২০০৫ সালের এই দিনে শ্রী গৌর চন্দ্র বালা ইহলোক ত্যাগ করেন। এ বছর বাবার সঙ্গে একটি দিনের স্মৃতি খুব মনে পড়ছে। আর সেটি আমাদের এই প্রাণের নদী পদ্মাকে নিয়েই। বাবার সঙ্গে কতবারই পদ্মা পার হয়েছি লঞ্চে করে ফরিদপুর-ঢাকার পথে। সে বছর, খুব সম্ভব আমার ম্যাট্রিক পাশের পর ইন্টারমিডিয়েট সময়েই। কলেজ ছুটি হয়েছে, ঢাকা থেকে ফরিদপুরে বাড়ির উদ্দেশ্যে চলেছি বাবার সঙ্গে। ফুলবাড়িয়া থেকে বাসে করে আরিচাঘাটে এসে লঞ্চে উঠেছি। খুব সম্ভব এরকমই কোনো দিনে—জৈষ্ঠ্য-আষাঢ় মাস। হঠাৎই মাঝ নদীতে দমকা বাতাস দিয়ে ঝড় উঠেছে। আর আমাদের লঞ্চটি বাতাসের তোড়ে দুলতে শুরু করেছে। স্রোতের তোড়ে উঠে আসা জলের ঝাপটা দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদেরকে ভিজিয়ে দিচ্ছে। লঞ্চের ভেতরে কোনোভাবে বসে থাকার জো নেই! একটা সময় আমার হাত ধরে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছেন বাবা। মুখে কোনো কথা নেই। বাবার সেই মুখটি আমার মনে আজো গেঁথে আছে। পিতার হাত চেপে ধরা কিশোরী মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে আসন্ন মুহূর্তটির কল্পনাই কি অমন বিচলিত করে তুলেছিল তাকে! প্রকৃতির কী অদ্ভুত খেয়াল, একটা সময় আবার দমকা বাতাসটা কমতে শুরু করল, আর তীরও দৃষ্টিতে এলো। বাবা হাত দিয়ে দেখালেন। মুখে তার দিব্য-ভাবটি ফুটে উঠল তখন। কথা বললেন, ‘যাক বাঁচা গেল!’
বাবাকে উদ্দেশ্য করে আজ বলতে ইচ্ছে করছে—‘স্বপ্নের পদ্মা সেতু দাঁড়িয়ে গেছে, বাবা তুমি কি দেখতে পাচ্ছো? এই জুন মাসের ২৫ তারিখের পর থেকে সেতুর ওপর দিয়ে বাড়িতে যেতে পারব আমরা।’ পদ্মার ওপর একটি সেতু আমাদের পূর্বপুরুষের স্বপ্ন ছিল। বঙ্গবন্ধুকন্যার হাত ধরেই সেতুটি দাঁড়িয়ে গেছে। এই নদীর তীরে কতবার যে আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। শ্রী গৌর চন্দ্র বালা, আমার বাবা ছিলেন এই দেশ এবং সমাজের একজন মানুষ। মানুষের প্রতি দরদের যে মনটি ছিল, তাইতেই তিনি সমাজের একজন হয়ে উঠেছিলেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির সৃষ্টি-সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে তিনি আমাদের ইতিহাসের অংশ আজ। বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমার (অবিভক্ত বাংলার) রাজৈর থানার উল্লাবাড়ী গ্রামে জন্মেছিলেন। নারায়নী বালা এবং রাজমোহন বালার কনিষ্ঠ পুত্র তিনি।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাশ করে কেন্দ্রীয় ভারত সরকারের চাকরিতে ঢুকেছিলেন। সে ১৯৪৯ সালের কথা। পূর্ববঙ্গ তথা পূর্ব পাকিস্তানে তখন অবাঙালি শাসক-গোষ্ঠীর শোষণ-নির্যাতনের কাল। ১৯৪৭-এর দেশ বিভাগ ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটালেও বাঙালির ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি। বরং বলা যায়—শোষণের এক নবতর চক্র তৈরি হয় পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর হাতে। মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার মর্যাদা, অধিকার হারায় বাঙালি। এ সময়ই হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দী সম্মিলনে গঠিত হয় ‘যুক্তফ্রন্ট’ এবং পাকিস্তানি মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েও যায়। সেই সময়ে মাদারীপুরের ঐ অঞ্চল থেকে মুসলিম লীগ প্রাথীর্র বিরুদ্ধে দাঁড়াতে একজন যোগ্য মানুষের কথা আসে। গ্রামের কজন সচেতন যুবককে সঙ্গে নিয়ে ছোটকাকা কলকাতায় গিয়ে হাজির হন এবং ভাইপোকে বলেন, ‘তোমাকে আমাদের সঙ্গে দেশে যেতে হবে, শিক্ষিত মানুষ হয়েছ, দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে হবে।’ কাকার ঐ এক কথায় চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে দেশগ্রামে চলে আসেন তিনি। যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে মুসলিম লীগ মন্ত্রীকে হারিয়ে দিয়ে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য (১৯৫৪) নির্বাচিত হন গৌর চন্দ্র বালা। ১৯৫৫ সালে তিনি গণপরিষদ সদস্য হন, এবং ১৯৫৬-এ যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভার বন ও খাদ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৮-এ আইয়ুব খানের যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙে দেওয়া পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনে বৃহত্তর ফরিদপুরে এবং ফাতেমা জিন্নাহর প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে নির্বাচনকালে ১৯৬৪-এ দক্ষিণবঙ্গে বিশেষ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০-এ তিনি আবার প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য এবং ১৯৭৩-এ আওয়ামী লীগ নমিনেশন বোর্ড সদস্য নির্বাচিত হন। মুক্তিযুদ্ধকালে দক্ষিণ-পশ্চিম বেসামরিক জোন-২-এর কার্যকরী চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির ১০ সদস্যের তিনি অন্যতম।
এই যে মানুষটি গৌর চন্দ্র বালা, মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন আপন মহিমায়—অন্তরের টানে। গত বছর রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে পাটুরিয়া যুবসংঘ যে সুহৃদ-সম্মাননার আয়োজন করেছিল পাটুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ঘিরে, মরণোত্তর সংবর্ধনা দিয়েছিলেন তারা গৌর চন্দ্র বালাকে। কথা বলতে গিয়ে সেখানে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলাম। স্কুলটির প্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তী সময়ে তা সরকারীকরণে নিবেদিত কজন শিক্ষক বাবাকে পেয়েছিলেন তাদের সর্বোত সহযোগিতায়। জীবদ্দশায় যে কাজটি করে উঠতে পারেননি পাটুরিয়াবাসী, মরণের পরে হলেও সেটা যে তারা করতে পেরেছেন। এ যে কতখানি কৃতজ্ঞতার প্রকাশ—তাই ভাবি। আমার প্রয়াত পিতা যে তার কর্ম দিয়ে মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছেন—সেই উপলব্ধি অন্তরকে আপ্লুত করে তুলছিল। জীবদ্দশায় বাবা গ্রামের বাড়িতে ঠাকুরদার জমির ওপর দুটি বিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, উল্লাবাড়ী প্রাথমিক এবং উল্লাবাড়ী ইউনাইটেড হাইস্কুল নামে। গ্রামের ছেলেমেয়েরা কত অনায়াসে সেখানে পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে! আজ পিতার এই প্রয়াণ দিবসে তার স্মৃতির প্রতি আরেক বার আনত হই।
লেখক: গৌর চন্দ্র বালার কনিষ্ঠা কন্যা।
