গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি ও বিতরণসংকট

আপডেট : ০৭ জুন ২০২২, ০৩:৩৬

সারা দেশের মানুষ এখন মূল্যস্ফীতির চাপে দিশাহারা। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে গার্মেন্টস শ্রমিক এমনকি সরকারি কর্মচারীরা তাহাদের বেতন বৃদ্ধির দাবি জানাইয়াছেন। এমন প্রেক্ষাপটে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসাবে বাড়ানো হইল গ্যাসের মূল্য। তৈল, গ্যাস ও বিদু্যতের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে বিভিন্ন অপরিহার্য পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ইহা জানা সত্ত্বেও গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের মূল্য গড়ে ২২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বৃদ্ধি করা হইল। ইহাতে দেশে আরো অস্থিরতা তৈরি হইতে পারে। সিএনজি বাদে সকল শ্রেণির ভোক্তাদের জন্য গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করিয়া বিজ্ঞপ্তি জারি করিয়াছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধিতে বিদ্যুতের মূল্যও পরবর্তীকালে বৃদ্ধি করা হইবে মর্মে ইঙ্গিত দেওয়া হইয়াছে।

বিভিন্ন পর্যায়ে গ্যাসের মূল্য কী পরিমাণ বৃদ্ধি পাইয়াছে তাহা দেখা যাইতে পারে। বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত গ্যাসের এক চুলার মাসিক বিল ৯২৫ টাকা হইতে ৬৫ টাকা বৃদ্ধি পাইয়া দাঁড়াইয়াছে ৯৯০ টাকায়। দুই চুলার মাসিক বিল বৃদ্ধি পাইয়া হইয়াছে ১ হাজার ৮০ টাকা। গৃহস্থালিতে ব্যবহৃত মিটারভিত্তিক প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের মূল্য ১২ টাকা ৬০ পয়সা হইতে ১৮ টাকা নির্ধারণ করা হইয়াছে। সবচাইতে বেশি বৃদ্ধি পাইয়াছে সার কারখানায় ব্যবহূত গ্যাসের মূল্য। প্রতি ঘনমিটার ৪ টাকা ৪৫ পয়সার স্থলে মূল্য বৃদ্ধি পাইয়া দাঁড়াইয়াছে ১৬ টাকা। ইহাতে নিশ্চিতভাবে সারের মূল্য বৃদ্ধি পাইবে এবং কৃষি উৎপাদনে তাহার নেতিবাচক প্রভাব পড়িবে। ক্ষুদ্র, কুটির ও অন্যান্য শিল্পে মূল্য কমানো হইলেও বৃহত্ ও মাঝারি শিল্পে মূল্য বৃদ্ধি পাইয়াছে। কেবল বৃহত্ শিল্পে বৃদ্ধি পাইয়াছে ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। বিদ্যুৎকেন্দ্রে (সরকারি, আইপিপি ও রেন্টাল) ১২ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং ক্যাপটিভ বিদ্যুতে ১৫ দশমিক ৫২ শতাংশ। স্বাভাবিকভাবে এখন বিদু্যতের মূল্য বৃদ্ধির ওপর চাপ সৃষ্টি হইয়াছে। ইহাতে সার্বিক উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাইবে নিঃসন্দেহে এবং ভোক্তারা আরো মূল্যস্ফীতির চাপে নিষ্পেষিত হইবেন।

করোনা মহামারির অভিঘাত ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি আজ টলটলায়মান। উন্নত দেশগুলিও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাইতেছে। আমদানি-রপ্তানির খরচ বৃদ্ধি পাইয়াছে। ডলারের বিপরীতে টাকার মান দিনদিন কমিতেছে। এই সামগ্রিক চাপ মোকাবিলায় জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি করা ছাড়া কি সরকারের কোনো গত্যন্তর ছিল না? কেননা জ্বালানি এমন একটি বিষয়, যাহার মূল্য বৃদ্ধি করা হইলে সকল কিছুতেই তাহার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অনেকেই বলিতেছেন, সরকারি সংস্থাগুলির সিস্টেম লস, অনিয়ম, অদক্ষতা, অপচয় ও দুর্নীতি দূরীকরণে মনোযোগ না দিয়া গ্যাসের এই মূল্যবৃদ্ধি অযৌক্তিক ও অন্যাঘ্য। তাহাদের মতে, ইহা উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর শামিল। তবে তাহার চাইতেও বড় কথা হইল, মূল্য বৃদ্ধি করার পরও কি নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ পাওয়া যাইবে? বিশেষ করিয়া শিল্পমালিকগণ কি এখন চাহিদামাফিক পর্যাপ্ত গ্যাস পাইবেন? তাহাদের কি ইহার নিশ্চয়তা দেওয়া যাইবে? কেননা সরবরাহ লাইনে গ্যাসের চাপ কম থাকিলে এবং বিদ্যুৎ ঘনঘন যাওয়া-আসা করিতে থাকিলে উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হইবার পাশাপাশি কলকারখানার মেশিনারিজ নষ্ট হইয়া যায়। শ্রমিকদের ঠিকমতো কাজে লাগানো যায় না। অথচ তাহাদের বেতনভাতা, ব্যাংক ঋণ ইত্যাদি ঠিকই পরিশোধ করিতে হয়। এমনকি কাঙ্ক্ষিত হারে গ্যাস না পাইলেও বিল ঠিকই দিতে হয়, যাহার কারণেও তাহারা ক্ষতিগ্রস্ত হন। অতএব, আমাদের একান্ত কামনা, মূল্য বৃদ্ধি পাইলেও অন্তত শিল্পকারখানায় গ্যাস-বিদ্যুৎ যেন নিয়মিত পাওয়া যায়। এই বিষয়টি সরকারের নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাহাতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা হইলেও নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং কর্মসংস্থানের গতি বজায় থাকে।

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন