মনুষ্যসৃষ্ট বহুবিধ সমস্যার মোকাবিলা করিতে হইতেছে প্রকৃতিকে। বিরতিহীন অবিবেচক কর্মকাণ্ডে প্রকৃতির আজ নাজুক অবস্থা। অযত্ন, অবহেলা, খামখেয়ালিপনায় পরিবেশ-প্রতিবেশ বিবর্ণ হইয়া উঠিয়াছে। প্রকৃতির এই জরাজীর্ণ অবস্থার জন্য দায়ী আমরাই। প্রকৃতির ক্রোড়ে লালিত-পালিত হইয়া তাহারই প্রাণশক্তিকে শুষিয়া লইতেছি আমরা। প্রকৃতির টিকিয়া থাকিবার প্রশ্নে রক্তসঞ্চালনের ন্যায় কাজ করে ‘জলাধার’। প্রকৃতির জন্য ইহা একটি বিশেষ নিয়ামক। পানির বৃহৎ আধার সমুদ্রকে বলা হয় ‘পৃথিবীর রক্তপ্রবাহ’। অথচ এই রুধির ধারার পথে বাধা হইয়া দাঁড়াইয়াছি স্বয়ং আমরাই!
মহাসমুদ্রগুলিকে মহাভাগাড়ে পরিণত করিবার সম্পূর্ণ দায় মানবসমাজের। অক্সিজেনের ৩০ শতাংশের জোগান আসে সমুদ্র হইতে, অথচ এই অক্সিজেন-ভাণ্ডারকে বিনষ্ট করিয়া চলিয়াছি আমরা। নির্বিচারে দূষণ করিতেছি সাগর-মহাসাগর। গবেষণায় উঠিয়া আসিয়াছে, বৎসরে ২৫০ মিলিয়ন টন বর্জ্য নিক্ষিপ্ত হইতেছে সমুদ্রে। এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্যে ভয়াবহ দূষণের কবলে পড়িয়া সমুদ্রজগৎ বিপন্ন হইয়া উঠিয়াছে। গভীর সংকটাপন্ন অবস্থায় রহিয়াছে সমুদ্রসম্পদ। প্রাকৃতিক পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতির পাশাপাশি বহু সামুদ্রিক প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটিয়াছে। হুমকির মুখে পতিত হইয়াছে ‘ব্লু ইকোনমি’, ‘গ্রিন লিভিং’।
বাংলাদেশের মোট সমুদ্রাঞ্চল ১ লক্ষ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার। সমুদ্রদূষণ ঠেকাইতে না পারিলে আমাদের আওতাধীন এই বিস্তীর্ণ এলাকার জলজ প্রাণিজগৎ বিপন্ন হইয়া পড়িবে। হুমকির মুখে পড়িবে জলবায়ু, মানবসভ্যতা। কাজেই, সমুদ্রসম্পদ লইয়া আমরা যেই সকল আশার বাণী শুনিয়া আসিতেছি, তাহাকে বাস্তবরূপ দান করিতে হইলে সমুদ্রদূষণের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়া ভাবিতে হইবে—যদিও লম্বা সময় অতিক্রান্ত হইয়া গিয়াছে। সাম্প্রতিক সময়ে ডলফিন, তিমি, শুশুকসহ বৃহৎ আকৃতির সামুদ্রিক প্রাণীকে উপকূলের কাছাকাছি আসিতে দেখা যাইতেছে। ইহারা অতিমাত্রায় প্লাস্টিক-দূষণের শিকার।
একইভাবে ভয়াবহ দূষণে রোগাক্রান্ত ও আহত অবস্থায় রহিয়াছে বিপুলসংখ্যক সামুদ্রিক জীব। এই ছোট্ট বদ্বীপকে আগলাইয়া রাখিবার মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের বিপুল সমুদ্রসম্পদ তথা সমুদ্র অর্থনীতি লইয়া সোনালি স্বপ্ন বুনিতেছি আমরা। ইতিপূর্বে সমুদ্রবিজয় নিশ্চিত করিয়া অমিয় সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করিয়াছি আমরা। বাংলাদেশের সমুদ্রাঞ্চল বিপুল মত্স্যভান্ডারসহ অফুরন্ত প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ। তেল-গ্যাসসহ নানাবিধ খনিজসম্পদ সঞ্চিত রহিয়াছে সাগরের তলদেশে। এই বিষয়টি মাথায় রাখিয়া সমুদ্রাঞ্চলে দূষণ কমাইতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে।
সমুদ্রসম্পদের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্বের বহু দেশ উন্নয়ন লাভের চেষ্টা করিতেছে। আমাদেরকেও সমুদ্রসম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার লাভে সমুদ্রদূষণ রোধে টিকসই কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করিতে হইবে। শুধু দিবস পালনের মধ্যেই কার্যক্রম সীমিত রাখিলে চলিবে না, দূষণ কমাইয়া কীভাবে সমুদ্রের স্বাভাবিকতা বজায় রাখা যায়—তাহা লইয়া ভাবিতে হইবে। ১৯৭২ সালের পূর্বে সমুদ্রদূষণ লইয়া কোনো নীতিমালার প্রচলন ছিল না; এখন আছে বিধায় তাহা অনুসরণ করিতে হইবে। গবেষণায় পাওয়া গিয়াছে, দূষণের মাত্রা কমাইতে না পারিলে ২০৪০ সাল নাগাদ সমুদ্রে ৬০ কোটি টন প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হইবে। বর্তমানে প্রতি বর্গকিলোমিটার সমুদ্রাঞ্চল দখল করিয়া আছে ৫০ হাজার প্লাস্টিক বোতল—এই চিত্রের আশু পরিণতি লইয়া আমরা কতটুকু ভাবিতেছি?
কেমিক্যাল, রাসায়নিক, মেডিক্যাল, তেজস্ক্রিয়, শিল্পকারখানা—গৃহস্থালি বর্জ্য পরিবেশে উন্মুক্ত হইয়া পড়িতেছে—ইহাদের শেষ আশ্রয়স্থল সমুদ্র। এই সকল বর্জ্য সামুদ্রিক পরিবেশের সুস্থতা-স্বাভাবিকতায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করিতেছে বিধায় ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। বন্ধ করিতে হইবে সমুদ্রের পানিতে বর্জ্য নিক্ষেপ। জলবায়ু ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে বৈশ্বিক মিছিলে শামিল হইয়া বাংলাদেশকে আওয়াজ বাড়াইতে হইবে সমুদ্রদূষণের বিরুদ্ধে। দেশের সমুদ্রসম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতে সমুদ্রদূষণের যবনিকা পতন ঘটাইতে হইবে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় সত্য, তবে তাহা নিতান্তই অপ্রতুল। ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের ৪ কোটি মানুষ সমুদ্রভিত্তিক শিল্পের সহিত যুক্ত হইবে। এই সম্ভাবনার বড় অংশীদার বাংলাদেশ। উজ্জ্বল সম্ভাবনার এই বার্তা জনগণের মধ্যে ছড়াইয়া দিতে হইবে। সচেতনতা ছড়াইয়া দেওয়ার মাধ্যমে বজায় রাখিতে হইবে সমুদ্রাঞ্চলের সুস্থ-স্বাভাবিক পরিবেশ।
