বুধবার, ১৭ আগস্ট ২০২২, ১ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করিতে হইবে

আপডেট : ১৮ জুন ২০২২, ০৩:৫৭

মানুষের মৃত্যু অবধারিত। যেইদিন একজন মানুষ পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হইল, সেইদিন হইতেই এই সত্য তাহার সহিত গাঁথিয়া গেল। তাই কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাহার ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার একটি পঙক্তিতে বলিয়াছেন, ‘জন্মিলে মরিতে হবে,/অমর কে কোথা কবে,/চিরস্থায়ী কবে নীড়, হায়রে, জীবন-নদে।’ শুধু যে মৃত্যু অবধারিত তাহাই নহে, একজন মানুষ নিঃশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে বাতাস গ্রহণ করিয়া তাহা ত্যাগ করিতে পারিবেন কিংবা প্রশ্বাস লইয়া পুনরায় নিঃশ্বাস লইতে পারিবেন—তাহার কোনো নিশ্চয়তা নাই। এই সম্পর্কে প্রতিটি ধর্মে, ধর্মীয় উপদেশে মানুষকে সতর্ক করা হইয়াছে। ইসলামের পবিত্র কোরআন ও হাদিসে ইহা লইয়া অসংখ্য ব্যাখ্যা রহিয়াছে।

উহার মধ্যে মাত্র কয়েকটি উল্লেখ না করিলেই নহে। সুরা আল ইমরানের ১৮৫ নম্বর আয়াতে বলা হইয়াছে, ‘প্রতিটি প্রাণকেই মৃত্যুর স্বাদ লইতে হইবে; সুরা আম্বিয়ার ৩৪ নম্বর আয়াতে বলা হইয়াছে, ‘চিরকালীনতা তো তোমাদের পূর্বের কোনো মানুষকে সাব্যস্ত করিয়া দেই নাই’; সুরা আল নিসার ৭৮ নম্বর আয়াতে বলা হইয়াছে, ‘তোমরা যেইখানেই থাকো না কেন, মৃত্যু কিন্তু তোমাদেরকে ধরবেই। যদি তোমরা সুদৃঢ় দুর্গের ভেতরে অবস্থান করো, তবুও’; সুরা জুমআ’র ৮ নম্বর আয়াতে বলা হইয়াছে, ‘হে নবী, তাহাদেরকে বলুন, যে মৃত্যু হইতে তোমরা পালাইতে চাহিতেছ তোমাদেরকে সেই মৃত্যুর সম্মুখীন হইতেই হইবে। শেষ পর্যন্ত তোমাদিগকে হাজির করা হইবে দৃশ্য ও অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা আল্লাহর কাছে। জীবদ্দশায় যাহা করিয়াছ তাহা তোমরা তখন পুরোপুরি জানিতে পারিবে।’ 

তিরমিজি শরিফের ২৮৭০ নম্বর হাদিসে আছে, রসুলে আকরাম (সা.) দূরে এবং কাছে দুইটি নুড়ি পাথর ছুড়িয়া দিয়া বলিলেন, ‘এটা এবং ওটা কীসের মতো তোমরা জানো কি?’ সাহাবাগণ বলিলেন, আল্লাহ ও তাহার রসুল ভালো জানেন। তিনি বলিলেন, ‘দূরেরটা হইল মানুষের কামনা বাসনা এবং কাছেরটা হইল তাহার হায়াত।’

কিন্তু মানুষ এই অমোঘ সত্য জানিয়াও একরকম ঘুমাইয়া থাকে। তবে তাহার পরও কথা থাকিয়া যায়। মানুষ কি জাগতিক জীবনকে পরিত্যাগ করিবে? প্রবাদ বাক্যে রহিয়াছে, ‘মরিব বলিয়া করিব না, বাঁচিলে খাইব কী?’ এই না-করিবার কথা কোথাও বলা হয় নাই। বরং মানুষকে তাহার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের কথাই সর্বত্র জোর দিয়া বলা হইয়াছে যে, স্ব স্ব দায়িত্ব পালন করিলে তাহার রিজিক হালাল হইয়া উঠে। যে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের কথা বিবেচনা করিলে দেখা যাইবে, সেই প্রতিষ্ঠানের নিট লভ্যাংশই হালাল আয় বলা যাইতে পারে। ইহা সকলেরই মনে রাখা দরকার, সেলস প্রফিট বা গ্রস ইনকাম এবং নিট প্রফিট এক কথা নহে। ইহাও মনে রাখা দরকার, একটি কোম্পানি আর স্থায়ী সম্পদ এক বিষয় নহে। স্থাবর সম্পদের বণ্টন সম্পর্কে দেশের প্রচলিত আইনের দিকনির্দেশনা রহিয়াছে, ধর্মীয় বিধানও রহিয়াছে। 

কিন্তু একটি কোম্পানিকে বোর্ড সদস্যদের বেতন-ভাতাদি বা লভ্যাংশ এমনকি শ্রমিক কর্মচারীদের বেতন-ভাতাদি প্রদান করিতে হয়। একটি কোম্পানির মুনাফা হয় সকলের সম্মিলিত দায়িত্ব ও কর্মের বিনিময়ে। ইহার ব্যত্যয় ঘটিলে কোম্পানি দিনে দিনে স্তিমিত হইয়া যাইতে বাধ্য। এই সকল কারণেই নিজ দায়িত্ব পেশাদারিত্ব ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে করিতে বলা হইয়াছে। সুরা কাসাস-এর ২৬ নম্বর আয়াতে আছে, ‘শোয়াইব (আ.)-এর দুই কন্যা মুসা (আ.)-এর কাজের শক্তি ও বিশ্বস্ততা প্রত্যক্ষ করিয়া তাহাদের পিতাকে বলিয়াছিলেন, ‘হে পিতা, আপনি মুসাকেই মজুর হিসাবে নিযুক্ত করুন। কারণ মজুর হিসাবে উত্তম হইবে সেই ব্যক্তি, যিনি দক্ষ ও বিশ্বস্ত।’ সুতরাং প্রত্যেকের নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করাটাই সবচাইতে উত্তম কাজ।

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন