আমরা শোকাহত ও মর্মাহত

আপডেট : ০৬ জুন ২০২২, ০৭:৫৪

রাজধানী ঢাকায় রাসায়নিক গুদাম হইতে বড় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিলেও ইহা হইতে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করি নাই। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঘটনায় জনগণকে তাহারই মাশুল দিতে হইল আবার। গতকালের শেষ খবর অনুযায়ী এই অগ্নিকাণ্ডে নিহত হইয়াছেন অর্ধশতাধিক, আহত হইয়াছেন চার শতাধিক। তন্মধ্যে ৪০-৫০ জনের অবস্থা গুরুতর। সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি ইউনিয়নের শীদলপুর এলাকায় অবস্থিত বিএম কনটেইনার ডিপোটি সাবেক কাশেম জুট মিল এলাকা হিসাবে পরিচি। ডিপোর সন্নিকটে দুইটি পাঁচতলা ভবনে প্রায় ১ হাজার শ্রমিক বসবাস করেন।

শনিবার রাত্রি ১০টার দিকে যখন ডিপোর লোডিং পয়েন্টের ভিতরে আগুন লাগে, তখন কেহই ইহার ভয়াবহতা আঁচ করিতে পারেন নাই। ফায়ার সার্ভিসের লোকজন ও স্থানীয় অধিবাসীরা আগুন নিভাইতে যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়া যাইতেছিলেন। কিন্তু ডিপোতে হাইড্রোজেন পারক্সাইডবাহী ২৬টি কনটেইনার ছিল। এইগুলি যখন একের পর এক আগুনের লেলিহান শিখায় বিস্ফোরিত হইতে থাকে, তখন পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মী, স্বেচ্ছাসেবী ও উৎসুক জনতা, যাহারা সেইখানে ছিলেন, তাহারা কোনো কিছু বুঝিয়া না উঠিতেই অগ্নিকাণ্ডের শিকার হন। সেইখানকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর সদস্যদেরও নিযুক্ত করা হয়।

এই বিস্ফোরণ কতটা ভয়াবহ ছিল, তাহা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আর্থ জুমের স্যাটেলাইট ইমেজ বা ছবি বিশ্লেষণ করিলেই পাওয়া যায়। কনটেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আগুন, উত্তাপ ও ধুঁয়া প্রত্যক্ষভাবে ছড়াইয়া পড়ে আড়াই বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়িয়া। ইহাতে আশপাশের অন্তত চার বর্গকিলোমিটার এলাকা প্রকম্পিত হইয়া পড়ে। ইহাতে অনেকের বাড়িঘরের গ্লাস ভাঙিয়া পড়ে। আর ইহার দূরবর্তী প্রভাব পড়িয়াছে ১০ কিলোমিটার এলাকায়। রাসায়নিক গুদাম, কারখানা বা কনটেইনার এক একটা ভয়ংকর বোমা হইলেও আমরা ইহার নিরাপত্তায় কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করিতেছি না। ডিপোর অভ্যন্তরে অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। তাহা ছাড়া ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন অভিযোগ করিয়াছেন যে, মালিকপক্ষের অসহযোগিতার কারণে তাহারা দ্রুত আগুন নিভাইতে পারেন নাই। তাহারা কোন কোন কনটেইনারে কেমিক্যাল আছে—তাহার সঠিক তথ্য দিয়া সহায়তা দেন নাই। তাহারা গতকাল দুপুর পর্যন্ত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন নাই এমন অভিযোগও উঠিয়াছে। ইহার কারণে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের অনেক সদস্য দুর্ঘটনার শিকার হন।

এই অবহেলা মোটেও মানিয়া লওয়া যায় না। কেমিক্যালসমৃদ্ধ কনটেইনারগুলি প্রথমে শনাক্ত করা সম্ভব হইলে এত বড় বিপর্যয় ঘটিতে পারিত না। ইহার দায় কনটেইনার ডিপো কর্তৃপক্ষ এড়াইতে পারেন না। শুধু কনটেইনারেই নহে, ডিপোর টিনশেডেও প্লাস্টিকের জারে হাইড্রোজেনের পারক্সাইডবাহী দাহ্য পদার্থ ছিল। আগুন লাগিবার পর রাসায়নিকভর্তি এই জার ফাটিয়া যায়। ইহাতে হাইড্রোজেনের পারক্সাইড বাহির হইয়া কনটেইনারের সংস্পর্শে আসে। অক্সিজেন নির্গত হইয়া পানি ও আগুনের সংস্পর্শে আসিলে কনটেইনারের ভিতরের তাপমাত্রা বাড়িয়া গিয়া বিস্ফোরিত হয়। কনটেইনার ছিন্নভিন্ন হইয়া তাহা স্পি্রন্টারের মতো দ্রুত চারিদিকে ছড়াইয়া পড়ে। হাইড্রোজেন পারক্সাইড এমন একটি রাসায়নিক যৌগ, যাহা উত্তপ্ত করা হইলে তাপীয় বিয়োজনে বিস্ফোরক হিসাবে কাজ করে।

এই যে রাসায়নিক পণ্যভর্তি কনটেইনার সরাইতে বিলম্ব হইল এবং প্লাস্টিকের জারে রাসায়নিক পদার্থ রাখা হইয়াছিল যত্রতত্র, ইহার জন্যও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা প্রয়োজন। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও নৌপরিবহন অধিদপ্তরের তদারকির অভাব ছিল। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের আট জন কর্মী নিহত হইয়াছেন এবং চিকিৎসাধীন রহিয়াছেন ১৫ জন। কোনো একটি দুর্ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের এত কর্মী হতাহতের কোনো নজির নাই। আমরা এই দুর্ঘটনায় নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি জানাই সমবেদনা। যাহারা আহত হইয়াছেন তাহাদের সুচিকিৎসা প্রদান একান্ত কাম্য। ইহাতে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণসহ তদন্ত সাপেক্ষে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ণয় জরুরি—যাহাতে অবহেলাজনিত কারণে ভবিষ্যতে এই ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটিতে পারে।

ইত্তেফাক/এমআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন