পশ্চিমাদের ভারী অস্ত্রের ওপর নির্ভর করছে ইউক্রেন

আপডেট : ১৭ জুন ২০২২, ১০:০৭

চলতি জুনের এক রবিবারের সকাল। দক্ষিণ ইউক্রেনের মাইকোলাইভ অঞ্চলের একটি বিস্তৃত মাঠ। একটি ইউক্রেনীয় ২এস১ হাউইৎজার কামান ঘন ঝোপ থেকে উঠে এলো। ‘করনেশন’ নামের সোভিয়েত আমলের ১৫ টন ওজনের স্বয়ংক্রিয় প্রপেলার উঠে এলো। ঘড়ঘড় শব্দ করে তারপর থামল। দুই জন সৈন্য লাফ দিয়ে বেরিয়ে এসে ৫০ মিটার দৌড়ে এবং একটি ট্রাইপডে লক্ষ্য বৃত্ত স্থাপন করল। ব্যাটারি কমান্ডার চিৎকার করে টার্গেট নির্দেশ করলেন এবং এক জন কামানদার সঙ্গে সঙ্গে কামান লোড করলেন। গগনবিদারী শব্দে তারা দু’টি ফায়ার করলেন এবং দ্রুত সরে অদৃশ্য হয়ে গেলেন পাশের ঝোপে, শত্রুর ড্রোনের চোখ ফাঁকি দিতে।

এটি ইউক্রেনে চলমান পরিস্থিতি এবং সাধারণ ঘটনা। রাশিয়ার আগ্রাসনের প্রায় চার মাসের এই পর্যায়ে চলমান যুদ্ধ একটি আর্টিলারি দ্বন্দ্বে রূপান্তরিত হয়েছে। ভারী ভারী কামান ব্যবহার করে কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে মুহুর্মুহু আক্রমণ চলছে। এখনকার যুদ্ধের একমাত্র টার্গেট হলো শত্রুপক্ষ থেকে আক্রমণের বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগেই যত দ্রুত সম্ভব পালটা আক্রমণ ছুড়ে দেওয়া।

আক্রমণের শুরুতে যখন রাশিয়ান সৈন্যরা ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চল থেকে শুরু করে কিয়েভ ও খারকিভের মতো বড় শহরগুলোর দিকে অগ্রসর হতে শুরু করেছিল, তখন লক্ষ্য ছিল শত্রুকে অতর্কিত আক্রমণে প্রলুব্ধ করা, যেখানে ট্যাংক বিধ্বংসী অস্ত্র মজুত রাখা হচ্ছিল। তবে চলমান যুদ্ধটি দক্ষিণ ও পূর্ব ইউক্রেনের বিস্তীর্ণ এলাকাগুলোতে স্থানান্তরিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি আরো নৃশংস-নির্মম হয়ে উঠেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পশ্চিম ফ্রন্টের যুদ্ধক্ষেত্রের মতোই ইউক্রেনের ক্ষেত্রগুলো এখন ক্রমাগত গোলাবর্ষণে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। প্রয়োজনীয় অস্ত্রসস্ত্র পাওয়া না গেলে সাহস, দক্ষতা ও পরিকল্পনা কতটুকুই-বা সাহাঘ্য করতে পারে?

কর্নেল রোমান কোস্টেনকো খুব কাছ থেকে ২এস১ হাউইৎজারের অপারেশন পর্যবেক্ষণ করছেন। তার মতে, ‘আর্টিলারি হলো যুদ্ধের দেবতা’। এটি অতি পরিচিত উদ্ধৃতি, যার সোভিয়েত স্বৈরশাসক জোসেফ স্ট্যালিনের সঙ্গে মিল রয়েছে। কোস্টেনকোর যুক্তি হলো, দক্ষিণের যুদ্ধে কামানই ‘নির্ণায়ক’ হয়ে উঠবে। কোস্টেনকো একজন ইউক্রেনীয় সংসদ সদস্য এবং একই সঙ্গে আর্টিলারিম্যানদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা একটি বিশেষ ইউনিটের কমান্ডারও তিনি।

অবস্থার উন্নয়ন ঘটার আভাস মিলছে। ইউক্রেনীয়দের আর একতরফাভাবে সোভিয়েত-যুগের অস্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হবে না। তবে আধুনিক, পশ্চিমা সরঞ্জামও রয়েছে। এর মধ্যে একটি চকচকে আর্টিলারি হলো এম৭৭৭, যা রাশিয়ান লাইনের দিকে রাউন্ড রাউন্ড গুলি ছুড়ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীকে ১০৮টি হাউইৎজার এবং ২ লাখ রাউন্ড গোলাবারুদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

হাউইৎজারগুলো স্বচালিত নয়। তাছাড়া এগুলো অন্যান্য যানবাহন দ্বারা টেনে নেওয়ার দরকার পড়ে। তবে এগুলোর ওজন মাত্র চার টন, যার ফলে সেগুলো খুব সহজে লুকানো যায়। তাছাড়া ‘ট্রিপল সেভেন’, যাকে ইউক্রেনীয়রা ‘থ্রি অ্যাক্স’ বলে থাকে, এটি রাশিয়ান আর্টিলারির চেয়ে দীর্ঘ পরিসরে রয়েছে ইউক্রেনের হাতে। এটি ন্যাটো শেলের সমমানের, যা বেশি আকারে সরবরাহ করা যেতে পারে। নরওয়ে ও ফ্রান্স ইউক্রেনকে যথেষ্ট পরিমাণে কামান দিয়েছে।

ওলেক্সি আরেস্তোভিচ বলেছেন, পশ্চিমাদের সরবরাহ করা কামানই যুদ্ধের ‘নির্ধারক’। অন্যথায় অবস্থার ভিন্ন চিত্র দেখা যেত। তার মতে, শত্রুরা এখন জাপোরিঝিয়া তছনছ করবে। তারা লিসিচানস্ককে দখলে নিত এবং স্লোভিয়ানস্ককে ঘিরে ফেলত। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির এই উপদেষ্টার মতে, ব্যাটালিয়ন টু ব্যাটালিয়ন বা মুখোমুখি যুদ্ধে আমরা জিতেছি। তবে আমাদের সমস্যা হলো, শত্রুরা মূলত দূর থেকে আমাদের দিকে নির্বিচার গুলি চালাচ্ছে, যার ফলে দৈনিক ১০০ সৈন্যের প্রাণহানি ঘটছে। তিনি দাবি করেছেন, এপ্রিলের শুরুতে খুব দরকার না পড়লে একেবারেই হাত দেওয়া হবে না এমন একটি মজুত ছাড়া রকেট লঞ্চারগুলোর জন্য গোলাবারুদের সব মজুত শেষ হয়ে গিয়েছিল।

ইউক্রেনের মতো এ রকম সমস্যায় পড়তে হচ্ছে না রাশিয়াকে। রাশিয়ার হাতে আর্টিলারিসহ প্রচুর যুদ্ধাস্ত্র রয়েছে। যুদ্ধের শুরু থেকেই বিপুল পরিমাণে আগ্নেয়াস্ত্র দনবাসে জড়ো করতে শুরু করে রুশ সেনারা। পূর্ব রণাঙ্গনের সম্মুখ সারির একজন ইউক্রেনীয় কমান্ডার বিষয়টিকে ‘আগুনের দেওয়াল’ বলে অভিহিত করেছেন। প্রতিটি আক্রমণের আগে রুশ বাহিনী আর্টিলারি ফায়ারের বিশাল মজুত জড়ো করে, যাতে তারা ইউক্রেন ও তার রক্ষকদের চমকে দিতে পারে। খুব দ্রুতই রাশিয়ানদের এই যুদ্ধাস্ত্র ফুরিয়ে যাবে এমন সম্ভাবনা নেই। কারণ তাদের রয়েছে সোভিয়েত যুগের অস্ত্রভান্ডার। তারা সেই অস্ত্রই ব্যবহার করছে, আর অস্ত্রের প্রশ্নে সোভিয়েতদের কার্পণ্য নেই। ইউক্রেন কমান্ডার নতুন এম৭৭৭ হাউইৎজারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তিনি মনে করেন, রুশ সেনারা এই অস্ত্রকে ভয় পায়। ম্যাডিসন পলিসি ফোরাম থিংক ট্যাংকের সামরিক বিশেষজ্ঞ জন স্পেনসার এ বিষয়ের সঙ্গে একমত পোষণ করছেন। তার মতে, বিপুল অস্ত্র জড়ো করার এই সিস্টেম দনবাসে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে।

পশ্চিমা বিশ্ব থেকে অস্ত্রের পরবর্তী চালানের জন্য অপেক্ষা করছে ইউক্রেনীয়রা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চারটি এম১৪২ হিমারস মালটিপারপাস রকেট লঞ্চার পাঠাচ্ছে। ব্রিটিশরা অনেকগুলো এম২৭০ পাঠাবে বলে নিশ্চিত করেছে। এসব রকেট লঞ্চার ৮০ কিলোমিটার রেঞ্জ পর্যন্ত আক্রমণ করতে সক্ষম। এটি আমেরিকান হাউইৎজারের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি শক্তিশালী, যা তুলনামূলকভাবে রাশিয়ার অস্ত্রকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। তাছাড়া জার্মানরা জুনের শেষ নাগাদ চারটি এমএআরএস-২ সরবরাহ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।

পশ্চিমা রকেট লঞ্চারগুলো অনেক দূরবর্তী স্থান থেকে শত্রুর কামান ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে। তাছাড়া রাশিয়ান রকেট লঞ্চারগুলো যেখানে ১৭০ মিটার বিস্তৃত ব্যাসার্ধের বাইরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে ব্যর্থ, সেখানে হিমারস ও এম২৭০ সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুকে গুঁড়িয়ে দিতে পারে নিমেষেই। কেবল জিপিএইচ নির্দেশিত রকেট ব্যবহার করে এজাতীয় আক্রমণ করা যায়।

ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের একজন বিশ্লেষক মার্ক ক্যানসিয়ান বলেছেন, পশ্চিমা অস্ত্রের সিস্টেমই সত্যিকারের পার্থক্য তৈরি করবে। তবে সমস্যা হলো, আমেরিকান, ব্রিটিশ ও জার্মানদের প্রতিশ্রুত আটটি সিস্টেম পুরো ফ্রন্টলাইন বরাবর রাশিয়ান অগ্রগতির বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা করার জন্য যথেষ্ট নয়। ক্যানসিয়ানের মতে, শুধু দনবাসের জন্য ১০টি সিস্টেম সম্ভবত যথেষ্ট, তবে সামনের বাকি ফ্রন্টের জন্য কমপক্ষে দ্বিগুণ সংখ্যা প্রয়োজনীয়।

কর্নেল ও সংসদ সদস্য কোস্টেনকোরও রকেট লঞ্চারগুলোর ব্যাপারে উচ্চাশা পোষণ করেন। ইউক্রেন ইদানীং দক্ষিণাঞ্চলে পালটা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে, যেখানে তাকে নিযুক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যমেয়াদি লক্ষ্য হলো দিনিপ্রো নদীর পশ্চিমাঞ্চল পুনরুদ্ধার করা। রাশিয়া খেরসন দখল করেছে, যেখানে নদীর পশ্চিম তীরে রয়েছে একটি ব্রিজের মাথা, যেখান থেকে রাশিয়ান সেনারা ওডেসার দিকে অগ্রসর হতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে অস্ত্রব্যবস্থার শক্তিমত্তা সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি খোলাসা করেছে। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে এ ব্যাপারে স্পষ্ট করে বলেছে যে, তাকে কথা দিতে হবে, রাশিয়ার ভূখণ্ডে আক্রমণ চালানোর জন্য ইউক্রেন রকেট লঞ্চারগুলো ব্যবহার করবে না। তাছাড়া ৩০০ কিলোমিটার পরিসীমায় আক্রমণ করতে সক্ষম তথাকথিত এটিএসিএমএস রকেট প্রদান না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়াশিংটন। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন রকেট লঞ্চার মোতায়েন আয়োজনের এই ঘোষণাকে অপ্রীতিকর বলে অভিহিত করেছেন। পুতিন বলেছেন, ‘এসব ব্যবস্থা বাস্তবিক অর্থে কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারবে না।’

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ইউক্রেন আসলে কত দ্রুত রকেট লঞ্চারগুলো মোতায়েনে সক্ষম হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে চারটি হিমারস ইতিমধ্যে ইউরোপে পাঠানো হয়েছে। ইউক্রেনীয় সৈন্যদের এখন সেগুলো ব্যবহার করার জন্য তিন সপ্তাহের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সফ্টওয়্যার সামঞ্জস্যের বিষয়টি দেখভাল করছে জার্মানি, যদিও এ বিষয়ে বিলম্ব হতে পারে—এমনকি শীতকাল পর্যন্ত।

ইউক্রেনের যুদ্ধ ক্রমবর্ধমানভাবে ভারী অস্ত্রের যুদ্ধে পরিণত হয়ে ওঠায় জার্মানির বেশ কিছু করণীয় ছিল। তবে বার্লিন সরকার এখন পর্যন্ত শুধু হালকা অস্ত্রসস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করেছে। যার মধ্যে রয়েছে ট্যাংক ও বিমান বিধ্বংসী রকেট, ১৬ মিলিয়ন রাউন্ড গোলাবারুদ, ৫০ ফিল্ড মেডিক্যাল যান এবং ৮০ সাঁজোয়া যানবাহন। তবে ভারী অস্ত্রের প্রশ্নে ইউক্রেন বার্লিন থেকে প্রতিশ্রুতি ছাড়া কিছুই পায়নি।

অন্যান্য দেশ বরং অনেক বেশিই পাঠিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, পোল্যান্ড ২৩০টি আধুনিক টি-৭২ যুদ্ধ ট্যাংক দিয়েছে। চেক প্রজাতন্ত্র ৬১টি সাঁজোয়া বাহক গাড়ি পাঠিয়েছে। পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোর সংহতিও চোখে পড়ার মতো। ইউক্রেনীয়দের জন্য একটি বায়রাক্টার যুদ্ধ ড্রোন কেনার জন্য ৫ মিলিয়ন ইউরো সংগ্রহ করেছে ক্ষুদ্র দেশ লিথুয়ানিয়ার জনগণ। উপরন্তু, পূর্ব ইউরোপীয়রা অন্য একটি বিশেষ ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে— তাদের কাছে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সোভিয়েত অস্ত্র রয়েছে, যা ইউক্রেনীয়রা সহজে ব্যবহার করতে পারবে। কেননা, পশ্চিমা অস্ত্রসস্ত্র উচ্চমানসম্পন্ন হলেও তা ব্যবহারে পর্যাপ্ত প্র্রশিক্ষণের প্রয়োজন পড়বে।

জার্মানির ডের স্পিয়েগেল থেকে ভাষান্তর: সুমৃৎ খান সুজন

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন