ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার রাজবাড়ীতে স্কুলছাত্রী ও ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে গৃহবধূকে পুড়িয়ে হত্যা চেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে। উভয় ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা হয়েছে। খবর আমাদের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতার।
রাজবাড়ী : রাজবাড়ীতে আপত্তিকর ছবি তুলে ব্লাকমেইলের পর টাকা আদায় করতে না পেরে স্কুলছাত্রীকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সদর থানার ওসি স্বপন কুমার মজুমদার জানান, এ ব্যাপারে পর্নগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনসহ কয়েকটি ধারায় মামলা হয়েছে। শুক্রবার রাতে ঐ ছাত্রীর বাবা শিল্পী বেগম নামে এক নারীসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরো চারজনের বিরুদ্ধে এই মামলা করেন। শিল্পী রাজবাড়ী সদর উপজেলার খোলাবাড়িয়া গ্রামের জাহাঙ্গীর মিজির স্ত্রী।
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, গত ১২ এপ্রিল স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজন লোক তার মেয়েকে রাস্তার পাশে জঙ্গলে নিয়ে হত্যার ভয় দেখিয়ে আপত্তিকর ছবি তোলে। সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে শিল্পী দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। কিন্তু পরিবার টাকা দেয়নি। ‘গত বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে আমার মেয়ে বাড়ির বারান্দায় একা বসে জামরুল খাচ্ছিল। এ সময় আকস্মিকভাবে অজ্ঞাতপরিচয় চারজন বোরকা পরা লোক এসে তাকে ধরে নিয়ে যায়। বাড়ির পেছনে একটি পাটখেতে নিয়ে ওড়না দিয়ে তার হাত-পা ও মুখ বেঁধে গায়ের কাপড়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। সে মাটিতে গড়াগড়ি করে আগুন নিভিয়ে প্রাণে রক্ষা পায়। আরো পরে আমার স্ত্রী বাড়ি ফিরে মেয়ের গোঙানির শব্দ শুনতে পায়। সে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে।’ তারপর গ্রাম্য চিকিত্সকের চিকিত্সায় ওই ছাত্রী সুস্থ হয় বলে তিনি জানান। ওসি স্বপন বলেন, পুলিশ তার আংশিক পোড়া কামিজ ও পাজামা উদ্ধার করেছে। জেলার পুলিশ সুপার আসমা সিদ্দিকা মিলি ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রেজাউল করিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। আসামি ধরার চেষ্টা চলছে। পুলিশ ঘটনা তদন্ত করছে।
রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার আসমা সিদ্দিকা মিলি জানান, ঐ পরিবারের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ ফোর্স দায়িত্ব পালন করছে। স্পর্শকাতর এ বিষয়টি নিয়ে পুলিশের দুটি টিম মাঠে কাজ করছে।
ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ) : ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে যৌতুকের টাকা না পেয়ে গৃহবধূর শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা চেষ্টার অভিযোগে শুক্রবার রাতে থানায় মামলা হয়েছে। মামলার আসামিরা হলেন স্বামী শরিফ মিয়া (২৪), শ্বশুর সাহাব উদ্দিন (৫৫), শাশুড়ি হাছেনা খাতুন (৪৫), দেবর মিজানুর রহমান (১৮) ও হোমিও ডাক্তার ফারুক মিয়া (৪৫)। এদের মধ্যে ৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, উপজেলার মাইজবাগ ইউনিয়নের কুমারুলী গ্রামের আব্দুল হাইয়ের মেয়ে শিরিনা আক্তারের সঙ্গে ৮ মাস পূর্বে কুর্শিপাড়া গ্রামের সাহাব উদ্দিনের পুত্র শরিফ মিয়ার বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি ও দেবর যৌতুকের টাকা এনে দেওয়ার জন্য শিরিনাকে চাপ প্রয়োগ করে আসছিল। দরিদ্র পিতার কাছ থেকে টাকা এনে দিতে অপারগতা জানালে স্বামী শরিফ নানাভাবে শিরিনাকে মারপিট ও মানসিক নির্যাতন করত। সর্বশেষ ১ জুন সকালে শরিফ শিরিনাকে যৌতুক বাবদ ১ লাখ টাকা এনে দেওয়ার জন্য চাপ দেয়। পিতা হতদরিদ্র তাই টাকা আনা সম্ভব নয় বলে জানালে ঐ দিন বেলা সাড়ে বারোটার দিকে স্বামী শরিফ মিয়া ঘরে শিরিনাকে আটকে ব্যাপক মারধর করে। এক পর্যায়ে শিরিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় শরিফ। এতে শিরিনার শরীর ঝলসে যায়। পরে বাড়ির লোকজন শিরিনার বাবাকে খবর না দিয়ে ৫ দিন বাড়িতে রেখে হোমিও চিকিত্সা দেয়। শিরিনার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে দিনমজুর বাবা আব্দুল হাই এলাকাবাসীর সহযোগিতায় মেয়েকে উদ্ধার করে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করেন। কর্তব্যরত ডাক্তার জানিয়েছেন, শিরিনার শরীরের প্রায় ৭০ ভাগ ঝলসে গেছে।
এ ব্যাপারে রায়েরবাজার তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর আব্দুল মোতালিব চৌধুরী বলেন, শিরিনার জবানবন্দি গ্রহণের জন্য ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে উপ-পরিদর্শককে পাঠানো হয়েছে। তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। ময়মনসিংহ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাখের আহম্মেদ সিদ্দিকী জানান, ঘটনার খবর পেয়ে তিনি শিরিনাকে দেখতে মমেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে যান এবং শনিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
