মর্যাদা বহন করে এগোবে দেশ

আপডেট : ১৬ জুন ২০২২, ১১:২৬

এবারের বাজেট নিয়ে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা চলবে দীর্ঘদিন— এটাই স্বাভাবিক। বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে যে মূল্যস্ফীতি ঘটেছে সে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার দৃঢ় সংকল্প নিয়েই ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হয়েছে।

৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার বাজেট গোটা জাতিকে সাহসী করে তুলবে, তাতে সন্দেহ নেই। দেশি উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা থাকবে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। বাজেট কীভাবে বাস্তবায়িত হবে মাননীয় অর্থমন্ত্রী বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন তার বাজেট বক্তৃতায়। এই বাজেট এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগাবে। কেননা বিগত বছরের সাফল্য আমাদের পথ চিনিয়ে দিয়েছে।

আমাদের মহান নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা আজ বাস্তবে রূপ লাভ করেছে তারই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে।

উল্লেখ্য, মহান বিজয়ের ৫০ বছরে অর্থাৎ গত বছর জাতিসংঘ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। সে এক অভাবনীয় সাফল্য। এতে জাতি উল্লসিত ও গর্বিত। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৬তম বৈঠকের ৪০তম প্লেনারি সভায় উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় বাংলাদেশকে অভিষিক্ত করা হয়। স্বল্পোন্নত (এলডিসি) দেশ থেকে উত্তরণের জন্যে পাঁচ বছর সময় দেওয়া হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে যে, শেখ হাসিনার ধীশক্তি ও দৃঢ়চেতা নেতৃত্বের গুণে মহান অর্জন ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণের অক্ষরে লেখা হয়ে যাবে। উল্লেখ্য, জাতিসংঘের তিনটি মানদণ্ডে এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, জাতিসংঘের তিনটি মানদণ্ড উত্তীর্ণ হয়েছে।

বাংলাদেশের এ অর্জন বিশ্বে বাঙালি জাতিকে মহিমান্বিত করেছে। একই সঙ্গে বিশ্বদরবারে এ দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে এবং আরো অধিকতর উন্নয়নের যাত্রা ত্বরান্বিত করবে। উন্নয়নশীল দেশে প্রবেশকালে বাংলাদেশকে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হচ্ছে। এই প্রস্তুতিকালে বাংলাদেশ এলডিসি হিসেবে যেসব সুযোগ-সুবিধা পেয়ে আসছিল তা অব্যাহত থাকবে। বর্তমান নিয়মানুযায়ী ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশ ২০২৬ সালের পর আরো তিন বছর অর্থাত্ ২০২৯ সাল পর্যন্ত শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা ভোগ করতে পারবে। জাতিসংঘ ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পাশাপাশি নেপাল ও লাওসের ক্ষেত্রেও একই সুপারিশ করা হয়েছে।

এর আগে গত ২৬ ফেব্র‚য়ারি ২০২১ অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনা সভায় দ্বিতীয় বারের মতো এলডিসি থেকে উত্তরণের মানদণ্ড পূরণের সুপারিশ লাভ করে বাংলাদেশ। সিডিপি একই সঙ্গে বাংলাদেশকে ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর প্রস্তুতিকালীন সুপারিশ করেছিল। উল্লেখ্য, উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে যেসব দেশ তুলনামূলক দুর্বল, সেসব দেশের স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

জাতিসংঘ ১৯৭১ সালে প্রথম স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা করে। কিন্তু বাংলাদেশকে ১৯৭৫ সালে এই তালিকায় অন্তভু‌র্ক্তি করা হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের স্হপতি মহান নেতাকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র শুরু হয়। স্বাধীন সার্বভৌম দেশের চাকা উলটো দিকে ঘুরতে থাকে। বাঙালির আত্মমর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হয়। রাজনৈতিক নানা ঘটনা পরম্পরায় সৌভাগ্যক্রমে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও রেহানা বেঁচে যাওয়ায় মানুষের আশা জেগে থাকে। ঘটনাবহুল রাজনৈতিক কর্মাকাণ্ডের ভেতর দিয়ে জনগণের প্রত্যাশিত জায়গায় শেখ হাসিনার অবস্থান সুদৃঢ় হয়।

শেখ হাসিনা জাতির নেতৃত্বে আসীন হয়ে আত্মমর্যাদার ভিত মজবুতকরণে সংগ্রাম অব্যাহত রাখেন। স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যান। জাতিকে অর্থনৈতিক মুক্তির পথ দেখান। তার গতিশীল নেতৃত্বের কারণে বাংলাদেশ আজ অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে দেশকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে কর্মসূচি গ্রহণ করেন কিন্তু দুর্ভাগ্য নানা ষড়যন্ত্রে পাঁচ বছর পর আবার স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ক্ষমতায় এসে দেশকে পিছিয়ে দেয়। মধ্যযুগীয় সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের পরিচিতি লাভ করে নতুনভাবে। এমনি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে শেখ হাসিনা দেশবাসীকে জাগিয়ে তোলেন। জনগণের মুক্তির কান্ডারি হিসেবে আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তুলেন আবার জনতার বিজয় হয়।

২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফেরে। সেই থেকে পথচলা। আজ টানা তৃতীয় দফায় ক্ষমতায় থেকে দেশের আর্থসামাজিক অবস্থাকে বদলে দিয়েছে। বদলে গেছে মানুষের জীবন মান। অদম্য গতিতে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। শেখ হাসিনার ভিশন-২০২১ আজ বাস্তবে রূপ লাভ করেছে।

সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে শেখ হাসিনা দেশ পরিচালনা করে অনন্য মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বাঙালি জাতিকে। গড়ে তুলেছেন গৌরবময় ইতিহাস। আজ যে সাফল্য অর্জিত হয়েছে এ সাফল্যের অংশীদার এই দেশের সব শ্রেণি পেশার মানুষ। বাংলাদেশ এমন একটা সময়ে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় অভিসিক্ত, যখন সমগ্র বাঙালি জাতি বাংলাদেশের স্হপতি মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী একই সঙ্গে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব পালনে ব্যস্ত ছিল। এ উত্সবের রেশ কাটতে না কাটতেই আরেকটি মহা উত্সব দ্বারপ্রান্তে। আসছে ২৫ জুন স্বপ্নের পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উত্সব। নিজস্ব অর্থে নির্মিত এই পদ্মা সেতু আমাদের সাহস ও শক্তির প্রতীক। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাহসী নেতৃত্বের গুণেই পদ্মা সেতু আজ বাস্তবরূপে বিকশিত।

বাংলাদেশের লক্ষ্যকে পরিপূর্ণতা দানে প্রয়োজনীয় নীতি কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। এতে নানামুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে শেখ হাসিনা কর্মকৌশলই যথেষ্ট বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এলডিসি উত্তরণে পণ্য রপ্তানিসহ ব্যবসা-বাণিজ্যে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ দেখা দেবে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত থেকেও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এদিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ১৩টি ক্ষেত্রে সুপারিশমালা দিয়ে এলডিসি উত্তরণে ‘অ্যাকশন প্ল্যান, তৈরি করেছে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ। কোন মন্ত্রণালয়, সংস্থা বা অধিদপ্তর সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করবে সেটিও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য রপ্তানিতে শুল্ক ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে জাতিসংঘে স্বীকৃত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে অতিরিক্ত বার্ষিক চাঁদা দিতে হবে। তাছাড়া বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ ইসু্যতে ওষুধশিল্পে নতুন চ্যালেঞ্জ যুক্ত হবে। বেড়ে যাবে ওষুধের দাম; এতে রপ্তানি বাজারও কিছুটা সংকুচিত হবে। বিশ্বব্যাংক আইএমএফ এবং এডিবিসহ উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সহজ শর্তের ঋণ ও অনুদান সহায়তা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তবে এসব সস্তা ঋণ-সুবিধা পাওয়ার কোনো প্রয়োজন পড়বে না। কেননা অভ্যন্তরীণ সম্পদ অর্জনে যেসব কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে, তা যদি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তবে কোনো সমস্যা হবে না।

২০৪১ সালে উন্নত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার প্রত্যয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা যে কর্মকৌশল নির্ধারণ করেছেন, তার বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগের ত্যাগী ও সত্ নেতাকর্মীদের সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিতে কাজ করতে হবে। নিশ্চয়ই আমাদের মানবিক নেত্রী শেখ হাসিনা তার বিশ্বস্ত ও মুজিব আদর্শ বহনকারীদের সামনে এনে এদের এবং সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে সমন্বয়ী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে এগিয়ে যাবেন। যে লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নে নেত্রী ভিশন ঠিক করেছেন, তাতে পরবর্তী প্রজন্মও সঠিক পথে অগ্রসর হবে। লাইনচু্যত হওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না।

এলডিসি থেকে উত্তরণের ফলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ব্যান্ডিংয়ে রূপান্তর হবে। ব্যান্ডিং ঐশ্বর্য ধরে রাখতে হলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম গতিশীল ও রপ্তানি বাড়াতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) করার যে প্রস্তুতি রয়েছে তা দ্রুত সফল করে তুলতে হবে। শুল্ক ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা নিশ্চিত করতে পিটিএ, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এফটিএ এবং বৃহত্ অংশীদারিত্ব বাণিজ্য চুক্তির (সিপা) মতো বড় বড় চুক্তির দিকে এগিয়ে যেতে হবে এবং তা বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে রপ্তানিতে জিএসপি প্লাস সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। পরিশেষে বলতে চাই, আমাদের এই স্বাধীন দেশ এখন একটি পুণ্যভূমিতে রূপান্তর রয়েছে। এই পুণ্যভূমির জনসাধারণকে একটি স্বাবলম্বী জাতিতে পরিণত হতে হলে প্রয়োজন সমন্বয়নীতি বা মূল্যবোধ মানুষে মানুষে ঐক্য স্থাপন করতে পারে। এই সমন্বয়নীতি হচ্ছে নৈতিকবোধ; যা আমাদের প্রত্যেকের ভেতর থেকেই জাগাতে হবে। তবে উন্নয়নশীল দেশের অর্জিত সম্মান ধরে রাখা সম্ভব হবে।

লেখক: রাজনীতিক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য।

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন