একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রতিকৃতি

আপডেট : ২৩ জুন ২০২২, ১০:০৩

২৩ জুন ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর জন্মদিন। ১৯৩৬ সালের এই দিনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ২৩ জুন তারিখটি আমাদের ইতিহাসে আরো দুটি কারণে খুব গুরুত্বপূর্ণ। ১৭৫৭ সালের এই দিনে পলাশীর যুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। এর ১৯২ বছর পরে ১৯৪৯ সালে ঢাকার রোজ গার্ডেনে প্রতিষ্ঠিত হয় পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগ, যে দলের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে বাঙালি আবার তাদের স্বাধীনতা ফিরে পায়। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ঢাকার মুন্সীগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন।

১৯৫০ সালে তিনি সেন্ট গ্রেগরী স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন ও ১৯৫২ সালে নটর ডেম কলেজ থেকে আইএ পাশ করেন উভয় পরীক্ষায় তিনি মেধা তালিকায় স্থান পান। আইএ পাশ করার পর তার পিতার ইচ্ছা ছিল তাকে অর্থনীতি পড়ানোর। সে সময় ভালো ছাত্রদের অভিভাবকদের প্রধান লক্ষ্য ছিল তার সন্তান সিএসপি পরীক্ষা দিয়ে বড় আমলা হবে। কিন্তু ছোটবেলা থেকে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ইচ্ছা ছিল বাংলা সাহিত্য পড়ার। অবশেষে পিতার শর্ত ছিল সাহিত্য পড়তে হলে ইংরেজি সাহিত্য পড়তে হবে। সে কারণে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৫৬ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে এম এ পাশ করার পর কিছুকাল তিনি মুন্সীগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজ ও জগন্নাথ কলেজে শিক্ষকতা করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ইংল্যান্ডের লিডস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা ও লিস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। পিএইচডি-তে তার অভিসন্দর্ভের বিষয় ছিল The Enemy Territory; Treatment of Evil in Conrad Forster and Laureuce. ১৯৫৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার পদে যোগদান করেন। সেই থেকে এখন পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে জড়িত আছেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী একজন আদর্শ শিক্ষক। শিক্ষক হিসেবে তার সফলতা কিংবদন্তিতুল্য। একজন শিক্ষকের কাজ ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে জ্ঞানের স্পৃহা তৈরি করা, তাদেরকে শুধু তথ্য দ্বারা ভারাক্রান্ত করা নয়। বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক ও ইতিহাসবিদ প্লুটার্ক বলেছিলেন, The mind is not vesselto be filled, but a fire to be ignited. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার জীবনে প্লুটার্কের এই উক্তিকে অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত করতে পেরেছেন। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী শুধু একজন গতানুগতিক শিক্ষক ছিলেন না।

শিক্ষকতা ও গবেষণার পাশাপাশি ছাত্রছাত্রী তথ্য সারা দেশবাসীর মধ্যে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা ও সুষ্ঠু সাংস্কৃতিক বিকাশের কাজে তিনি নিজেকে আজীবন নিয়োজিত রেখেছেন। ভারত বিভাগ তার জীবনে গভীরভাবে রেখাপাত করে। প্রকৃতপক্ষে ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগ বাঙালির জন্য বিশ্ব শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। এ বিষয়ের ওপর দুই বাংলায় অসংখ্য বই লেখা হয়েছে। তবে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর লেখা ‘জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি’ এই বিষয়ের ওপর একটি আকরগ্রন্থ। অসংখ্য পুস্তক তিনি রচনা করেছেন। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও সাময়িকীতে তার মতো এত লেখা অন্য কারো প্রকাশিত হয়নি। পত্রিকা সম্পাদনা করা তার নেশা— এ কথা তিনি তার আত্মজীবনীতে বলেছেন। পরিক্রমা, সাহিত্যপত্র, সচিত্র সময়, সাপ্তাহিক সময়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা, ঢাকা ইউনিভার্সিটি স্টাডিজ ইত্যাদি পত্রিকা তিনি সম্পাদনা করেছেন, বর্তমানে ‘নতুন দিগন্ত’ নামে একটি অত্যন্ত উন্নতমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করছেন।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লেখার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তার সমাজ চেতনা। তার প্রতিটি লেখাই দেশ, মাটি ও মানুষকে নিয়ে। মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসার কারণে তিনি শ্রেণিহীন শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যকে সামনে রেখে তিনি অবিরাম লিখে চলেছেন। মানুষের স্বাধীনতায় তিনি বিশ্বাসী। তার মতে শ্রেণিবিভক্ত সমাজে মানুষ প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ করতে পারে না। রাষ্ট্রযন্ত্রের সাহাঘ্যে মুষ্টিমেয় কিছু লোক সমাজের ব্যাপক অংশের ওপর তাদের কতৃ‌র্ত্ব বজায় রেখে শোষণ করছে— সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার লেখার মাধ্যমে এই দিকটিই বারবার তুলে ধরছেন। তার এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই তিনি সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী। এ বিশ্বাসে তিনি আজীবন অটল। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পতনের পর অনেকেই মনে করেন যে সমাজতন্ত্রের আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই।

কিন্তু প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এক জায়গায় লিখেছেন, ‘বুর্জোয়া গণতন্ত্রের কোনো ভবিষ্যত্ নেই। কেননা বুর্জোয়াদের এমনকি বুর্জোয়া চরিত্রও নেই। তারা নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে জনগণকে শোষণ করবে, কিংবা দলবদ্ধ ডাকাতদের মতে মিলেমিশে ডাকাতি করবে। অতটুকু পারস্পরিক ‘মৈত্রী’ ও তারা স্থাপন করতে অপারগ।’ তবে যে সমাজে কিছুসংখ্যক মানুষ বিত্তের পাহাড় গড়বে আর বেশির ভাগ মানুষের জীবনের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করতে নাভিশ্বাস উঠবে, রৌদ্রবৃষ্টি ঝড়ে কঠোর পরিশ্রম করেও কৃষক তার ফসলের ন্যাঘ্য দাম পাবে না, একজন শ্রমিক সারা দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও তার ছোট্ট মেয়ের একটি লাল জামার বায়না পূরণ করতে পারে না— সে সমাজ একদিন ভেঙে পড়বেই।

প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতো ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্য লাভ করতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি। যে স্বল্পসংখ্যক মহান ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্য লাভ করে আমি নিজে সমৃদ্ধ হয়েছি প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী নিঃসন্দেহে তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য। স্যারের সাতাশিতম জন্মদিনে তার প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও আন্তরিক শুভেচ্ছা, সেই সঙ্গে তার দীর্ঘায়ু কামনা করি।

লেখক: প্রকৌশলী, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, লেখক ও গবেষক

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন