প্রায় ২৪ বছর আগে আমাদের দেশে বন্দর সহযোগী শিল্প হিসেবে ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো বা আইসিডি চালু হয়। চালুর পর এবারই প্রথম বড় দুর্ঘটনা ঘটল। এমন দুর্ঘটনা রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য বড় ধাক্কা।
শনিবার রাতে সীতাকুণ্ডে বিএম ডিপোতে বিস্ফারণের ঘটনায় ৪১ জন নিহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপ পরিণত হয়েছে ডিপোটি। আমদানি-রপ্তানি পণ্য পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ডিপোর শেডে যেসব পণ্য ছিল সবই পুড়ে গেছে। কনটেইনারের পণ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের পরই জানা যাবে আসল পরিস্থিতি।
জেনে রাখা দরকার, চট্টগ্রামের ১৯টি ডিপো দেশের মোট রপ্তানির ৯০ শতাংশ ব্যবস্হাপনা করে। ধারণা করা যায়, এ বছর রপ্তানি ৫০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে। তাহলে ৯০ শতাংশ বা ৪৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ব্যবস্থাপনা হবে ১৯টি ডিপো থেকেই। আবার পোশাকশিল্পের কাঁচামাল তুলাসহ ২৮ ধরনের আমদানি পণ্য বন্দর থেকে ডিপোগুলোতে এনে খালাস করা হয়। একসময় বন্দরেই রপ্তানি পণ্য কনটেইনারে স্টাফিং হতো। এখন আইসিডিতে হচ্ছে। রপ্তানি বাড়ার সঙ্গে আইসিডির ওপর চাপও বাড়ছে।
অগ্নিকাণ্ড থেকে কীভাবে এত বড় বিস্ফারণের ঘটনা ঘটল তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে। তবে আগুন লাগার পর কেমিক্যালে ছড়িয়ে পড়ায় যে বিস্ফারণের ঘটনা ঘটেছে তা বেরিয়ে এসেছে। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, এই ডিপো কমপ্লায়েন্স মেনে চলেছে কি না? আইসিডি শিল্পের বয়স ২৪ বছর হয়ে গেছে। এই শিল্পের জন্য দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক আইনকানুন আছে। তদন্তকারী কর্মকর্তারা নিশ্চয়ই তা খতিয়ে দেখবে।
আইসিডিগুলো পরিচালনার জন্য বন্দরের অনুমতি ও রাজস্ব বোর্ডের প্রজ্ঞাপনের আলোকে কাস্টমস থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। সেই লাইসেন্সের শর্ত ব্যত্যয়ের কথা নানা সময় পরিদর্শনের পর উঠে এসেছে। তবে কোনো কঠিন ব্যবস্হা নেওয়ার কথা শোনা যায়নি। আমাদের যে হারে রপ্তানি পণ্য বাড়ছে সেই হারে আইসিডির সংখ্যা বাড়েনি। অবস্থা এমন হয়েছে যে, কঠিন ব্যবস্থা নিলে রপ্তানিতেই সমস্যা হবে। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও যদি ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্সদের সহজ শর্তে বন্ডেড ওয়্যার হাউজের অনুমতি প্রদান করা হতো, তাহলে এই সংকট অনেকাংশে সমাধান হয়ে যেত।
সরকারের অনুমোদিত নীতিমালার আলোকে পরিচালিত কনটেইনার ডিপোতে কেমিক্যাল তথা বিপজ্জনক পণ্য সংরক্ষণের নীতিমালা বাস্তবায়নে ঘাটতি থাকতে পারে। যথাযথ কর্তৃপক্ষ যদি তদারক করত, তাহলে ডিপোগুলো অবহেলার সুযোগ পেত না।
এই দুর্ঘটনায় রপ্তানিকারকেরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তেমনি বিদেশি ক্রেতারাও ক্ষতির মুখে পড়েছে। কারণ কারখানা থেকে ডিপোতে রপ্তানি পণ্য এনে বিদেশি ক্রেতাদের প্রতিনিধিদের হাতে তুলে দিয়েছেন রপ্তানিকারকেরা। রপ্তানিকারকদের দায়দায়িত্ব শেষ। এখন পণ্য পুড়ে যাওয়ায় ক্ষতি হলো বিদেশি ক্রেতাদের। কারণ সে পণ্য বুঝে পেয়েছে। আবার যেসব পণ্য বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি সেগুলো পুড়ে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন রপ্তানিকারকেরা।
আমার মনে হয়, বিপজ্জনক পণ্য হ্যান্ডলিং করার জন্য আলাদা ডিপোর অনুমোদন দেওয়া দরকার। অথবা যারা বিপজ্জনক পণ্য হ্যান্ডলিং করবে তাদের বিশেষায়িত ইয়ার্ড থাকতে হবে। প্রশিক্ষিত জনবল, ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি থাকা উচিত। ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের আইএমডিজি কোডে সবই আছে। কনভেনশনে থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। সেফটিও নিশ্চিত হচ্ছে না। বন্দর কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে গত কয়েক বছরে। শুধু বন্দরেই পদক্ষেপ নিলে হবে না। বেসরকারি ডিপোতেও একই পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ ডিপোর সব পণ্যই আনা-নেওয়া হয় বন্দর থেকে।
বিএম ডিপোর ঘটনার পর প্রশিক্ষণেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ বন্দর ব্যবহারকারী শিপিং এজেন্টস, কনটেইনার ডিপোর লোকবল, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরাও বিপজ্জনক (ডিজি) পণ্য ব্যবস্থাপনায় যুক্ত থাকে। তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। মেরিটাইম অ্যাডমিনিস্ট্রেশন হিসেবে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
মনে রাখা দরকার, দেশের অর্থনীতির প্রধান প্রাণ চট্টগ্রাম বন্দর। বন্দরের চাপ মোকাবিলা করছে ডিপোগুলো। দেশের অর্থনীতি বড় হচ্ছে। করোনা অতিমারির পরে বাংলাদেশের রপ্তানির বাজার, বিশেষ করে পোশাকশিল্পের বাজার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের সুনাম বাড়ায় রপ্তানি ক্রয় আদেশ বাড়ছে। প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে এই খাতের সঙ্গে প্রায় ৩ কোটি মানুষের আয় ছাড়া ও প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের মাধ্যম। এমন মাধ্যমে পর্যাপ্ত সেফটি থাকবে—এটাই প্রত্যাশা।
আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর বিএম ডিপোতে যেসব রপ্তানি পণ্য অক্ষত আছে তা যেন দ্রুত রপ্তানির ব্যবস্থা নেওয়া হয়। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলে বিদেশি ক্রেতার মনে সংশয় থাকবে না। দেশের ভাবমূর্তিও বাড়বে।
বিএম ডিপো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—সেফটি যদি যথাযথভাবে নেওয়া না হয়, তাহলে বিপদের মাত্রা কত বড় হতে পারে! এ ধরনের ঘটনা দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য দুশ্চিন্তার। নতুন করে আরেকটি বড় ঘটনার আগে আমরা যেন নিজেরা সতর্ক হই, সেদিকে নজর দিতে হবে। আর সরকারি সংস্থাগুলো ডিপো পরিচালনকারীরা ঠিকভাবে সব করছে কি না, তা যেন বাস্তব তদারকি করে—সে আহ্বান জানাই।
লেখক : সহসভাপতি, বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাফা)
