জীবন যাহাতে ষোলো আনাই মিছা না হইয়া যায়

আপডেট : ১৪ জুন ২০২২, ০৯:৩৫

আধুনিক সমাজে বাস করিয়াও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অবজ্ঞা-অবহেলা করিয়া চলিয়াছি আমরা। কিছু ক্ষেত্রে উদাসীনতা মাত্রা ছাড়াইয়াছে। বৎসরের পর বৎসর ইহার মাশুল দিয়া আসিলেও তাহা হইতে উত্তরণের চিন্তা নাই আমাদের। দেশে প্রতিদিন গড়ে ৪০ শিশু পানিতে ডুবিয়া মারা যাইতেছে, যাহা মোট শিশুমৃত্যুর ৪৩ শতাংশ। নদীমাতৃক বাংলাদেশে পানিতে ডুবিয়া মৃত্যুর এই মিছিল মানিয়া লওয়া কষ্টসাধ্য। কয়েক দশক পূর্বে সাঁতার না-জানা লোক খুঁজিয়া পাওয়া যাইত না, অথচ এই সচেতনতার বিশ্বে সাঁতার জানা লোকের সংখ্যা এখন হাতেগোনা। শুধু শিশুরাই নহে, পানিতে ডুবিয়া মারা যাইতেছে প্রাপ্তবয়স্করাও।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বৎসর পানিতে ডুবিয়া মৃত্যু ঘটে পৌনে তিন লক্ষ মানুষের। বাংলাদেশে এই মৃত্যুর সংখ্যা ২২ হাজার, যাহার বড় অংশই শিশু। জনসংখ্যার সংখ্যানুপাতে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি শিশু পানিতে ডুবিয়া মারা যায় বাংলাদেশে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবমতে, পানিতে ডুবিয়া শিশু মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি এশিয়ায়: দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত প্রথম হইলেও জনসংখ্যার অনুপাতে বাংলাদেশ প্রথম। এখানে প্রতি ৩৬ মিনিট অন্তর একটি শিশুর মৃত্যু ঘটিতেছে পানিতে ডুবিয়া। মৃত্যুর পাশাপাশি বহু শিশু আহত হইতেছে, পঙ্গুত্ব বরণ করিতেছে। ব্রজেন দাশের (ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়া প্রথম দক্ষিণ এশীয় বাঙালি সাঁতারু) দেশে সাঁতার না জানিবার কারণ হেতু শিশুমৃত্যু এবং শিশুদের করুণ পরিণতির এইরূপ চিত্র নিতান্তই অনাকাঙ্ক্ষিত।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশে জালের মতো ছড়াইয়া-ছিটাইয়া রহিয়াছে অসংখ্য জলাধার। এই সকল জলাধারের অধিকাংশই অরক্ষিত। অসচেতনতা-অসতর্কতার ফলে শিশুরা জলাধারের কাছাকাছি যাইবার সুযোগ পাইতেছে—ডুবিয়া মরিতেছে পানিতে। এই বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতনতা অবলম্বন করিতে হইবে। গ্রামাঞ্চলের ছেলেমেয়েরা শৈশব-কৈশোরে জলাশয়ের সহজলভ্যতার ফলে সাঁতার শিখিবার সুযোগ পাইলেও শহরের বাসিন্দারা এইরূপ সুযোগ হইতে বঞ্চিত। এইখানে নির্বিচারে জলাশয়গুলি ভরাট করা হইয়াছে, যেইগুলি টিকিয়া রহিয়াছে তাহাও দখল-দূষণে বিপন্ন। বিক্ষিপ্তভাবে স্বল্পসংখ্যক সুইমিং পুল থাকিলেও সেইখানে সকল শিশু সাঁতার শিখার সুযোগ পায় না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিও প্রতিটি শিশুর সাঁতার শিখা নিশ্চিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিতেছে না। সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক সাঁতার শিখাইবার বিষয়ে পরিপত্র জারি করা হইয়াছিল, নানান সমস্যার অজুহাতে তাহার বাস্তবায়ন ঘটানো যায় নাই। এখন এই জাতীয় প্রকল্প-উদ্যোগ গ্রহণ করা সময়ের দাবিতে পরিণত হইয়াছে।

সম্প্রতি দেশে পানিতে ডুবিয়া শিশুমৃত্যু কমাইতে এবং শিশুর সার্বিক বিকাশে মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে যাত্রা শুরু করিয়াছে ২৭২ কোটি টাকার নূতন প্রকল্প। গৃহীত প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়ন প্রত্যাশা করি আমরা। এই জাতীয় আরো প্রকল্প গ্রহণ করিতে হইবে। সন্তানকে সাঁতার শিখাইবার ক্ষেত্রে অভিভাবকদেরও দায়িত্ব রহিয়াছে। লক্ষ করা যাইতেছে, সাঁতার না-জানা অনেক ছেলেমেয়ে উন্মুক্ত জলাশয় কিংবা সমুদ্র উপকূলে ঘুরিতে গিয়া মৃত্যুর কবলে পড়িতেছে। তাহা ছাড়া বিভিন্ন সময় নদীপথে যাত্রাকালেও দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটিতে দেখা যাইতেছে। এই কারণে সাঁতার না জানা বয়স্ক ব্যক্তিকেও সাঁতার শিখিবার বিষয়ে উদ্যোগী হইতে ইইবে। শৈশবে পড়া কালীপ্রসন্ন ঘোষের কবিতা ভুলিয়া গেলে চলিবে না—‘জলে না নামিলে কেউ শেখে না সাঁতার’।

আইসিডিডিআর,বির জরিপে দেখা গিয়াছে, পানিতে ডুবিয়া যেই পরিমাণ শিশুর মৃত্যু ঘটিতেছে, শুধু সাঁতার শিখার মাধ্যমেই তাহার ৯৬ শতাংশ রোধ করা সম্ভব। বলা বাহুল্য, সাঁতার একটি উত্কৃষ্টমানের ব্যায়াম। জীবনরক্ষাকারী বিনা মূল্যের এই ব্যায়ামকে শারীরিক শিক্ষায় ‘বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত’ করা কি খুবই কঠিন? জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে দুই ধরনের প্রভাব পড়িতেছে—কোনো এলাকা জলমগ্ন থাকিতেছে, আবার কোনো কোনো এলাকা হইয়া উঠিতেছে জলাধারশূন্য—শুষ্ক। এই উভয় কারণই পানিতে ডুবিয়া মৃত্যুর আশঙ্কাকে বাড়াইয়া তুলিতেছে। সাঁতার না শিখিলে জীবন কীভাবে ‘ষোলো আনাই মিছে’ হইয়া যায়, কবি সুকুমার রায়ের ছড়ায় বিদ্যাবোঝাই বাবুমশাইয়ের করুণ পরিণতি দেখিয়া আমরা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করিতে পারি।

ইত্তেফাক/এমআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন