আজ আমরা স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক। তবে বাঙালির এ স্বাধীনতা এক দিনে আসেনি। বাঙালির নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ধাপে ধাপে বাঙালি প্রস্তুত হয়েছিল চরম আত্মত্যাগে। ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচি বুনে দিয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নবীজ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছয় দফা ও ৭ জুন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে, আর তাই প্রতি বছর ৭ জুন আমরা ছয় দফা দিবস হিসেবে পালন করি। আমাদের জাতীয় মুক্তির সংগ্রামের ইতিহাসে ছয় দফার গুরুত্ব অপরিসীম। ছয় দফাকে বলা হয় বাঙালির মুক্তির সনদ। সেই ইতিহাস বাঙালির হৃদয়ে চিরভাস্বর হয়ে আছে।
স্বৈরাচারী রাষ্ট্র পাকিস্তান শুরুতেই বাংলা ভাষার ওপর আঘাত হেনে বুঝিয়ে দিয়েছিল বাঙালি সমাধিকার পাবে না। জীবন-জীবিকার সবখানেই আমরা ছিলাম বঞ্চনার শিকার। আইয়ুব খানের দীর্ঘ সামরিক শাসনে পূর্ব বাংলার মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক শোষণ, নিপীড়ন ও অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অনুসৃত নীতির ফলে দুই অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং পূর্ব বাংলা নতুন করে পশ্চিম পাকিস্তানের উপনিবেশে পরিণত হয়। প্রাদেশিক সরকারের হাতে মুদ্রাব্যবস্থা ও অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের কোনো ক্ষমতা প্রদান করেনি তারা। কেন্দ্রীয় সরকার এসব নিয়ন্ত্রণ করত বলে পূর্ব বাংলার সমুদয় আয় পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে চলে যেত। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশি মিশনসমূহের হেড অফিসসহ প্রায় সব ব্যাংক-বিমা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল।
পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে সম্পদ পাচারই ছিল এই বৈষম্যের মূল কারণ। এছাড়াও উদ্বৃত্ত আর্থিক সঞ্চয় পশ্চিম পাকিস্তানে জমা থাকত আর এ কারণে পূর্ব বাংলায় কোনো মূলধন গড়ে উঠত না। পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার তিন ভাগের দুই ভাগ অর্জিত হতো এদেশের উৎপাদিত পাট থেকে। অথচ পাটচাষিরা তাদের ন্যাঘ্য মূল্য থেকে হতো বঞ্চিত। বৈদেশিক ঋণের টাকা এবং আর্থিক সাহাঘ্যের বেশির ভাগ ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তনে। সামরিক বৈষম্যের কথা বলতে গিয়ে বলা যায় পাকিস্তানের দেশরক্ষা বাহিনীর তিনটি সদর দপ্তরই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। দেশরক্ষা বাহিনীর উচ্চপদে বাঙালিদের কোনো স্থান ছিল না সেনাবাহিনীতে— পশ্চিম পাকিস্তানের ছিল শতকরা ৯৫ জন; মাত্র শতকরা ৫ ভাগ ছিল পূর্ব বাংলার।
কাশ্মীর সমস্যা বহু দিনের একটি অমীমাংসিত সমস্যা ছিল। ফলে ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কাশ্মীর প্রশ্নে ভারত ও পাকিস্তান সম্পর্কের অবনতি ঘটে। শুরু হয় পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ। জাতিসংঘের হস্তক্ষেপের ফলে এ যুদ্ধ বন্ধ ঘোষিত হয়। তবে ১৭ দিনব্যাপী এই যুদ্ধে স্হল ও বিমান বাহিনীতে বাঙালি সেনারা অসম্ভব কৃতিত্ব দেখাতে সক্ষম হয়। এই যুদ্ধের সময় পূর্ব বাংলা ছিল সম্পূর্ণ অরক্ষিত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উপলব্ধি করেন যে, পূর্ব বাংলার মানুষ রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক— সব দিক থেকে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নিপীড়িত হচ্ছে। বৈষম্যের শিকার সামরিকভাবেও। এ বৈষম্য থেকে বাঙালি জাতিকে মুক্ত করার জন্য স্বাধীনতার আন্দোলন করতে হবে এবং শাসক নামের পাকিস্তানি শোষকদের দেশ থেকে বিতাড়িত না করতে পারলে বাঙালির বিপদ। আর এই লক্ষ্যে কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতেই তিনি প্রণয়ন করেন ছয় দফা কর্মসূচি।
১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি দুই দিনব্যাপী লাহোরে চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর বাসভবনে কাউন্সিল মুসলিম লীগের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ আফজালের সভাপতিত্বে পাকিস্তানের বিরোধী দলসমূহের জাতীয় কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় ও জনপ্রিয় বিরোধী দলের সাধারণ সম্পাদক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল যোগদান করেন। সম্মেলনে উপস্থাপনের জন্য ৫ ফেব্রুয়ারি সাবজেক্ট কমিটির সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের দাবি হিসেবে ‘ছয় দফা’ প্রস্তাব অন্তভুর্ক্ত করার দাবি জানান। সম্মেলনের উদ্যোক্তারা এ প্রস্তাব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। শুধু তা-ই নয়, তারা বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে অভিহিত করেন। সাবজেক্ট কমিটির আচরণে ক্ষুব্ধ বঙ্গবন্ধু সম্মেলন বর্জন করেন এবং ৬ ফেব্রুয়ারি অধিবেশনে যোগদান হতে বিরত থাকেন। ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি তার প্রতিনিধিদল নিয়ে ঢাকায় ফিরে আসেন। এরপর সাংবাদিকদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখার মাধ্যমে ছয় দফা কর্মসূচির প্রধান প্রধান দিক তুলে ধরেন। পূর্ব বাংলার প্রাণের দাবি ছয় দফার ঘোষণা দেন ও ব্যাখ্যা দিয়ে একে ‘বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। মূলত এই দিনই ছয় দফা প্রথম জনসমক্ষে আসে। এর পরপরই ‘আমাদের বাঁচার দাবি ছয় দফা কর্মসূচি’ শিরোনামে একটি প্রচার পুস্তিকা বিতরণ করা হয়।
ছয় দফা দাবিতে পাকিস্তানের প্রত্যেক প্রদেশকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার প্রস্তাব ছিল। পূর্ব পাকিস্তানকে একটি আঞ্চলিক রাজ্য হিসেবে গণ্য করে একটি স্বতন্ত্র ভৌগোলিক অঞ্চল হিসেবে মর্যাদা দিয়ে আঞ্চলিক সরকারের হাতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রদানের দাবিই ছিল ছয় দফার মূল লক্ষ্য। ১৯৬৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসভবনে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বর্ধিত সভা ডাকা হয়। দলের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ছয় দফা কর্মসূচির প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে ১৮-২০ মার্চ দলের কাউন্সিল অধিবেশনে ছয় দফাকে দলের লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দলই ছয় দফা প্রস্তাবকে সমর্থন করেনি; বরং নানা সমালোচনা করেছে। ১৯৬৬ সালের মার্চ মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিত কনভেনশন মুসলিম লীগের জনসভায় আইয়ুব খান এই বলে হুমকি প্রদান করেন যে, যারা ছয় দফা কর্মসূচির কথা বলবে তাদের বিশৃঙ্খলাকারী হিসেবে গণ্য করা হবে এবং সেসব বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনবোধে অস্ত্রের ভাষা ব্যবহার করা হবে।
গভীর আত্মপ্রত্যয়ী ও রাজনৈতিক দূরদর্শী বঙ্গবন্ধু বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না। কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে এগিয়ে চললেন লক্ষ্যের দিকে ছয় দফা নিয়ে। বললেন, ‘সরাসরি রাজপথে যদি আমাকে একা চলতে হয়, চলব। কেননা ইতিহাস প্রমাণ করবে বাঙালির মুক্তির জন্য এটাই সঠিক পথ’। বঙ্গবন্ধু জানতেন, ছয় দফা অগ্রসরের পথে সরকার সব রকমের বাধার সৃষ্টি করবে, তাই দ্রুত ছয় দফা জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে ব্যাপক জনসংযোগে নামেন। ২০ মার্চ থেকে ৮ মে পর্যন্ত ৩৫ দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৩২টি জনসভা করেন। অল্প সময়ের মধ্যে তিনি ছয় দফার পক্ষে সমগ্র বাংলাদেশে অভাবনীয় জনমত সৃষ্টি করেন। আইয়ুব-মোনায়েম খানের সরকার ভীত হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রতিটি জেলায় মামলা দায়েরের নির্দেশ দিলে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে মোট ১২টি মামলার হুলিয়া জারি হয়। ১৯৬৬ সালের ৮ মে নারায়ণগঞ্জে ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনের সর্ববৃহৎ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ভাষণ দিয়ে রাতে বঙ্গবন্ধু ধানমন্ডির বাসায় পৌঁছলে গভীর রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করার পর আওয়ামী লীগের প্রায় ৮ শতাধিক নেতাকর্মীকে কারারুদ্ধ করা হয়।
আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের গ্রেফতারের প্রতিবাদে পল্টন ময়দানে ১৯৬৬ সালের ১৩ মে জনসভা করে। ৩০ মে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল বন্দির মুক্তি ও ছয় দফার দাবিতে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন প্রদেশব্যাপী হরতাল ডাকা হয়। তেজগাঁও এলাকায় শ্রমিকনেতা মনু মিয়া গুলিবিদ্ধ হন। গুলির আঘাতে মারাত্মক রক্তক্ষরণে মনু মিয়া মৃতু্য নিশ্চিত জেনেও বলেছিলেন, ‘হাসপাতালে না নিয়ে আমাকে নিয়ে মিছিল করুন’। শেষ পর্যন্ত মনু মিয়ার লাশ নিয়ে মিছিল হয়েছে। ৭ জুন মনু মিয়াসহ ১১ জন শহিদ এবং বহু লোক আহত হন। সেই থেকে ৭ জুন পালিত হয়ে আসছে ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবস হিসেবে। ছয় দফা আমাদের ‘ম্যাগনাকার্টা’। প্রকৃত অর্থে ঐতিহাসিক ৭ জুন ছিল আমাদের স্বাধীনতার চেতনার রক্তাক্ত বহিঃপ্রকাশ। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্রজনতা মিছিল করে। আওয়ামী লীগের শত শত নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়। ১৯৬৬ সালের ১৫ জুন সরকার দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে গ্রেফতার করে। ১৬ জুন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকা প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়। আন্দোলন দমন করতে নির্যাতনের মাত্রা যত বাড়তে থাকে, সাধারণ মানুষ তত বেশি আন্দোলনে শামিল হতে থাকে।
এরপর পাকিস্তান সরকার নতুন চক্রান্ত শুরু করল। ১৯৬৮ সালে ১৭ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হলেও সঙ্গে সঙ্গে আবার গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হলো ঢাকা সেনানিবাসে। সেনানিবাসে কঠোর নিরাপত্তা প্রকোষ্ঠে তাকে বন্দি করে রাখা হলো। ১৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে ৩৫ জন সামরিক-বেসামরিক অফিসার ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হলো এবং সবাইকে আগরতলা ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত দেখিয়ে শুরু হলো আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। বিশেষ ট্রাইবুনালে শুরু হলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রহসনমূলক বিচার। প্রতিবাদে বিক্ষোভ পরিণত হলো গণ-অভ্যুত্থানে। গণদাবির মুখে বঙ্গবন্ধুকে ২২ ফেব্রুয়ারি নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার সামনে এই অবিসংবাদিত নেতাকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হয়। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার এই সাঁকো বেয়েই অর্জিত হয়েছে আমাদের সোনার বাংলার স্বপ্নের স্বাধীনতা।
লেখক: প্রফেসর, ম্যানেজমেন্ট বিভাগ ও সভাপতি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি।
