সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

কিছু শিক্ষার মূল্য অনেক অনেক বেশি

আপডেট : ১৯ জুন ২০২২, ১৩:৫২

একটি সভ্য দেশের নিকট তাহার জনগণ সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের সার্বিক কল্যাণ ও সেবাদানের জন্যই আধুনিক রাষ্ট্র সদাব্যস্ত থাকে। বিপুলসংখ্যক জনগণ যখন একটি অনিশ্চিত বিপদের মধ্য দিয়া দিনযাপন করে, তখন রাষ্ট্র জনগণের সেই বিপদকে প্রশমিত করিতে সর্বোচ্চ উপায়ে যাহা করা দরকার, তাহার সকল কিছুই করে। রোমনগর পুড়িতে থাকিবে আর সম্রাট নিরো তাহার মনের আনন্দে বাঁশি বাজাইবেন, ইহা আধুনিক সভ্য রাষ্ট্রের জনগণ চিন্তাই করিতে পারে না। তাহার সর্বশেষ উদাহরণ আমরা ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের ক্ষেত্রে দেখিতে পাইয়াছি। ঘটনাটি ২০২০ সালের ২০ মে তারিখে, বরিস জনসনের জন্মদিনে। সমগ্র পৃথিবীতে তখন করোনা ভাইরাস প্রলয়নৃত্য করিতেছে। মৃত্যুর সুনামি বহিয়া যাইতেছে ইউরোপ জুড়িয়া। চারিদিকে প্রবল কড়াকড়ি, লকডাউন! এমনই উত্তাল সময়ে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন তাহার জন্মদিন উপলক্ষ্যে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের বাগানে একটি ‘ছোট্ট’ পার্টির আয়োজন করেন। ব্রিটেনের সেই কড়া লকডাউনে প্রকাশ্যে দুই জনের অধিক দেখা করা তো দূরের কথা, হঠাত্ দেখা হইলেও কমপক্ষে সাড়ে ছয় ফুট দূরে থাকিতে হইবে। ঘরে-বাহিরে কোথাও জমায়েতের অনুমতি নাই। এমনই কড়াকড়ির মধ্যেই ক্যাবিনেট রুমে প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনের পার্টি আয়োজন করা হয়। তাহার পর কোন কুক্ষণে সেই জন্মদিনের পার্টির গোপন ছবি প্রকাশ্যে আসে এবং মুহূর্তে তাহা বিশ্বব্যাপী ভাইরাল হইয়া যায়।

সভ্য দেশ বলিয়া কথা। যতই তিনি প্রধানমন্ত্রী হউন না কেন, নিয়মের বাহিরে কেহ নহেন। অযুত-লক্ষ মানুষ মহামারিতে আক্রান্ত হইয়া হাসপাতালে মৃত্যুর সহিত পাঞ্জা লড়িবেন, আর দেশটির প্রধানমন্ত্রী নিজের জন্মদিনে আনন্দে মাতিবেন, হউক তাহা নিজের ক্যাবিনটের মধ্যে—ইহা কিছুতেই মানিয়া লইতে পারে নাই ব্রিটিশরা। বরিস জনসন জানাইয়াছেন, তিনি ভাবিয়াছিলেন—ঐ পার্টিটি আসলে তাহার কাজেরই অংশ। প্রধানমন্ত্রী যতই বলুন মাত্র মিনিট দশেকের জন্য ক্যাবিনেট রুমে ঐ অনুষ্ঠান হইয়াছিল, তাহাকে শুভেচ্ছা জানাইতে ছোট্ট একটি জমায়েত হইয়াছিল; এবং তিনি নিষ্পাপ শিশুর মতো যতই বলুন— ‘সত্যি বলিতে ঐ ঘটনায় যে নিয়মবিধি ভঙ্গ হইতেছে, সেই সময় তিনি (বরিস) বুঝিয়া উঠিতে পারেন নাই’— এই সকল কথা সভ্য এবং নিয়মকানুন মানা কোনো জাতি মানিয়া লইতে পারে না। ব্রিটেনও পারে নাই। দিন যত গিয়াছে, এই ঘটনার ততই ভয়াবহ অভিঘাত হইয়াছে। বিরোধীরা প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ চাহিয়াছেন। বরিসের নিজের দলের একাংশ বরিসের উপর অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হইয়াছেন। এমনকি কড়া লকডাউন চলাকালীন পার্টির আয়োজনের কথা শুনিয়া ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের কিছু কর্মীও অবাক হইয়াছিলেন। এক কর্মী অন্য জনকে মেসেজ করিয়া লিখিয়াছেন—এ ই সকল কী হইতেছে? অন্য জনের উত্তর—এইগুলি কি সত্যি সত্যি হইতেছে?

অতঃপর টেমস নদীর পানি বহুদূর গড়াইয়াছে। বরিস জনসনকে জরিমানা দিতে হইয়াছে এবং পার্লামেন্টে দাঁড়াইয়া নিঃশর্ত ক্ষমা চাহিতে হইয়াছে। সেই ঘটনার তদন্ত শুরুর প্রায় ছয় মাস পর প্রকাশিত সু গ্রে রিপোর্টে পরিষ্কার বলা হইয়াছে, ‘অতিমারি কালে যখন সাধারণ মানুষের জীবন একের পর এক দুরূহ নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে আটকাইয়া ছিল, সেই সময়ে সরকারের এই ধরনের আচরণ কোনো যুক্তিতেই সঠিক প্রমাণ করা অসম্ভব।’ ঐ রিপোর্টে আরো বলা হয়— ‘এই কাজের দায়ভার ডাউনিং স্ট্রিটকেই লইতে হইবে। যাহারা সরকারের মাথায় বসিয়া রহিয়াছেন, তাহাদের নিকট হইতে এই আচরণ প্রত্যাশিত নহে।’ সর্বশেষ গত ৬ জুন গোপন ভোটে কনজারভেটিভ পার্টির ৩৫৯ এমপির মধ্যে ২১১ জনের ভোট পান বরিস জনসন। অর্থাত্, দলের ১৪৮ এমপির সমর্থন তিনি হারাইয়াছেন! তিনি টিকিয়া গিয়াছেন বটে, তবে একটি সভ্য দেশে জনগণের বিষাদ-বিপদক্ষণে আনন্দ করিবার ফল কী হইতে পারে— তাহা তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করিয়াছেন। গ্রের রিপোর্ট প্রকাশের পরেই হাউজ অব কমন্সে দাঁড়াইয়া বরিস বলিয়াছেন, ‘এই ঘটনা হইতে আমি শিক্ষা পাইয়াছি।’ এই শিক্ষা তিনি কেবল পান নাই, অন্যদেরও তিনি দিয়াছেন। যদিও সেই শিক্ষার মূল্য অনেক অনেক বেশি।

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

ধন্য তাহার জীবন

আছে খরার আঘাতও

‘অসময়ে হায় হায় কেউ কারো নয়’

‘অসময়ে হায় হায় কেউ কারো নয়’

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এই আচরণের ব্যত্যয় ঘটাইতে হইবে

টিকিয়া থাকিতে চাওয়া মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি

পবিত্র আশুরা: অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের চেতনা

প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থাপনা