দেশের লাখো তরুণের পছন্দের শীর্ষে, বিগত কয়েক বছর ধরে যা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে সেটা হলো বিসিএসের উন্মাদনা। এটা চাকরির নিশ্চয়তার পাশাপাশি সামাজিক মর্যাদার অন্যতম মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনগণের দোরগোড়ায় সেবা প্রদানের পাশাপাশি সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে কাজের সুযোগের অন্যতম মাধ্যম বলা চলে পাবলিক সার্ভিস পরীক্ষার মাধ্যমে চাকরিতে প্রবেশ।
একইসঙ্গে এটা যেমন একটা মোহ তেমনি জাতির জন্য অশনিসংকেত, কেননা হাজার হাজার তরুণ এটার পেছনে দীর্ঘ সময় দিচ্ছে যেখানে মোট পরীক্ষার্থীদের হিসেবে সফলতার হার মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ। এরই মাঝে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় পার হয়ে যাচ্ছে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের অংশ বিশাল এই সম্ভাবনাময় তরুণদের শুধু বিসিএসের মতো একমুখী চিন্তাভাবনা দূর করতে কর্মমুখী শিক্ষার পদক্ষেপ ইতিমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে, যেটা আশা জাগানিয়া। বর্তমানে পিএসসি ক্যাডার, নন-ক্যাডার, উচ্চতর স্কেল পরীক্ষা, বিভাগীয় পরীক্ষা, চাকরিসংক্রান্ত বিভিন্ন সুপারিশ প্রদানের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ অত্যন্ত সুচারুভাবে পালন করে যাচ্ছে। কিন্তু একেকটি বিসিএসের দীর্ঘসূত্রতা থেকে পিএসসি বের হয়ে আসতে পারছে না। তথ্যপ্রযুক্তির বিপবের সঙ্গে সঙ্গে আবেদন প্রক্রিয়ায় সহজীকরণ পরিবর্তন এসেছে।
সম্প্রতি পিএসসি ৪০তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করেছে, যেটার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল ২০১৮ সালে। প্রায় কাছাকাছি সময়ে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতও তাদের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার (ইউপিএসসি) চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করেছে যেটার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছিল ২০২১ সালে; ইউপিএসসি ভাইভাতে অংশগ্রহণকারী সবার চূড়ান্ত ফলাফলের মার্কশিটও প্রকাশ করেছে (ভাইভা মার্কসহ) যা অধিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে। এদিকে আমাদের দেশে সম্প্রতি ৩৮তম বিসিএসে লিখিত পরীক্ষায় যারা অংশগ্রহণ করেছিল তাদের মার্কশিট প্রকাশ করেছে (উলেখ্য) বাংলাদেশে ভাইভা মার্ক প্রকাশ করা হয় না), তাও সেটা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে (অতিরিক্ত আবেদন ফি ১০০০ টাকা প্রদান সাপেক্ষে)। ৩৮তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৮ সালে আর একজন পরীক্ষার্থী তার লিখিত পরীক্ষার নম্বর জানতে পারছে ২০২২ সালে এসে, এর চাইতে হাস্যকর আর কিছু থাকতে পারে! এটা কি আদৌ পরীক্ষার্থীবান্ধব? একজন পরীক্ষার্থী যদি তার উন্নতির জায়গাটা ৪ বছর পরে এসে জানতে পারে তাও সেটা অতিরিক্ত ফি প্রদান সাপেক্ষে এর চেয়ে লজ্জাজনক বিষয় আর হতে পারে না।
অথচ প্রিলি পরীক্ষার আবেদনের সময় পিএসসি ৭০০ টাকা করে আবেদন ফি গ্রহণ করে। তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অনলাইন যোগাযোগ বেড়েছে, ফেসবুকে পিএসসির ভাইভা পদ্ধতি নিয়েও এবার প্রশ্ন উঠেছে। ২০০ নম্বরের ভাইভার জন্য কেউ সময় পায় ৫/১০/১৫/২০ মিনিট করে। এই সময়ের মধ্যেই একজন প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারিত হয়। এত বেশি নম্বরের জন্য বোর্ডভেদে সময়ের পার্থক্য যেমন থাকে তেমনি বিজ্ঞ বোর্ড মেম্বার আলাদা আলাদা হওয়ার কারণে নম্বরেরও অনেক বেশি তফাত ঘটে, ফলে লিখিততে একজন প্রার্থী অনেক কম নম্বর পেয়েও প্রথম সারির ক্যাডার পেয়ে যাচ্ছে; আবার অনেকে লিখিততে অনেক ভালো নম্বর পেয়েও শুধু ভাইভা বোর্ডের কারণে নন-ক্যাডার পাচ্ছে। এসব বিষয়ে তাই স্বচ্ছতার জন্য পিএসসির চিন্তা করার সুযোগ রয়েছে।
উপরন্তু পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ইউপিএসসি যদি প্রিলিমিনারি পরীক্ষার কাটমার্ক, লিখিত ও ভাইভার নম্বর চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ করতে পারে তাহলে বাংলাদেশের বিপিএসসির তা প্রকাশ করতে আইনগত বাধা থাকার কথা নয়। আইনগত বাধা থাকলেও তা দূর করার পদক্ষেপ নিয়ে বিপিএসসি যদি এসব বিষয়ে চিন্তাভাবনা করে, তাহলে হাজারো তরুণের আস্হার জায়গা আরো দৃঢ় হবে, পিএসসির দিকে আঙ্গুল তোলার সুযোগ বন্ধ হবে। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের সুবিবেচনা আশা করছি।
