সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই রক্ষাকবচ

আপডেট : ২১ জুন ২০২২, ১০:০৮

দুই মাসেরও কম সময় পূর্বে যখন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ শেষ পর্যন্ত লড়াকু জয়লাভ করেন, তখন বিশ্বের তাবৎ উদার গণতন্ত্রপন্থিরা স্বস্তি পাইয়াছিলেন; কিন্তু কিছুদিন না যাইতেই দুঃসংবাদ আসিয়া তাহাদের কিছুটা হতাশায় নিমজ্জিত করিল। কেননা গত রবিবার পার্লামেন্টের নির্বাচনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ জাতীয় আইনসভার নিয়ন্ত্রণ হারাইলেন। তাহার মধ্যপন্থি জোট এনসেম্বল পার্লামেন্টের ৫৭৭টি আসনের মধ্যে লাভ করিয়াছে ২৪৫টি আসন। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে তাহাদের দরকার ছিল ২৮৯টি আসন।

পক্ষান্তরে তাহাদের চাইতে অপেক্ষাকৃত ভালো করিয়াছে জ্যঁ লুক মেলাঞ্চের নেতৃত্বাধীন নুপেস জোট ও ডানপন্থি ন্যাশনাল র্যালি পার্টি। নুপেস জোটে রহিয়াছে সমাজবাদী, বামপন্থি ও গ্রিন পার্টি। তাহারা পাইয়াছে ১৩১টি আসন। এই জোটের বাহিরে থাকা অন্যান্য বাম দল পাইয়াছে আরো ২২টি আসন। আর মারিন লু পেনের কট্টর ডানপন্থি ন্যাশনাল র্যালি পার্টি নূতন করিয়া আটটি আসনে জয় পাওয়ায় তাহাদের আসন সংখ্যা দাঁড়াইয়াছে ৮৯। উদার গণতন্ত্রপন্থিদের এই বিপর্যয়ে ফ্রান্সে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরির আশঙ্কা করা হইতেছে।

ফ্রান্সের এই নির্বাচনি ফলাফলকে কেন্দ্র করিয়া অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক বলিবার চেষ্টা করিতেছেন যে, বিশ্বে কট্টর বাম ও ডানপন্থিদের জয়জয়কার দেখা দিতেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, একই সময়ে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করিয়াছেন বামপন্থি সাবেক গেরিলা নেতা গুসতাবো পেত্রো। তিনি দেশটির প্রথম বামপন্থি প্রেসিডেন্ট। দারিদ্র্য ও অসমতায় হতাশ ভোটাররা শেষ পর্যন্ত তাহাকে নির্বাচিত করিয়াছেন বলিয়া ধারণা করা হইতেছে। পৃথিবীতে যুদ্ধ বা মহামারির মতো বড় বড় ঘটনার পর দেশে দেশে রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি প্রভৃতিতে পরিবর্তন আসিতে দেখা যায়। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই ব্যাপক পরিবর্তন আমরা লক্ষ করিয়াছি। এখন বলা হইতেছে, করোনা মহামারি ও ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করিয়া পৃথিবী আবার বদলাইয়া যাইতেছে। ভূরাজনীতি ইতিমধ্যেই বদলাইয়া গিয়াছে, যদিও এখনো তাহা পরিপূর্ণভাবে স্পষ্ট নহে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ডানপন্থি, জাতীয়তাবাদী, অভিবাসনবিরোধী ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমালোচকদের উত্থান ঘটিতেছে। এই সকল রাজনৈতিক দলের কোনো কোনো নেতা ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলাকে স্বাগতও জানাইয়াছেন। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরব্যান মস্কোপন্থি। তিনি চতুর্থ বারের মতো ক্ষমতায় ফিরিয়া আসিয়াছেন। ইতালির নেতা মাত্তিও সালভিনি পুতিনের নামাঙ্কিত টি-শার্ট পরিয়া ঘুরিয়া বেড়ান। গত মাসে স্পেনে চরম ডানপন্থি ভক্স পার্টি প্রথম বারের মতো একটি আঞ্চলিক সরকারে যোগ দিয়াছে। এদিকে গত মাসে অস্ট্রেলিয়ায় বামপন্থি নেতা অ্যানথনি আলবানিজ সরকার গঠন করিয়াছেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে সবচাইতে অধিক শরণার্থী সমস্যা দেখা দিয়াছে। ইহার ফলে ডানপন্থিদের উত্থানে বিস্মিত হইবার কিছু নাই। তবে এই পরিস্থিতি খুব বেশি দিন বিরাজ করিবে বলিয়া মনে হয় না। ইউক্রেন যুদ্ধের ফলাফল ইহার গতিধারা আবার পরিবর্তন করিয়া দিতে পারে। ইহার পাশাপাশি উদার গণতন্ত্রপন্থিরা যে কোথাও কোথাও ভালো করিতেছেন তাহারও দৃষ্টান্ত রহিয়াছে। যেমন—স্লোভেনিয়ায় উদারপন্থি বিরোধী দল ডানপন্থিদের পরাজিত করিয়া ক্ষমতায় আসিয়াছে। সম্প্রতি মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও দার্শনিক ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা ‘লিবার্যালিজম অ্যান্ড ইটস ডিসকনটেন্টস’ বলিয়া একটি বই লিখিয়াছেন, যেইখানে তিনি দেখাইতে চাহিয়াছেন যে, বাম-ডানপন্থীদের উত্থানে বিশ্বে উদারনৈতিকতা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। তবে ইউরোপসহ বিশ্বের যেই দেশেই নির্বাচনে বাম ও ডানপন্থিদের বিজয় হউক না কেন, শেষ পর্যন্ত তাহাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়াই আসিতে হইতেছে। এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যতদিন থাকিবে, ততদিন ভয়ের কোনো কারণ নাই। গণতান্ত্রিক নীতি ও প্রক্রিয়া মানিবার কারণে এমনিতেই তাহাদের চরমপন্থা অনেকটা সংশোধিত হইতে বাধ্য। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তাহাদের নাকে দড়ি দিয়া সঠিক পথে রাখিতে সহায়তা করিবে। গণতন্ত্রের যেই সৌন্দর্য ব্যক্তিস্বাধীনতা, সহনশীলতা, মানবাধিকার, আইনের শাসন ইত্যাদি প্রক্রিয়াগত কারণে তাহারা ইহা উপেক্ষা করিতে পারিবে না। অতএব, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিতরে থাকিয়া গণতন্ত্রের বাহিরে অন্য কোনো আদর্শ বাস্তবায়ন করিবার সুযোগ নাই।

ইত্তেফাক/এমআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

ধন্য তাহার জীবন

আছে খরার আঘাতও

‘অসময়ে হায় হায় কেউ কারো নয়’

‘অসময়ে হায় হায় কেউ কারো নয়’

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এই আচরণের ব্যত্যয় ঘটাইতে হইবে

টিকিয়া থাকিতে চাওয়া মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি

পবিত্র আশুরা: অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের চেতনা

প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থাপনা