ব্যাটিং উইকেটে ইংল্যান্ডের রান উত্সব, সাম্প্রতিক সময়ে ক্রিকেট বিশ্বের খুব চেনা দৃশ্য। গতকাল জ্যাসন রয়ের সেঞ্চুরি, জস বাটলার-জনি বেয়ারস্টোর হাফ সেঞ্চুরি ও লিয়াম প্লাঙ্কেটদের ঝড়ো ব্যাটিংয়ে ৬ উইকেটে ৩৮৬ রানের পাহাড়সম স্কোর গড়ে ইংল্যান্ড। জবাবে ৪৮.৫ ওভারে ২৮০ রানে অল-আউট হয় বাংলাদেশ। ১০৬ রানের বড় ব্যবধানের হার নিয়ে মাঠ ছাড়ে মাশরাফি বাহিনী। গতকাল কার্ডিফে বাংলাদেশের বোলারদের চরম দুর্দিনে ব্যাট হাতে স্বাগতিকদের যা কিছু জবাব দিয়েছেন শুধু সাকিব আল হাসান। মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের পর বিশ্বকাপে দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে সেঞ্চুরি করার গৌরব অর্জন করেছেন তিনি। ক্যারিয়ারের অষ্টম সেঞ্চুরিতে চলমান আসরে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকও (২৬০) এখন বিশ্বের এক নম্বর এই অলরাউন্ডার।
সাকিবের সেঞ্চুরির পরও রান পাহাড়ে চাপা পড়া বাংলাদেশ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। কার্ডিফের অতীত সুখস্মৃতিও জাগাতে পারেনি টাইগারদের। তাই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে হারানোর হ্যাটট্রিক করা হয়নি। ২০১১, ২০১৫ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জিতেছিল বাংলাদেশ।
গতকালের খেলায় ম্যাচ সেরা হন ইংল্যান্ডের সেঞ্চুরিয়ান জ্যাসন রয়। বাংলাদেশের এটি টানা দ্বিতীয় হার। কার্ডিফের রান স্বর্গে জয়ের জন্য ৩৮৭ রানের সুবিশাল টার্গেট পাড়ি দিতে গিয়ে ৬৩ রানে সৌম্য (২), তামিমের (১৯) উইকেট হারায় বাংলাদেশ। তৃতীয় উইকেটে সাকিব ও মুশফিক ১০৬ রানের জুটি গড়েন। ২৯তম ওভারের শেষ বলে ছন্দপতন হয় এ জুটির। মুশফিক আউট হন ৪৪ রান করে। দুই বলের ব্যবধানে মিঠুনও (০) ফিরেন। দ্রুত দুই উইকেট হারানোর চাপ কেটেছিল পঞ্চম উইকেটে সাকিব-মাহমুদউল্লাহ ৪৯ রানের জুটিতে।
একপ্রান্ত আগলে থাকা সাকিব ৯৫ বলে সেঞ্চুরি পূরণ করেন। তার আগের সেঞ্চুরিটাও ছিল এই কার্ডিফেই, ২০১৭ সালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে। দলীয় ২১৯ রানে স্টোকসের বলে বোল্ড হন সাকিব। ১১৯ বলে ১২১ রানের (১২ চার, ১ ছয়) ইনিংস খেলেন তিনি। তার বিদায়েই কার্যত বাংলাদেশের সব আশা শেষ হয়ে যায়। পরে মাহমুদউল্লাহর ২৮, মোসাদ্দেকের ২৬, মিরাজের ১২ রান শুধু হারের ব্যবধানই কমাতে পেরেছে। ইংল্যান্ডের আর্চার, স্টোকস তিনটি করে এবং মার্ক উড দুইটি উইকেট নেন।
ইংল্যান্ডের রানের ফল্গুধারার চাপেই কি না মাঠে বাংলাদেশ দলের শরীরী ভাষায় হতোদ্যম হয়ে পড়ার ছবি স্পষ্ট ছিল। দৃষ্টিকটু মিস ফিল্ডিংয়ের মহড়া হয়েছে, ক্যাচ মিস হয়েছে। সব মিলিয়ে ফিল্ডিং, বোলিংয়ে বাংলাদেশ ছিল ছন্নছাড়া। যার সুযোগে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সপ্তম সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড গড়ে ইংল্যান্ড। এর আগে সর্বোচ্চ ৬ উইকেটে ৪১৭ রান করেছিল অস্ট্রেলিয়া, ২০১৫ সালে আফগানিস্তানের বিপক্ষে। টানা সাত ওয়ানডেতে তিনশোর বেশি রান করে বিশ্বরেকর্ডও গড়ে ইংল্যান্ড।
গতকালকের ইংল্যান্ডের স্কোরটি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো দলের সর্বোচ্চ সংগ্রহ। এর আগে ২০১১ সালে মিরপুরে ৩৭০ রান করেছিল ভারত। ওয়ানডেতে বাংলাদেশের বিপক্ষে সর্বোচ্চ ৩৯১ রানটাও ইংল্যান্ডের, ২০০৫ সালে। গতকাল দ্বিতীয় স্থানেও নিজেদের নামটা খোদাই করে দিল তারা। বিশ্বকাপের ইতিহাসে ইংলিশদেরও সর্বোচ্চ রান এটি। এর আগে সর্বোচ্চ ছিল ৩৩৮ রান, ২০১১ সালে। এছাড়া চলমান আসরেও এটি দলীয় সর্বোচ্চ স্কোর।
এর আগে ইনিংস জুড়েই ইংলিশ ব্যাটসম্যানরা আক্রমণাত্মক ছিলেন। জ্যাসন রয়- জনি বেয়ারস্টোর ১২৮ রানের ওপেনিং জুটি ভেঙেছিলেন মাশরাফি। ২০তম ওভারে বেয়ারস্টোর ক্যাচ নেন মিরাজ। তিনি ৫১ রান করেন। ৩৮ বলে হাফ সেঞ্চুরি ও ৯২ বলে ক্যারিয়ারের নবম সেঞ্চুরি পূরণ করেন জ্যাসন রয়। ১২০ বলে দেড়শ রানে পৌঁছান। ৩৫তম ওভারে মিরাজকে টানা তিন ছক্কা মারার পর চতুর্থ বলে মাশরাফির হাতে ক্যাচ দেন এই ইংলিশ ওপেনার। দলীয় ২৩৫ রানে ফিরেন তিনি। ১২১ বলে ১৫৩ রান (১৪ চার, ৫ ছয়) করেন তিনি। ওপেনারদের তৈরি করে দেওয়া ভীত পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগিয়েছে ইংল্যান্ড। পরে বাটলার ৪৪ বলে ৬৪, মরগান ৩৫, প্লাঙ্কেট ৯ বলে অপরাজিত ২৭, ক্রিস ওকস ৮ বলে অপরাজিত ১৮, রুট ২১ রান করেন। রান খরচে বাংলাদেশের বোলাররা সবাই ছিলেন উদারহস্ত। সাইফউদ্দিন-মিরাজ দুটি করে, মাশরাফি-মুস্তাফিজ একটি করে উইকেট নেন।
বাংলদেশ-ইংল্যান্ড
স্কোরকার্ড
ইংল্যান্ড রান বল ৪ ৬
জেসন রয় ক মাশরাফি ব মিরাজ ১৫৩ ১২১ ১৪ ৫
বেয়ারস্টো ক মিরাজ ব মাশরাফি ৫১ ৫০ ৬ ০
রুট বোল্ড ব সাইফউদ্দিন ২১ ২৯ ১ ০
বাটলার ক সৌম্য ব সাইফউদ্দিন ৬৪ ৪৪ ২ ৪
মরগান ক সৌম্য ব মিরাজ ৩৫ ৩৩ ১ ২
স্টোকস ক মাশরাফি ব মুস্তাফিজুর ৬ ৭ ০ ০
ওকস অপরাজিত ১৮ ৮ ০ ২
প্লাংকেট অপরাজিত ২৭ ৯ ৪ ১
অতিরিক্ত (লে বা-৩, নো-১, ও-৭) ১১
মোট (৫০ ওভারে ৬ উইকেটে) ৩৮৬
উইকেট পতন : ১/১২৮ (বেয়ারস্টো), ২/২০৫ (রুট), ৩/২৩৫ (রয়), ৪/৩৩০ (বাটলার), ৫/৩৪০ (মরগান), ৬/৩৪১ (স্টোকস)।
ব্যাট করেননি: আর্চার, রশিদ, উড
বোলিং: সাকিব ১০-০-৭১-০, মাশরাফি ১০-০-৬৮-১, সাইফউদ্দিন ৯-০-৭৮-২, মুস্তাফিজুর ৯-০-৭৫-১, মিরাজ ১০-০-৬৭-২, মোসাদ্দেক ২-০-২৪-০।
বাংলাদেশ
তামিম ক মর্গান ব উড ৯ ২৯ ১ ০
সৌম্য ব আর্চার ২ ৮ ০ ০
সাকিব ব স্টোকস ১২১ ১১৯ ১২ ১
মুশফিকুর ক রয় ব প্লাঙ্কেট ৪৪ ৫০ ২ ০
মিঠুন ক বেয়ারস্টো ব রশিদ ০ ২ ০ ০
মাহমুদুল্লা ক বেয়ারস্টো ব উড ২৮ ৪১ ১ ১
মোসাদ্দেক ক আর্চার ব স্টোকস ২৬ ১৬ ৪ ০
সাইফুদ্দিন ব স্টোকস ৫ ৮ ০ ০
মিরাজ ক বেয়ারস্টো ব আর্চার ১২ ৮ ২ ০
মাশরাফি অপরাজিত ৪ ৯ ০ ০
মুস্তাফিজুর ক বেয়ারস্টো ব আর্চার ০ ৩ ০ ০
অতিরিক্ত (লেবা ৯, ওয়া ১০) ১৯
মোট (৪৮.৫ ওভারে অলআউট) ২৮০
উইকেট পতন: ১/৮ (সৌম্য), ২/৬৩ (তামিম), ৩/১৬৯ (মুশফিকুর), ৪/১৭০ (মিঠুন), ৫/২১৯ (সাকিব), ৬/২৫৪ (মোসাদ্দেক), ৭/২৬১ (মাহমুদুল্লা), ৮/২৬৪ (সাইফুদ্দিন), ৯/২৮০ (মিরাজ), ১০/২৮০ (মুস্তাফিজুর)।
বোলিং: ওকস ৮-০-৬৭-০, আর্চার ৮.৫-২-২৯-৩, প্লাঙ্কেট ৮-০-৩৬-১, উড ৮-০-৫২-২, রশিদ ১০-০-৬৪-১, স্টোকস ৬-১-২৩-৩।
