মাটিদূষণ: মাটির মৃত্যু

আপডেট : ১১ জুন ২০২২, ০৪:৫৬

ফসলি জমি থেকে মাটির আবশ্যিক জৈব পদার্থের অনুপস্থিতি ক্রমশই মাটিকে নিথর করে দেয়। এর কারণ হিসেবে অত্যধিক রাসায়নিক সারের ব্যবহার, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ইটভাটায় অত্যধিক টপ সয়েল (কর্ষণীয় মাটি)-এর ব্যবহার, শিল্প কারখানা ঘটিত দূষণ, বৃক্ষ নিধন, পেট্রোলিয়াম ও বিভিন্ন ভারী ধাতু দ্বারা বায়ুদূষণ, মাটিতে ইলেকট্রনিক এবং মেডিক্যাল বর্জ্য জমা ইত্যাদিকে বিশেষজ্ঞরা দায়ী করে থাকেন। মাটি পৃথিবীর উপরিভাগের নরম আবরণ। আমরা সহজে মাটি পেয়ে যাই, কিন্তু মাটি এত সহজে গঠিত হয় না।

জৈব পদার্থের উপস্থিতিতে ভূমিক্ষয় আবহবিকার, বিচূর্ণিভবন ইত্যাদি প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক পরিবর্তনের মাধ্যমে পাথর থেকে মাটির উদ্ভব হয়েছে। ভূ-ত্বক, জলস্তর, বায়ুস্তর এবং জৈবস্তরের মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে পাথর থেকে তৈরি হয় মাটি। অনেক প্রক্রিয়া অতিক্রম, প্রভাবকের উপস্থিতি, অনেক সময় অতিবাহিত হওয়ার পর মাটি গঠিত হয়। আসলে মাটি মূলত জড় পদার্থ হলেও তা জীবন্ত সম্পদের মতোই। মাটির নিচেই বসবাস পৃথিবীর এক-চতুর্থাংশ জীববৈচিত্র্য। মাটিতে বসবাসকারী অণুজীব মাটিতে কার্বন জমা হতে সাহায্য করে ও গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। এইসব অণুজীব মাটিতে মিশে থাকা নানা ধরনের দূষিত পদার্থ নষ্ট করে মাটিকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। মাটির ক্ষতি হওয়ার অর্থই হচ্ছে আমাদেরই ক্ষতি হওয়া। 

প্রভাবশালী সাময়িকী ফোর্বস লিখেছে, ‘পৃথিবীতে খুব দ্রুত মাটির গুণ নষ্ট হওয়ার সংবাদ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য নিঃসন্দেহে দুঃসংবাদ।’ মাটির উর্বরতা নষ্ট হওয়া, কার্বন ধারণের ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া ও মাটির জীববৈচিত্র্য কমে যাওয়ায় বাস্ত্ততন্ত্রে তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা। বর্তমানে স্বাস্থ্যকর মাটির আকাল দেখা দিয়েছে। এশিয়া-প্যাসিফিকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মাটিতে জৈব পদার্থের উপস্থিতি ২%-এর নিচে নেমে এসেছে। যেখানে ৫% জৈব পদার্থের উপস্থিতি মাটির জন্য সবচেয়ে ভালো এবং ন্যুনতম ২% থাকা আবশ্যক। মাটি সার পুনর্ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু শিল্প বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করতে পারে না। এভাবে শিল্পদূষণের কারণে ওপরের মাটি প্রাণহীন হয়ে পড়ছে। ইটভাটাগুলো আরো একটি বড় দূষণের কারণ, যা সরাসরি মাটিকে ধ্বংস করে থাকে। মাটি, পানি এবং বায়ু দূষণ পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এবং একটি চক্রের মতো দূষিত হয়। দূষিত বায়ু এবং জল শেষ পর্যন্ত মাটিতে জমা হয়। এবং এই ধরনের ক্ষতি শুধু কৃষির জন্যই নয়, অন্যান্য গাছপালা এবং জীবাণুরও ব্যাপক ক্ষতি করে। 

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং দুটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রতি মাটিতে ১১টি ভারী ধাতুসহ সহনীয় মাত্রার চেয়ে ৩৮গুণ বেশি কোবাল্ট এবং ১১২গুণ বেশি ক্রোমিয়াম খুঁজে পেয়েছে। বাংলাদেশে প্রায় ১০ লাখ লেড (সিসা) ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রয়েছে। বাংলাদেশে সিসা পুনর্ব্যবহারের অভাবে এই ব্যাটারিগুলি ছয় থেকে আট মাস অন্তর পরিবর্তন করা প্রয়োজন হয়। এছাড়া শিল্প-কলকারখানা, খনি, কৃত্রিম স্যার, বালাইনাশক/কীটনাশক, রং, নর্দমার ময়লা কাদা, বর্জ্য পানি, পোড়ানো কয়লার অবশিষ্টাংশ, পেট্রো-কেমিক্যালস ইত্যাদি উৎস থেকে বিভিন্ন পদার্থ (পারদ, ক্যাডমিয়াম, তামা, ক্রোমিয়াম, আর্সেনিক, লোহা, দস্তা, জিংক, টিন, ম্যাগনেসিয়াম, সিসা, কোবাল্ট) মাত্রাতিরিক্তভাবে মাটিতে মিশে যাওয়ার ফলে সেই মাটি দূষিত হয়ে পড়ছে। অণুজীব, উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের জন্য তা হচ্ছে ক্ষতির কারণ। 

গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে প্লাস্টিকও মাটি দূষণের উৎস হয়ে উঠেছে। এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ৩৯ থেকে ৫২ শতাংশ এলাকায় মাটির উর্বরতা কম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ধান চাষের জন্য প্রয়োজনীয় দুটি উপাদান গন্ধক ও দস্তার পরিমাণও দেশের ৪০ শতাংশ এলাকায় কম। মাটিতে পাঁচ মিলিমিটার থেকেও কম দৈর্ঘ্যের ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার (মাইক্রোপ্লাস্টিক) অস্তিত্ব ধরা পড়েছে। এইসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা মাটিতে বসবাসকারী জীবকুলের জন্য ক্ষতিকর। বাংলাদেশকে অবশ্যই শিল্প এলাকায় বর্জ্য শোধনাগারের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, বর্তমানে প্রচলিত ক্ষতিকর ইটভাটায় ওপরের মাটির ব্যবহার বন্ধ করে পরিবেশবান্ধব ইটের ব্যবহারকে উত্সাহিত করা জরুরি। সুস্থ মাটির জন্য মাটিতে জৈব ও অজৈব পদার্থের পরিমাণ নির্ণয়ের সঙ্গে সঙ্গে তার জীববৈচিত্র্য শনাক্ত ও তাদের প্রাচুর্য নির্ণয় করতে হয়। 

কিন্তু এই কাজ করতে গেলে যত ধরনের বিশেষজ্ঞ এবং যে ধরনের অবকাঠামো প্রয়োজন তা আমাদের দেশে নেই। একদিনে তা তৈরি হবেও না। তবে নীতিগতভাবে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিলে কয়েক বছরে এক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করতে হলে এগুলো বিবেচনায় নিয়ে সেই মোতাবেক কাজ করা প্রয়োজন। ভবিষ্যতের হুমকি এড়াতে এবং মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অতিশীঘ্রই আমাদের সোচ্চার হওয়া উচিত। পরিবেশবান্ধব মাটির জন্য সহায়ক প্রযুক্তি ব্যবহার এখন সময়ের দাবি। 

শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।

ইত্তেফাক/এএইচপি