মানসিক ভারসাম্যহীন লোক ও ভবঘুরেদের পুনর্বাসন

আপডেট : ১৪ জুন ২০২২, ০৯:১৮

অর্থনৈতিক উন্নয়ন বলতে উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য হ্রাসকেও বোঝানো হয়ে থাকে। উৎপাদন বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থানের সুযোগসৃষ্টি, সুবিধাবঞ্চিত অসহায় মানুষের আর্থসামাজিক ও নৈতিক উন্নয়ন—সবই প্রকৃত উন্নয়নের জন্য একান্ত কাম্য। বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত অসহায় মানুষের একটি অংশ জুড়ে রয়েছে মানসিক ভারসাম্যহীন রোগী। গ্রামাঞ্চলে, শহরাঞ্চলে, হাটবাজার ও বিভিন্ন স্থানে এই শ্রেণির অসহায় মানুষের বিচরণ লক্ষ করা যায়। কেউ কেউ হয়তো জন্মগত অথবা কেউ কেউ অতি কষ্ট, যন্ত্রণা ইত্যাদি সহ্য করতে না পেরে এ অবস্থায় পতিত হয়েছেন। আমাদের সমাজে এ ধরনের মানুষের সংখ্যা একেবারে কম নয়।

মানসিক ভারসাম্যহীন রোগীদের পর্যবেক্ষণ করলে তাদের দুই গ্রুপে ভাগ করা যায়। প্রথম গ্রুপ—যারা মানসিক ভারসাম্যহীন; কিন্তু তাদের বাসস্থান রয়েছে এবং রয়েছে অভিভাবক। তারা সারা দিন বাইরে ঘোরাফেরা করে। রাতে বাসায় ফিরে আসে। দ্বিতীয় গ্রুপ হচ্ছে—মানসিক ভারসাম্যহীন শ্রেণি যাদের কোনো বাসস্থান নেই এবং তাদের আত্মীয়স্বজন আছে অথবা নেই। অত্যন্ত অসহায় এই শ্রেণির ভারসাম্যহীন মানসিক রোগীগণ যেখানে-সেখানে ঘুরে বেড়ায়। রাস্তায় খায়, পথেঘাটে, স্টেশনে যেখানে সুযোগ পায় সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ে। যেখানে সুযোগ পায়, সেখানেই প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়। অসুস্থ হলে রাস্তায় পড়ে থাকে, এদের দেখার কেউ নেই। এমনকি অনেকে রাস্তায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুবরণ করলে দাফন করা হয়। চরম দুর্দশাগ্রস্ত অসহায় মানুষগুলোর দায় আমরা একেবারে এড়াতে পারি না। তারা নিজেরা কষ্ট পান এবং তাদের জন্য পরিবেশ দূষিত হয়।

বেশ কয়েক বছর আগে, একবার কোনো এক প্রয়োজনে সিলেট শহরের আখালিয়ায় অবস্থিত সুরমা আবাসিক এলাকা থেকে তপবন আবাসিক এলাকায় যাচ্ছিলাম। সুরমা এবং তপবন আবাসিক এলাকার মাঝামাঝি স্থানে একটি স্থান রয়েছে যেখানে আশপাশের এলাকার ময়লা ফেলা হয়। দুর্গন্ধময় স্থানটির পাশ দিয়ে চলাচল করাই কঠিন হয়ে পড়ে। হঠাৎ খেয়াল করলাম আবর্জনা ফেলা স্থানটিতে এক অসহায় মানসিক ভারসাম্যহীন নারী খাবার সংগ্রহ করে খাচ্ছেন। চরম-দুর্দশাগ্রস্ত এই মানুষের দায় কি আমরা সবাই এড়াতে পারি? এরা কি আমাদের সমাজের অংশ নয়? কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কিছু টাকা দান করতেই আকাশের দিকে ইঙ্গিত করে কী যেন বোঝাতে চাইলেন ভারসাম্যহীন নারীটি। বসতহীন আমাদের সমাজের এসব অসহায় মানুষের সহায়তা একান্ত প্রয়োজন। আরো দেখা গেছে, এই ধরনের অসহায় মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষকে সরানোর জন্য শরীরে পানি ঢালা হচ্ছে। এছাড়াও মানসিক ভারসাম্যহীন এসব লোককে শিশুরা ভয় পায় অথবা শিশুরা এসব রোগীকে বিরক্ত করে। এদের সঙ্গে সহানুভূতিশীল আচরণ একান্ত কাম্য। এসব অসহায় মানুষের সহযোগিতার মাধ্যমে মহান সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জনের বিরাট সুযোগ রয়েছে।

বিভিন্ন জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী, পরিসংখ্যানবিদের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করলে অনুমান করা যায় দেশে এ ধরনের বাসস্থানহীন ভবঘুরে মানসিক ভারসাম্যহীন রোগীর সংখ্যা প্রায় ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার। রাজধানী ঢাকায় এদের সংখ্যা অধিক। গড়ে প্রতি জেলায় এদের সংখ্যা হতে পারে প্রায় ২০০ জন। এ হিসাবে দেশে মোট রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১২ হাজার ৮০০ জন। এবার আসা যাক, এ ধরনের মানসিক ভারসাম্যহীন লোক ও ভবঘুরেদের পুনর্বাসন প্রসঙ্গে। ধরি, দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে ভবঘুরে মানসিক ভারসাম্যহীন রোগীর জন্য পুনর্বাসনকেন্দ্র করা হবে। এ প্রসঙ্গে কথা হলো সিলেট শহরের লিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আমিনুল হকের সঙ্গে। তার মতে, দেশে যদি প্রতিটি জেলায় ৩০০ কামরাবিশিষ্ট এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন পুনর্বাসনকেন্দ্র তৈরি করা হয়, তবে প্রতিটি কেন্দ্রে জমির পরিমাণ প্রয়োজন প্রায় এক একর। যদি উপজেলা শহরের প্রায় দুই-তিন কিলোমিটার আশপাশে এবং ৪০ শতাংশ জমি বাদ দিয়ে ৬০ শতাংশ জমির ওপর বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন ৩০০ কামরাবিশিষ্ট সেমিপাকা দালান তৈরি করা যায়, তবে জমির মূল্য পড়বে প্রায় ১ কোটি টাকা। তবে সেমিপাকা দালান নির্মাণে খরচ হবে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এছাড়াও বাউন্ডারি দেওয়াল, গেইট, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং অন্যান্য বিষয়ে সর্বোচ্চ খরচ হবে প্রায় ৫০ লাখ টাকা। ফার্নিচার, লাইট, ফ্যান, অন্যান্য খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ টাকা। অর্থাৎ সর্বোচ্চ ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা খরচ করতে পারলে একটি পুনর্বাসন কেন্দ্র তৈরি করা সম্ভব। সে হিসাবে দেশে এ ধরনের ৭৫টি পুনর্বাসনকেন্দ্র তৈরি করতে প্রয়োজন হবে ৩৩৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা অথবা বলা যায় প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয় করতে পারলে দেশে ৭৫টি ৩০০ কামরা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন পুনর্বাসন কেন্দ্র তৈরি করা সম্ভব।

এবার আসা যাক খরচ প্রসঙ্গে। ধরি, একটি কেন্দ্রে ২০০ জন মানসিক ভারসাম্যহীন রোগী রয়েছে। এদের পরিচর্যার জন্য দুই শিফটে ৬০ জন জনবল প্রয়োজন। গড়ে প্রতি জনের বেতন ১৩ হাজার টাকা হলে মোট বেতন অথবা মজুরি প্রয়োজন ৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা। মাসে ডাক্তারের জন্য খরচ ধরা হলো ১ লাখ টাকা। খাবার এবং ওষুধের খরচ যদি জনপ্রতি গড়ে ৩ হাজার ৫০০ টাকা ধরা হয়, তবে ২০০ জনের জন্য প্রয়োজন ৭ লাখ টাকা। এছাড়াও বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, মেরামত ও অন্যান্য খরচ ধরা হলো ২০০ জনের একটি কেন্দ্রে ২ লাখ টাকা। এছাড়াও বছরে প্রতি জন রোগীর কাপড়, স্যান্ডেল ইত্যাদিতে বছরে ৪ হাজার টাকা ধরা হলে জনপ্রতি মাসে প্রয়োজন প্রায় ৩৩৫ টাকা। ২০০ রোগীর জন্য প্রয়োজন ৬৭ হাজার টাকা। তাহলে সর্বমোট একটি ২০০ রোগীর পুনর্বাসনকেন্দ্রে মাসে প্রয়োজন ১৮ লাখ ৪৭ হাজার টাকা বা প্রায় ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি রোগীর জন্য মাসে প্রয়োজন ৯ হাজার ২৫০ টাকা অথবা ধরে নিই মাসে প্রয়োজন প্রায় ৯ হাজার ৫০০ টাকা। সে হিসাবে দেশে ১৫ হাজার রোগীর জন্য বছরে প্রয়োজন ১৭১ কোটি টাকা এবং ১২ হাজার রোগীর জন্য প্রয়োজন প্রায় ১৩৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ, অনুমানগুলো যদি সঠিক অথবা কাছাকাছি হয়; তাহলে দেশে ৭৫টি পুনর্বাসনকেন্দ্র তৈরিতে প্রয়োজন প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা এবং রোগীর খাদ্য, চিকিৎসা, পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয়ে খরচ হবে বছরে সর্বোচ্চ ১৮০ কোটি টাকা। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের বাজেট ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। কোনো কোনো জায়গায় কিছু কিছু খরচ কমিয়ে যদি মানসিক ভারসাম্যহীন ভবঘুরে রোগীর পুনর্বাসন করা সম্ভব হয়; তাহলে অসহায় মানুষ একটু আশ্রয় পাবে এবং ব্যক্তিগতভাবে, সামাজিকভাবে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে আমরা দায়মুক্ত হব। প্রস্তাবিত বাজেট চূড়ান্ত করার সময় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য উপরিউক্ত বরাদ্দ রেখে এটি বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করা যায়। সরকার দেশের অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত জনগণের উন্নয়নে অবদান রেখেছে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে যদি এসব মানসিক ভারসাম্যহীন ও ভবঘুরে অসহায় মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারে, তাহলে কিছুটা হলেও আমরা দায়মুক্ত ও চিন্তামুক্ত হব। এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

লেখক: অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

ইত্তেফাক/এমআর