২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলীতে রাসায়নিকের গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জনের মৃত্যু হয়। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ওয়াহেদ ম্যানশনের আগুনে মারা যান ৭১ জন। এর দুই বছর পর আরমানিটোলার হাজী মুসা ম্যানসনের অগ্নিকাণ্ডে ৪ জন প্রাণ হারান। রাজধানী ঢাকার নিমতলীতে রাসায়নিক গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর ঢাকা জেলা প্রশাসক ও বিস্ফোরক অধিদপ্তর যৌথভাবে ১৮০টি গুদাম ও ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
২০১০ সালের অক্টোবরের মধ্যে গুদামগুলো সরানোর নির্দেশ দেওয়ার পরও পুরান ঢাকার লালবাগ, সূত্রাপুর, শ্যামপুর ও কোতোয়ালী এলাকা থেকে এখনো সরানো হয়নি। গুদামগুলোর ভবনের ওপরে ঝুঁকির মধ্যে এখনো বসবাস করছে হাজারো মানুষ। জননিরাপত্তা ও পরিবেশের কথা বিবেচনা করে পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যাল কারখানা, গুদাম এবং আবাসিক ভবনে কারখানা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। ২০০৪ সালের ৯ জুন পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারে ভবন ধসের পর ঢাকা সিটি করপোরেশন ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি করে। এ তালিকায় ২৬ হাজার আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন রয়েছে।
আরো সমীক্ষার মাধ্যমে ৫৫৮টির বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১৮৫টি ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে দ্রুত এসব ভবন ভেঙে ফেলা বা আধুনিক প্রযুক্তিতে ঝঁুকিমুক্ত করার পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। এসব ভবনের বেশির ভাগই পুরান ঢাকায়। চিহ্নিত ভবনগুলোর ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ আজো গ্রহণ করা হয়নি। এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ৬ থেকে ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ধসে পড়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার প্রধান কারণ নির্মাণের পর ভবনের চরিত্র পরিবর্তন। আবাসিক ভবনের নকশা অনুমোদন করে ভবন নির্মাণের পর সেখানে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালানো হয়। বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদন নিয়ে সেখানে স্থাপন করা হয় ভারী শিল্প-কারখানা। আবাসিক ভবন, বাণিজ্যিক ভবন ও শিল্প ভবনের চরিত্র পৃথক, ধারণক্ষমতা পৃথক এবং নির্মাণ কৌশলও পৃথক। ফলে এক ধরনের ভবন নির্মাণ করে আরেক ধরনের কাজে ব্যবহার করলে ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে—এটাই স্বাভাবিক। চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো ঝুঁকিমুক্ত করতে বিলম্ব করা দুর্ঘটনার আশঙ্কাকে বাড়িয়ে তুলছে। ভবন অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী নির্মাণ হচ্ছে কি না তা দেখা হয় না বললেই চলে। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ ইমারত বা স্থাপনা চিহ্নিতকরণে টাস্কফোর্স গঠিত হলেও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণ বন্ধ হয়নি। ভবন নির্মাণের পর নিরাপত্তার জন্য ‘অকুপেন্সি সার্টিফিকেট’-এর বিধান থাকলেও তা পালিত হচ্ছে না।
আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের দোকান, গুদাম ও কারখানা স্থাপন, বিদ্যমান ভবনের চরিত্র পরিবর্তন, নিষিদ্ধ ঘোষিত শিল্প স্থাপন, বুড়িগঙ্গা দূষণ, কার্যকর ড্রেনেজ সিস্টেমের অভাব, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পার্ক ও মাঠ দখল, পুকুর দখল ও ভরাটের ফলে পুরান ঢাকার জনজীবন, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ আজ বিপদাপন্ন। সাম্প্রতিককালে পুরান ঢাকায় কয়েকটি অগ্নিকাণ্ড ও ভবন হেলে পড়ার ঘটনা মহাবিপদের পূর্বাভাস বলে অনেক মনে করেন। পুরান ঢাকার সমস্যা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করা না হলে যে কোনো সময় শাঁখারীবাজারে ভবন ধস, নিমতলীর রাসায়নিক গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মতো ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে।
রাজউক, ঢাকা সিটি করপোরেশন, ঢাকা জেলা প্রশাসক, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, ঢাকা ওয়াসা এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদপ্তরের বিদ্যমান আইনসমূহ প্রয়োগের অভাব, মাঠ পর্যায়ে যথাযথ তদারকির অভাব এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে পুরান ঢাকায় ভয়াবহ এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে মানুষকে বাঁচাতে হলে পুরান ঢাকা থেকে বিপজ্জনক রাসায়নিক দাহ্য পদার্থের কারখানা, গুদাম ও দোকান অপসারণ করে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করতে হবে। আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনে স্থাপিত কারখানাসমূহের ট্রেড লাইসেন্স বাতিলসহ সেগুলো স্থানান্তর করা জরুরি। নিষিদ্ধ ঘোষিত শিল্পকারখানাসমূহ বন্ধ করাসহ সেগুলোর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্হা গ্রহণ করা উচিত।
ভবনের ধরন অনুযায়ী তা ব্যবহারে মালিককে বাধ্য করা এবং মালিক তা করতে ব্যর্থ হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্হা গ্রহণ করা অপরিহার্য। কার্যকর ড্রেনেজ সিস্টেম গড়ে তোলা এবং তা নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা ও রক্ষণাবেক্ষণ করার বিকল্প নেই। সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এবং নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণ করাও দরকার। পার্ক ও মাঠ দখলমুক্ত করা এবং সেগুলো জনসাধারণের ব্যবহার উপযোগী করে তুলতে হবে। পুকুর দখল ও ভরাটমুক্ত করা এবং সেগুলোকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা ও সংশ্লিষ্ট সমস্ত সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধন না করে উপায় নেই।
