প সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়েছিল।
