শনিবার, ২০ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

যে কথা আব্বাকে বলা হয়নি

আপডেট : ২০ জুন ২০২২, ১২:০৮

‘চোখে দেখবে কানে শুনবে’, ‘পড়াশোনা করছো তবে জ্ঞানী হওনি’। আবার বিদ্যুৎ চলে গেলে ‘সে গেলো তো গেলো আর ফিরে এলো না- ইংলিশ করো’— কথাগুলো ছোটবেলায় নিয়মিত শুনতাম। আব্বা বলতেন। তখন মর্মার্থ না বুঝলেও এখন বেশ বুঝি। উনি ছিলেন দূরদর্শিতা সম্পন্ন। এজন্যই নৈতিক শিক্ষায় কোনও কার্পণ্য করেননি। আমাদের প্রথম শিক্ষক তিনি, এ ছাড়া পথচলার হিরো।

একটি বড় পরিবার থেকে উঠে আসা ছেলে আমি। যেখানে দাদি, মা, বাবা আর আমরা চার ভাই-বোন। আব্বা একা সামলেছেন এত বড় দায়িত্ব। আমি তখন ছোট, তেমন কিছুই বুঝি না। তবে আব্বার স্ট্রাগল দেখেছি। হয়তো তখন অনুভব করতে পারিনি। এই লোকটা এখনও আমাদের পরিবারের কাণ্ডারি। তাঁকে কোনোদিন ক্লান্ত দেখিনি। দেখিনি আফসোস করতে। অল্পতে সন্তুষ্ট থাকতে বেশ ভালোবাসেন। আব্বা খুব করে চাইলেন, উনার ছেলে-মেয়ে সব প্রতিষ্ঠিত হোক। হয়তো তাঁর এ চাওয়া অনেকটাই পূরণ হয়েছে। অনেকটা কেন বললাম, কারণ যেমনটা চেয়েছিলেন; হয়তো আপ টু দ্য মার্ক হয়নি।

আব্বাকে তখনকার সময়ে অনেকেই পরামর্শ দিতেন, ‘বড় ফ্যামিলি। আপনার পক্ষে একা সামলানো বেশ কঠিন। এরচেয়ে ছেলেগুলোকে কাজে লাগিয়ে দেন। দ্রুত সংসারে উন্নতি হবে। এ ছাড়া আপনার পরিশ্রমও সাঙ্গ হবে’। আব্বার অনেকগুলো গুণের মধ্যে একটি হচ্ছে, উনি নিজের চিন্তা-চেতনাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিতেন। এখনও তেমনটাই করেন। উনি সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। কষ্ট হোক, সবাইকে শিক্ষিত করবেন। এটার উনার স্বপ্ন ও ধ‌্যান ছিল।

আমার আব্বা ব্যাংকার। জনতা ব্যাংকে এখনও কর্মরত। কদিন আগেও দেখা হলো। ছুটির দিন থাকাতে আব্বাকে বাড়িতেই পেলাম। নামাজের বিছানাতে শুয়ে আছেন। আমাকে দেখেই চোখের পানি ছেড়ে দিলেন। সবার বেলাতেই তিনি এমনটা করেন। কারণ উনার স্বপ্ন পূরণে অনেকে আজ কর্মক্ষেত্রে দূরে থাকেন। মাস ছয়েক বা তার বেশি সময় পরও দেখা হয় আমাদের। এ আবেগ ধরে রাখার নয়!

আব্বার সঙ্গে আমাদের ছিল ভীষণ দূরত্ব। তাঁকে আমরা ভয় পেতাম। ছুটির দিনে পড়া ধরতেন তিনি। রাতে বিদ‌্যুৎ চলে গেলে হারিকেন জ্বালিয়ে উঠোনে বসিয়ে দিতেন। এখনকার বাচ্চারা যতটা নির্দ্বিধায় বাবাকে মনের কথা বলতে পারেন, আমরা পারিনি। তবে হতাশাও নেই। এজন‌্যই নিজেদের এখনকার প্রজন্মের চেয়ে বেশ পরিপক্ক মনে হয়। কারণ আমরা পরিস্থিতি আঁচ করতে পারি, যা আব্বা ছোটবেলায় বলতেন। 

আব্বা পুরনো যুগের মানুষ। ভার্চুয়াল জীবন উনাকে স্পর্শ করেনি। উনিও এই স্রোতে নিজেকে বিলাতে চান না। সেদিন বিড়বিড় করে আমাকে বলতেছেন, ‘আমার চাওয়া অনেকটাই পূরণ হয়েছে। আজ সবাই যার যার জায়গায় পরিপূর্ণ। তবে আমার সঙ্গে দূরত্ব বেড়ে গেছে। এটাই সমস্যা’। আমার উত্তর, ‘আব্বা এটাই তো অনুমেয়। জীবন গতিময়, মেনে নিতে হবে। আপনিও তো কারও কাছে যান না। শহরের কাঠখোট্টা প্রকৃতি আপনাকে টানে না। তবে আপনি ডাকলেই তো আমরা চলে আসি’।

আব্বাকে আমি একদৃষ্টিতে দেখি। এই মানুষটার চাহনিতে আমরা ভয়ে কাঁপতাম। পড়াশোনা আর নৈতিক শিক্ষায় তিনি কতটা কঠোর ছিলেন। ছুটির দিনে গোসল করাতেন। তেল মেখে দিতেন শরীরে। আমার আব্বাটা এখন শিশু হয়ে গেছেন। তিনিও এখন সন্তানের কোলে আশ্রয় চান। আহ্, এটাই কালের বিবর্তন।

এখনকার সময়ের মতো আব্বার সাথে আমাদের বন্ডিং এত সহজ ছিল না। আব্বা মানে আব্বা। শাসন, কঠোরতা, আদর, ভরসা— সব ছিল। আমার এখনও মনে পড়ে, ছোটবেলায় আব্বার পোস্টিং ছিল আমার নানা বাড়ির এলাকায়। উনি সেখানকার মেসে থাকতেন। তখন সরকারি ছুটি এক দিন ছিল। আব্বা বৃহস্পতিবার রাতে আসতেন, শনিবার ভোরে চলে যেতেন। আমরা ছোট দুজন মাত্র এক বেলা আব্বাকে দেখতাম। কোনোদিন ভাবতেও পারিনি, বিশেষ করে আমি; আব্বা-আম্মাকে দূরে রেখে থাকতে পারবো। সময়ের পালাবদলে আমি পারছি ঠিকই। রাতে ঘুমানোর সময় বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে, আব্বা-আম্মা খেয়েছে তো! তারা সুস্থ তো।

আব্বাকে কোনও বিশেষ দিনে স্মরণের পক্ষে আমি নয়। এসব নিয়ে ভার্চুয়ালি ‘নীতির’ ধারও ধারি না। এজন‌্য বাবা দিবসে আলাদা করে অভিব্যক্তি প্রকাশ থেকেও বিরত থাকি। আব্বার স্বপ্ন পূরণের সারথি হতে পেরেছি, এতেই পুলক অনুভব করি। তবে এখনও উনাকে সামনাসামনি বলতে পারিনি, আব্বা কতটা ঋণী আপনার কাছে। কতটা ভালোবাসি আপনাকে। চোখ ছলছল করে স্মৃতির গভীরে ডুব দিলে। আব্বাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার দিতে মন চাই। আব্বা আপনার চেয়ে বেশি কেউ আমাদের নিয়ে ভাবেনি। জীবনের স্বাদ-আহ্লাদ সব শেষ করে দিয়েছেন আমাদের জন্য। আমরা এখনও কিছুই করতে পারিনি আপনার জন্য। ক্ষমা করবেন।

বাবা দিবসে পৃথিবীর সব বাবা ভালো থাকুক, সুস্থ থাকুক। আমার বাবাও দীর্ঘজীবী হোক। বেঁচে থাকুক আমাদের মাঝে।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক, রাইজিংবিডি ডটকম।

ইত্তেফাক/মাহি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন