সম্প্রতি সারা দেশের আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্হা বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। এতে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ সমর্থিত সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ কর্তৃক মনোনীত প্যানেল চূড়ান্ত ফলাফলে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হয়েছে। ১৪ আসনের ১০ আসনে (সাধারণ ৪ আঞ্চলিক ৬) বিজয় লাভ করেছে। বাকি তিন সাধারণ ও একটি আঞ্চলিক আসনে বিএনপি সমর্থিত প্যানেল জয়ী হয়েছে। সমন্বয় পরিষদের বিজয়ীরা হলেন :সাধারণ আসন: (প্রাপ্ত ভোটের ক্রমানুযায়ী) মোহাম্মদ সাঈদ আহমেদ (রাজা), সৈয়দ রেজাউর রহমান, মোহাম্মদ মোখলেছুর রহমান বাদল, মো. রবিউল আলম বুদু। অন্যদিকে বিএনপি সমর্থিত প্যানেল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন মাহবুব উদ্দীন খোকন, জয়নাল আবেদিন ও রুহুল কুদ্দুস কাজল।
সুপ্রিম কোর্ট বার হল বাংলাদেশের সব বারের পেরেন্ট বার। বাংলাদেশের বাস্তবতার ভিত্তিতে, দেশের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে, মুক্তিযুদ্ধসহ সব গণতান্ত্রিক, স্বৈরাচার ও সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে দলমতনির্বিশেষে আইনজীবীদের ভূমিকা অবিস্মরণীয় ও উল্লেখযোগ্য। আর বরাবরই সুপ্রিম কোর্ট বারই সব আন্দোলন সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছে, এমনকি সংকটাপন্ন মুহূর্তে জাতিকে দিকনির্দেশনাও দিয়েছে এই সুপ্রিম কোর্ট বার। নিকট অতীত বিগত ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের সময় যখন দুই নেত্রীকে জেলের বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট বারের আইনজীবীরাই জীবনের হুমকি নিয়ে তাদের মুক্ত করতে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তারও আগে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি বিএনপি জোট সরকারের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গঠিত সচিবালয়ের সন্নিকটে জনতার মঞ্চকে যখন পুলিশ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল, জনতা ও দলীয় নেতাকর্মীরা যখন নিজেদের জীবন নিয়ে দৌড়ে পালিয়েছিল, সেদিন সুপ্রিম কোর্ট বারের আইনজীবীরাই সেখানে গিয়ে পুলিশের সরাসরি মোকাবিলা করে জনতা মঞ্চকে পুনরায় চালু করেছিল। এ ইতিহাস দেশের সব মানুষের জানা। আমি নিজেও সেদিন সুপ্রিম কোর্ট বারের একজন সদস্য হিসেবে ছিলাম।
নির্বাচনসহ দেশের অন্য যে কোনো সংকটে সুপ্রিম কোর্ট বারের সিনিয়র সদস্য যারা প্র্যাকটিসের বাইরে থেকে সার্বক্ষণিক রাজনীতি করতেন, দলের সিনিয়র নেতৃত্বে ছিলেন, যেমন প্রয়াত জিল্লুর রহমান, প্রয়াত আব্দুল মমিন, প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, প্রয়াত সাহারা খাতুন, আমীর হোসেন আমুসহ অনেকেই সুপ্রিম কোর্ট বারে চলে আসতেন। বারের সিনিয়রও প্রজ্ঞাবান আইনজীবী ও আইনজীবী নেতাদের সঙ্গে কথা বলে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিতেন। নির্বাচনে প্রার্থী নির্ধারণেও ভূমিকা রাখতেন। ইদানীং তার ব্যতিক্রম ঘটছে। সুপ্রিম কোর্ট বারের আইনজীবী নেতারা অন্য নেতাদের কাছে যাচ্ছেন, এমনকি জেলা বারের নেতৃত্বের কাছেও যাচ্ছেন। বার কাউন্সিলের প্যানেলের নেতৃত্বও দিচ্ছেন জেলা বারের নেতারা। এবারের আইনজীবী সমন্বয় পরিষদের নেতৃত্বে ছিলেন ঢাকা বারের শ্রদ্ধেয় সিনিয়র অ্যাডভোকেট রেজাউর রহমান, অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম ও মুখলেছুর রহমান বাদল। তবে বিএনপি-সমর্থিত প্যানেলের পুরো নেতৃত্ব ছিল সুপ্রিম কোর্ট বারেরই।
নির্বাচনি ফলাফলেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম প্রতিফলিত হয়েছে। একমাত্র সিনিয়র সৈয়দ রেজাউর রহমান বাদে দুই প্যানেলেরই বয়সে অপেক্ষাকৃত তরুণেরা বেশি ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। সিনিয়রদের অধিকাংশই পরাজিত হয়েছেন, কেউ কেউ কম ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন।
সাধারণত আইনজীবীরা সরকারবিরোধী মনোভাব পোষণ করেন এবং বিরোধী প্যানেলে ভোট দিয়ে সরকারের ক্ষমতার কিছুটা ভারসাম্য টানতে চেষ্টা করেন। এবার তা হয়নি। সরকার-সমর্থিত প্যানেল জয়ী হওয়ায় আইনজীবীদের মধ্যে সরকারের ভালো ভাবমূর্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ দেশের বড় বড় অধিকাংশ জাতীয় নেতাই ছিলেন আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সদস্য। বঙ্গবন্ধু মুজিবের সহযোগী ও স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী ও পরবর্তী কালের দেশের জাতীয় নেতৃত্বের অধিকাংশই ছিলেন আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সদস্য।
সর্বপ্রয়াত সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, আব্দুল মমিন, রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া, মনোরঞ্জন ধর, সুধাংশু শেখর হালদার, ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদের মতো প্রথিতযশা আইনজীবীরা একসময় এই বারের নেতৃত্বে ছিলেন।
ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম ও ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেনসহ অনেকেই এখনো জীবিত আছেন। উপমহাদেশের সিনিয়র আইনজীবী সর্বপ্রয়াত সবিতা রঞ্জন (এস আর) পাল, শামছুল হক চৌধুরী, সিরাজুল হক, ব্যারিস্টার রফিকুল হক, ভাষাসৈনিক অ্যাডভোকেট গাজিউল হক, ড. জহির, ড. রফিকুর রহমান ও সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল আমিনুল হকের মতো অনেকেই আবার কোনো রাজনৈতিক দল করতেন না, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি ছিলেন। সব গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগ্রামের নেতৃত্বে ও সঙ্গে ছিলেন।
আইনজীবীরা হলেন দেশের সর্বাপেক্ষা সচেতন অংশ। জুরিসপ্র‚ ডেন্সে আইনজীবীদের বলা হয় সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ার, অর্থাৎ সমাজের প্রকৌশলী। তারা সমাজকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখেন বিভিন্নভাবে। সমাজের অন্যায়, অপরাধের বিচারের মাত্রা, পরিমাপ, নিয়ন্ত্রণ, রাষ্ট্র, সমাজ, ব্যক্তি বা যে কোনো সংগঠনের দ্বারা সংগঠিত অতিরিক্ত, বেআইনি কাজ, চাপ, যাতনা, শাস্তির নিক্তির পরিমাপে সরকার বা রাষ্ট্রের শাসন ও বিচারিক কাজে আদালতের অংশ হিসেবে বিচারকাজে সহায়তা করে। সে হিসেবে একজন প্রকৃত ভালো আইনজীবী সাধারণ জনগণের বন্ধু, সেবক বা গার্ডিয়ান। পাশাপাশি সরকার বা প্রশাসনের বিভিন্ন অতিরঞ্জন, অপশাসন, নির্যাতন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলে ক্ষমতা ভারসাম্য রক্ষায় অনন্য ভূমিকা রাখেন। আর এসবের মূল নেতৃত্বেই থাকে সুপ্রিম কোর্ট বার।
সব দিক বিবেচনায় সুপ্রিম কোর্ট বারকে বলা হয় দেশের দ্বিতীয় সংসদ (সেকেন্ড পার্লামেন্ট)। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের অপেক্ষাকৃত তরুণ নতুন নেতৃত্বকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি, সুপ্রিম কোর্ট বারের ধারাবাহিক ঐতিহ্য বজায় রাখায় তাদের সমন্বিত প্রয়াস অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা করছি।
লেখক: সাবেক আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার

