নিরাশ্রয়দের পুনর্বাসনে আইন যা বলে

আপডেট : ১২ জুন ২০২২, ০৯:৫৪

বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দেওয়া দারিদ্র্যের সংজ্ঞা অনুযায়ী— দরিদ্র বলতে জীবনযাত্রার ন্যূনতম মানের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদের মালিকানা ও ব্যবহারের অধিকার থেকে বঞ্চিত মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানসিক অবস্থাকে বোঝায়। সহজ ভাষায় ন্যূনতম পরিমাণ আয়-উপার্জনের অক্ষমতাকেই দারিদ্র্য বলে ধরা হয়। আবার দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়— মোটামুটি দরিদ্র ও চরম দরিদ্র জনগোষ্ঠী। যেমন বর্তমানে যাদের দৈনিক আয় ১৫০ টাকার কম, তারাই চরম দরিদ্র।

টেকসই ও পরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে এবং দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে। ফলে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছে। বিগত এক যুগে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন অভাবনীয় এবং বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশ দারিদ্র্যবিমোচনে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। পুলিত্জার বিজয়ী মার্কিন সাংবাদিক নিকোলাস ক্রিস্টো মন্তব্য করেছেন, দারিদ্র্যবিমোচনে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হতে পারে বাংলাদেশ। তিনি আরো বলেন, একসময় হতাশার প্রতিমূর্তি হয়ে ওঠা বাংলাদেশ এখন অনেক দেশের উন্নোয়নের মডেল হতে পারে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশের ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে দারিদ্রের হার ছিল ৯০ শতাংশ; ২০০৫-এ ছিল ৪০ শতাংশ; ২০১৬-এ ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ; ২০১৮তে ২১ দশমিক ৮ শতাংশ; এবং ২০১৯ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে। ১৯৭২ সালে দেশে চরম দরিদ্র জনগোষ্ঠী ছিল মোট জনসংখ্যার ৪৪ শতাংশ; ২০০০ সালে ৩৪ শতাংশ ও ২০১৮ সালে ১১ দশমিক ৩ শতাংশে এবং ২০১৯ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১০ শতাংশে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যবিমোচনে ২০০০ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক আটটি মধ্যমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা গৃহীত হয়েছিল। প্রথম লক্ষ্যমাত্রায় দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারী ৫৮ শতাংশ জনসংখ্যাকে ২০১৯ সালের মধ্যে ২৯ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই বাংলাদেশ সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে।

বিগত দুই বছরে করোনা মহামারির প্রকোপে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও অনেক মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমায় চলে এসেছে। তবে সময়ানুগ সঠিক দিকনির্দেশনায় বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর ফলে দারিদ্রে্যর হার ২৫ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। বর্তমান প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ হতদরিদ্রের হার ৩ শতাংশের কাছাকাছি নেমে আসবে। হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ও জীবিকার কঠোর সংগ্রামে সহায়তার জন্য সরকারি ব্যয়ের একটা অংশ সামাজিক নিরাপত্তা তৈরিতে বিভিন্ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ করা হয়।

দেশের বিভিন্ন স্থানে মোট ৬টি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে ভিক্ষুকদের পুনর্বাসনের জন্য। সরকার বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, মাতৃত্ব ভাতা, দুগ্ধ ভাতা, হরিজন ভাতা, জেলে ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, হিজড়া ভাতাসহ আরো অন্যান্য ভাতা প্রদান করছে এবং দারিদ্র্যবিমোচনে এসব প্রকল্প কোন পদ্ধতিতে সুফল বয়ে আনতে পারে তা নিয়ে পরিকল্পনা ও গবেষণা বিদ্যমান আছে। দারিদ্র্যবিমোচনে ব্যাপক গবেষণার জন্য ২০১২ সালে বঙ্গবন্ধু দারিদ্র্যবিমোচনে ও পল্লি উন্নয়ন একাডেমি আইন প্রণয়ন করা হয়। বর্তমানে সমন্বিত দারিদ্র্যবিমোচন কর্মসূচি চলমান রয়েছে। এতত্সত্ত্বেও ভিক্ষাবৃত্তি ও ভিক্ষুক বিড়ম্বনা কমানো যাচ্ছে না। অনেকের মতে, যারা ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িত, তাদের সিংহভাগ পেশাদারি। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, এরা জাতীয় উন্নয়নের অংশীদার হচ্ছে না এবং সমাজের জন্য বোঝা হয়ে গেছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের মতে, হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভিক্ষাবৃত্তি দেশের এগিয়ে যাওয়ার পথে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা। সমাজসেবা অধিদপ্তরের হিসাবমতে, সারা দেশে প্রায় ৭ দশমিক ৫ লাখ ভিক্ষুক রয়েছে, যাদের অর্ধেক বাস করে রাজধানীতে। ভিক্ষুক ও ভবঘুরেদের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে ২০১০ সালে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ভিক্ষুক পুনর্বাসন প্রকল্প হাতে নেয়। তারই ধারাবাহিকতায় ভিক্ষুক ও ভবঘুরেদের জরিপ করা হয় এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়। এই প্রকল্পের অধীনে অর্থও বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু কার্যত দেখা যায়, পুনর্বাসনের আওতায় যেসব ভিক্ষুককে আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানো হয়ে থাকে, তাদের অনেকেই পালিয়ে গিয়ে আবারও ভিক্ষাবৃত্তিতেই ফিরে যায়। ভিক্ষাবৃত্তি ঠেকাতে সরকার রাজধানীর কিছু এলাকাকে ভিক্ষুকমুক্ত ঘোষণা করে। এতস্বত্ত্বেও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে, ফুটপাতে, সিগন্যালে, এমনকি ভিআইপি সড়কেও দেখা মেলে অসংখ্য ভিক্ষুক ও ভবঘুরের। ঈদে-পার্বণে ভিক্ষুকের সংখ্যা আরো বেড়ে যায়। এদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন যেমন হতে হয়, তেমনি শিকার হতে হয় হয়রানিরও। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সমস্ত অর্জন পরোক্ষভাবে ম্লান হয়ে যায় যত্রতত্র ঘুরতে থাকা ভিক্ষুকদের বিড়ম্বনায়। পর্যটনশিল্প ও বিদেশি বিনিয়োগ সূক্ষ্মভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এসব ভবঘুরে ও ভিক্ষুকের কারণে।

একশ্রেণির মানুষের কর্মবিমুখতা এবং কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষের অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে ভিক্ষাবৃত্তির প্রসার বৃদ্ধি পায়। ভিক্ষাবৃত্তি কোনো বৈধ পেশা নয়, অনেক ভবঘুরে ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে অর্থ উপার্জনের উপায় হিসেবে ভিক্ষাবৃত্তিকে বেছে নেয়। ভিক্ষুক ও ভবঘুরেদের পুনর্বাসনের জন্য ২০১১ সালে প্রণয়ন করা হয় ভবঘুরে ও নিরাশ্রয় ব্যক্তি পুনর্বাসন আইন, ২০১১। এই আইনের অধীনে ঢাকা ও অন্যান্য জেলায় এক বা একাধিক আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করে সেখানে ভবঘুরে ও নিরাশ্রয় ব্যক্তিকে আশ্রয়দান, নিয়ন্ত্রণ, পুনর্বাসন ও সামাজীকরণের বিধান রাখা হয়েছে। প্রচলিত আইন অনুযায়ী জোরপূর্বক বা প্ররোচনার মাধ্যমে কাউকে ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত করাও দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ধরনের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৬-এর আওতায় শাস্তি নিশ্চিত করার বিধান রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১২ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি ভিক্ষাবৃত্তি বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রির উদ্দেশ্যে কোনো শিশুর হাত-পা, চোখ বা অন্য কোনো অঙ্গ বিনষ্ট করে বা বিকৃতি করে, তবে ঐ ব্যক্তি মৃতু্যদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে এবং অর্থদণ্ডও আরোপ করা হবে। শিশু আইন, ১৯৭৪-এর ৩৫ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি ভিক্ষার উদ্দেশ্যে কোনো শিশুকে ব্যবহার করে, তবে সেই ব্যক্তি এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ৩০০ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। ১৯৭৬ সালের অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, যদি কেউ সড়কে বা উন্মুক্ত স্থানে শরীরের ক্ষত বা অঙ্গহানির অবস্থা দেখিয়ে টাকা নেয়, তবে তা শস্তিযোগ্য অপরাধ। এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ এক মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। শিশু ভিক্ষাবৃত্তিসহ সব ধরনের ভিক্ষাবৃত্তি রোধে এবং ১৯৭৬ সালের অধ্যাদেশটি কার্যকর করতে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের একটি আদেশও রয়েছে।

ভিক্ষাবৃত্তির লজ্জা থেকে জাতিকে মুক্ত করতে সরকারি প্রকল্পগুলোকে আরো জোরদার করতে হবে এবং ভিক্ষুকদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। যেসব বিত্তবান দরিদ্রের সহায়তা করতে চান, তারা কীভাবে সরকারি প্রকল্পগুলোতে আর্থিক অনুদান বা জাকাত প্রদান করতে পারেন, তারও পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। ভিক্ষুকদের ভিক্ষাবৃত্তি ত্যাগ করে সম্মানজনক পেশায় যেতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ আরো ব্যাপক প্রচারণা চালাতে পারে। ভবঘুরে ও ভিক্ষুকদের সমাজের মূলধারায় আনার জন্য সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এবং জনগণের সম্পৃক্ততা ও সমন্বিত পদক্ষেপ একান্তই জরুরি। ভিক্ষাবৃত্তি নির্মূল করতে হলে সম্পদের সুষম বণ্টন এবং সব শ্রেণির মানুষের সমতা ও ন্যাঘ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। ভিক্ষাবৃত্তি নির্মূল করা না গেলে দারিদ্যবিমোচনে বাংলাদেশের যে সাফল্য, তা ম্লান হয়ে যায়।

লেখক: ব্যারিস্টার অ্যাট ‘ল’, গবেষক

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন