করোনার ধকল কাটাইয়া স্বাভাবিক জীবনে ফিরিতে প্রাণপণ চেষ্টা করিতেছে মানুষ। নানান প্রতিকূলতাকে পাশ কাটাইয়া চলিতে হইতেছে তাহাদের। এই সকলের মধ্যেও থামিয়া নাই অসাধু ব্যক্তি-গোষ্ঠীর অনৈতিক কর্মকাণ্ড। ঠগ বাছিতে গাঁ উজার হইবার মতো ইহাদের সংখ্যা। কোথায় নাই ইহারা? উদাহরণ হিসাবে আমরা বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা তুলিয়া ধরিতে পারি। ঘরে ঘরে আলো পৌঁছাইয়া দিতে সরকার যেই মহত্ প্রচেষ্টার বাস্তবায়ন ঘটাইয়াছে, তাহাকে ম্লান করিয়া দিতেছে বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার চোরেরা। এই ধরনের চোরদের উৎপাত অতীতেও ছিল, সম্প্রতি তাহাদের দৌরাত্ম্য ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাইয়াছে। বিগত এক বৎসরের ব্যবধানে দেশের পাঁচটি জেলা হইতেই চুরি হইয়াছে প্রায় সাড়ে চার শত ট্রান্সফরমার। ইহাতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট বাড়িয়াছে, যাহার ফলে শিল্পকারখানার উৎপাদন-বিপণন বিঘ্নিত হইয়াছে। আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে রাত কাটাইতে হইয়াছে অন্ধকারের মধ্যে। যেইখানে একটা নূতন ট্রান্সফরমারের সংযোগ পাইতে লম্বা সময় অপেক্ষার প্রহর গুনিতে হয়, সেইখানে একটি সচল ট্রান্সফরমার চুরি হইয়া গেলে ভোক্তার ভোগান্তি কোন পর্যায়ে উপনীত হয়—তাহা সহজেই অনুমেয়।
ট্রান্সফরমার চুরির ফলে মোটা দাগে যেই সমস্যাটি মাথাব্যথার কারণ হইয়া উঠিতেছে তাহা হইল, সেচব্যবস্থা বিঘ্নিত হইয়া কৃষি উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটা। ইহার পাশাপাশি কলকারখানা শাটডাউন করিতে বাধ্য হইতেছেন উদ্যোক্তারা, বাসাবাড়ির ভোগান্তি চরমে উঠিতেছে—শিক্ষার্থীদের পড়াশুনায় ঘটিতেছে ব্যাঘাত। এই অবস্থা হইতে পরিত্রাণ পাইতে হিমশিম খাইতেছেন ভুক্তভোগীরা। কোনো কোনো এলাকায় ট্রান্সফরমার চোরকে ধরাইয়া দিতে পুরস্কারও ঘোষণা করা হইতেছে। টিম গঠন করিয়া রাত্রে পাহারার ব্যবস্থা চলিতেছে। নানামুখী উদ্যোগের পরও মিলিতেছে না নিষ্কৃতি। অভিযোগ রহিয়াছে—সংশ্লিষ্ট বিভাগের একশ্রেণির অসত্ কর্মকর্তা-কর্মচারী এই অপকর্মের সহিত যুক্ত। ভুক্তভোগীদের দাবি, বড় আকৃতিবিশিষ্ট ট্রান্সফরমার এত উঁচু হইতে নামানো সাধারণ মানুষের পক্ষে দুষ্কর; সংশ্লিষ্ট বিভাগের লোকজন জড়িত না হইলে এই ধরনের দুষ্কর্ম দিনের পর দিন চালাইয়া যাওয়া কঠিন। পরিস্থিতি বিবেচনায় ভুক্তভোগীদের যৌক্তিক অভিযোগ আমলে লইতেই হয়।
এমনিতেই মহামারি শেষে নূতন করিয়া ঘুরিয়া দাঁড়াইবার সময় এখন। এমন একটি সময়ে বিদ্যুতের গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম চুরি বন্ধ করিতে না পারিলে ফলাফল নেতিবাচক হইয়া উঠিবে—উৎপাদন হইতে শুরু করিয়া জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইহার কুপ্রভাব পড়িবে। বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার চোরদের ধরিতে না পারিবার ব্যর্থতার দায় রহিয়াছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীরও। তাহাদের নাকের ডগা দিয়া ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা রুটিনে পরিণত হইয়া উঠিতে পারে কী করিয়া? গ্রামাঞ্চলে গ্রাম পুলিশই-বা করিতেছে কী? নিয়মানুযায়ী প্রথম বার ট্রান্সফরমার চুরি হইলে নূতন ট্রান্সফরমার লইতে গ্রাহককে মোট মূল্যের অর্ধেক বহন করিতে হয়। ইহার পর চুরি হইলে পুরা আর্থিক দায়ভার বর্তায় গ্রাহকের উপর। সাধারণ গ্রাহক এই নিয়ম মানিয়া লইবেন কেন? মানুষের রোজগার কমিয়াছে। আয়ব্যয়ের সমন্বয়সাধনে মানুষ কর্মমুখী হইয়া উঠিয়াছে। এইরূপ পরিস্থিতিতে ট্রান্সফরমার চুরি করিয়া মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলানো কিংবা কাজকর্মে বিঘ্ন সৃষ্টি করিয়া তাহাদের রোজগারের পথ রুদ্ধ করিয়া তোলা দেশকে পিছনের দিকে টানিবার শামিল।
একদা ‘ট্রান্সফরমার নিরাপদ যন্ত্র’ আবিষ্কারের সংবাদ শোনা গিয়াছিল। তাহার বাস্তবায়নের বিষয়ে পরবর্তীকালে কোনো খবর শোনা যায় নাই। এই জাতীয় আরো উদ্যোগ লওয়া হইতেছে না কেন—ইহাও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। নিয়মিত ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা ঘটিতেছে, ট্রান্সফরমার চুরির সময় ঘটিতেছে প্রাণহানির ঘটনাও। ইহার পরও ট্রান্সফরমার চুরি বন্ধে টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইতেছে না কেন? ট্রান্সফরমার চুরি বন্ধ করিতে অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। উত্পাদনব্যবস্হা সচল রাখিবার স্বার্থেই শুধু নহে, গ্রাহক পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-সংযোগ নিশ্চিতে সরকারের উদ্যোগকে ত্বরান্বিত করিবার প্রশ্নেও ইহা অতি জরুরি।
