‘কি যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে’

আপডেট : ০৪ জুন ২০২২, ১৪:২০

আমাদের অবস্থা কী ছিল এবং এখন কী হইয়াছে, তাহার প্রশংসা করিতেই হয়। অবস্থার উন্নতি হইয়াছে সকল ক্ষেত্রেই। ইহা লইয়া ন্যূনতম কয়েক লাইন করিয়া বিবরণ দিতে গেলেও তাহা বৃহৎ একটি গ্রন্থের আকার ধারণ করিবে। তবে প্রদীপের নিচে প্রথম দিকে কিছুটা অন্ধকারও থাকে। আমরা এই ক্ষেত্রে এখন বিদ্যুতের দিকে নজর দিতে পারি।

 সরকার বিদ্যুৎ খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করিয়া নানাবিধ কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করিয়া আসিতেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ খাতের সমন্বিত উন্নয়নের মাধ্যমে সকলের জন্য নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ নিশ্চিত করাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। নিশ্চিতভাবে প্রধানমন্ত্রী-ঘোষিত শতভাগ বিদ্যুতায়িত অঞ্চলের গ্রাহকরা নিশ্চয়ই অত্যধিক খুশি। যদিও শতভাগ মানসম্মত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রাপ্তি এখনো বিশ বাঁও জলে। বিদ্যুৎ তো কেবল উৎপাদন করিলেই হয় না, উহার যথাযথ বিতরণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উহারও উন্নয়ন হইতেছে বটে। কিছুদিন পর বিতরণসংক্রান্ত যাবতীয় সমস্যা ক্রমান্বয়ে ঠিক হইয়া যাইবে নিশ্চয়ই; কিন্তু এই মুহূর্তে যেই অবস্থা সেই অবস্থাটাও আমলে লইতে হইবে। প্রবাদ আছে— অন্ন বিনা চর্ম দড়ি/ তৈল বিনা গায়ে খড়ি। এখন তো অবস্থা এমন যে ত্বক রজ্জুবৎ হইয়া যাইতেছে!

বিদ্যুতের ক্ষেত্রে গ্রাহকসেবার দৈন্যদশা নূতন নহে। বিদ্যমান অবস্থাপন, অসম্পূর্ণ কারিগরি সক্ষমতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হইয়া উঠিতেছে। সমগ্র দেশের বহু অঞ্চলে সারা দিনে ১০ হইতে ১২ বার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করে। সাধারণ বাসাবাড়ি কিংবা সড়কের বিদ্যুতের বাতির ক্ষেত্রে বিদ্যুতের এই আসা-যাওয়ার সমস্যা হয়তো অতখানি প্রকট নহে; কিন্তু ঘনঘন বিদ্যুৎ যাওয়া-আসা করিলে শিল্পকারখানাগুলির মেশিনারিজের কী অবস্থা হইতে পারে—তাহা কেবল শিল্পকারখানাগুলির মালিকরাই মর্মে মর্মে উপলব্ধি করিতে পারেন। 

কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার যেমন বলিয়াছেন—‘কি যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে/ কভু আশীবিষে দংশেনি যারে—’ সুতরাং বিদ্যুতের ঘনঘন আসা-যাওয়ার যাতনা কলকারখানার মালিকদের মতো করিয়া আর কেহ বুঝিতে পারিবেন না। আধুনিক কলকারখানার মেশিনারিজ এমনিতেই সূক্ষ্ম ও উচ্চপ্রযুক্তির হইয়া থাকে। ইহাদের নিয়ম মানিয়া স্টার্ট ও শাডডাউন করিতে হয়, নচেৎ হঠাৎ পাওয়ার অফ হইয়া মেশিন বন্ধ হইলে উহার সূক্ষ্ম প্রযুক্তিতে ধাক্কা লাগে এবং এই ধাক্কা বারংবার লাগিলে অনেক ক্ষেত্রেই মেশিন বিগড়াইয়া যায়। সুতরাং আধুনিক কলকারখানা চালাইতে গেলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাহার ব্যত্যয় ঘটিলে মেশিনারিজ বারংবার বন্ধ হইয়া উৎপাদন ব্যাহত করে। মেশিন নষ্ট হইয়া খরচ বৃদ্ধি করে। উৎপাদন কম হইলে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায়, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাইলে লভ্যাংশ কমিয়া যায়, যাহার প্রভাব পড়ে কারখানার জনশক্তি হইতে শুরু করিয়া রাজস্ব পর্যন্ত। এমনিতেই সমগ্র বিশ্বে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং জাহাজ পরিবহনের মাশুল কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাইয়াছে, টাকার মূল্যহ্রাস ঘটিতেছে প্রতিনিয়ত। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সমগ্র পৃথিবীই যেন বিস্ফোরণোন্মুখ আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখে পরিণত হইয়াছে। খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের স্বল্প সরবরাহ এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ইতিমধ্যে সাধারণ মানুষের জীবনে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করিয়াছে। স্বল্পোন্নত দেশ এবং এসআইডিগুলি সবচাইতে অধিক ক্ষতির সম্মুখীন হইতেছে।

এমতাবস্থায় বুঝিতে হইবে কী করিয়া বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কার্য হাসিল সম্ভব। যাহারা ঋণ লইয়াছেন এবং যাহারা ঋণ দিয়াছেন—উভয় পক্ষকেই অন্তর্দৃষ্টিতে বুঝিতে হইবে—জোর করিয়া যেমন অর্থ আদায় সম্ভব নহে, তেমনি ভাগে ভাগে অর্থ আদায়ে উভয়েরই কার্য হাসিল হইবে; কিন্তু হার্ডলাইনে যাইয়া যদি বলা হয় যে, বকেয়া থাকিলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করিয়া দেওয়া হইবে, কিংবা এখনই ঋণ শোধ করিতে হইবে, কোনো কথা শুনা হইবে না—সেই ক্ষেত্রে মৌমাছির পেট অধিক চাপাচাপি করিলে মধু বাহির হইবার পরিবর্তে মৌমাছিই অক্কা যাইবে। তাহা কাহারো জন্যই শুভ হইবে না।

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন