সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

স্বপ্ন ভাঙিয়া যায় বাস্তবতার করাঘাতে

আপডেট : ২৪ জুন ২০২২, ০৪:৪৬

আজি হইতে ৯৫ বত্সর পূর্বে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘দারিদ্র্য’কে মহান করিয়া একটি অপূর্ব কবিতা রচনা করিয়াছিলেন। তিনি নিজে অত্যন্ত দারিদ্র্যপীড়িত পরিবেশে বড় হইয়াছেন। ছোটবেলায় তাহাকে ডাকা হইত দুখু মিয়া নামে। বিরল প্রতিভাধর এই কবি ‘দারিদ্র্য’কে এতটাই মহিমান্বিত করিয়াছেন যে, তিনি স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছেন—দারিদ্র্য তাহাকে যিশু খ্রিষ্টের সম্মান দান করিয়াছে। কেবল তাহাই নহে, দারিদ্র্য তাহাকে দিয়াছে ‘অসংকোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস।’ তাহার পর কী হইল? কী বলিলেন তিনি? সেই কথা বলিবার পূর্বে আমরা একটি রাষ্ট্রের দিকে দৃষ্টিপাত করিতে পারি। নজরুলেরই এই কবিতাটির সারমর্ম ব্যক্তি হইতে প্রতিষ্ঠান, এমনকি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই কখনো কখনো প্রকট সত্য হইয়া দেখা দেয়। উদাহরণ হিসাবে আমরা বলিতে পারি তুরস্কের কথা।

কবি বলিয়াছেন, দারিদ্র্য তাহাকে আপসহীন করিয়াছে, অর্থাৎ যে কোনো কিছু প্রকাশের ক্ষেত্রে রহিয়াছে তাহার দুরন্ত সাহস। আমরা সেই সাহস তুরস্কের রাষ্ট্রপ্রধান এরদোয়ানের ভিতরে দেখিয়াছি। ২০১৮ সালে ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেট ভবনে সাংবাদিক জামাল খাশোগির হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষুব্ধ এরদোয়ান খোলাখুলি আঙুল তুলিয়াছিলেন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের দিকে। তাহার পর খুব দ্রুত মুসলিম বিশ্বের দুই প্রভাবশালী দেশের সম্পর্কে ধস নামিতে শুরু করে। বত্সরখানেকের মধ্যে সম্পর্ক এতটাই তলানিতে ঠেকিয়া যায় যে, সৌদি আরব অনানুষ্ঠানিকভাবে তুরস্কের পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। দুই দেশের সরকারনিয়ন্ত্রিত মিডিয়ায় নিয়মিত দুই সরকারের মধ্যে প্রকাশ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি চলিয়াছে। তুরস্কের শক্ত অবস্হান দেখিয়া অনেকেই মনে করিয়াছে, নীতির সহিত আপস করিতে জানে না তুরস্ক। নীতি-নৈতিকতা ও নিজস্ব আদর্শেই অটল তাহারা; কিন্তু সকল হিসাব পালটাইয়া দিল চলমান অর্থনৈতিক সমস্যা। তুরস্কের মুদ্রা লিরা একরকম মুখ থুবড়াইয়া পড়িয়াছে। মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পাইয়াছে প্রায় ৭০ শতাংশ—যাহা ২০ বত্সরের মধ্যে সর্বোচ্চ। 

এইদিকে ২০২৩ সালের জুনে সাধারণ নির্বাচন। হাতে মাত্র একটি বত্সর। এই সময়ের ভিতরে তুরস্কের অর্থনীতির দুরবস্হা কাটাইতে মরিয়া প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান। সেই যে কবি কাজী নজরুল ইসলাম দারিদ্র্য কবিতায় এক জায়গায় বলিয়াছেন—‘টলটল ধরণীর মতো করুণায়!/ তুমি রবি, তব তাপে শুকাইয়া যায়/ করুণা-নীহার-বিন্দু! ম্লান হয়ে উঠি/ ধরণীর ছায়াঞ্চলে! স্বপ্ন যায় টুটি।’ অর্থনৈতিক দুরবস্হায় এরদোয়ানের স্বপ্নও তেমনি টুটিয়া যায়। তুরস্কের ভোটারদের নিকট পররাষ্ট্রনীতির চাইতে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির গুরুত্ব অনেক বেশি। অধিক আপসহীন হইতে গিয়া তুরস্কের ‘বন্ধু কমিতেছে, শত্রু বাড়িতেছে’ বলিয়া মনে করেন দেশটির নাগরিকেরা। সুতরাং অর্থনৈতিক দুরবস্হা সামলাইতে এরদোয়ানকে স্বপ্ন বিসর্জন দিতে হইল, তাহাকে পা রাখিতে হইল বাস্তবতার জমিনে। এরদোয়ান তাহার চিরাচরিত যুদ্ধংদেহি ভাবমূর্তি আড়ালে নতজানু হইলেন আর্থিক সংকট কাটাইতে। তাহারাই প্রক্রিয়ায় গত এপ্রিলে আমরা দেখিতে পাই এরদোয়ানের সৌদি আরব সফর। এবং জেদ্দায় যুবরাজ সালমানের সহিত তাহার করমর্দনের ছবি প্রকাশ হইবার পর ইঙ্গিত মিলিয়াছে হাওয়া বদলাইবার। অতঃপর গত কয়েক মাসে দুই দেশের সম্পর্কে উষ্ণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়াছে। ব্যবসা, বিমান চলাচলে বিধিনিষেধ উঠিয়া গিয়াছে। সৌদি আরবে তুর্কি টিভি সিরিজের সম্প্রচার শুরু হইয়াছে। দুই দেশের মিডিয়ার পরস্পরের বিরুদ্ধে যে প্রচারণা চালাইতেছিল—তাহাও বন্ধ হইয়াছে।

নজরুল লিখিয়াছেন—‘পারি নাই বাছা মোর, হে প্রিয় আমার,/ দুই বিন্দু দুগ্ধ দিতে!—মোর অধিকার/ আনন্দের নাহি নাহি! দারিদ্র্য অসহ/ পুত্র হয়ে জায়া হয়ে কাঁদে অহরহ।’ সুতরাং নীতি-নৈতিকতা, আপসহীনতা কিংবা যুদ্ধংদেহি মনোভাবের সকল কিছুই ধুলায় লুটাইতে পারে অসংকোচ প্রকাশে সংকোচ আসিতে পারে—যদি অর্থনৈতিক দুরবস্হা দীর্ঘদিনের জন্য কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা দেশের উপর জাঁকিয়া বসে। নজরুল আমাদের সেই অমোঘ বাণীই শুনাইয়াছেন প্রায় শতবর্ষ পূর্বে। 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

ধন্য তাহার জীবন

আছে খরার আঘাতও

‘অসময়ে হায় হায় কেউ কারো নয়’

‘অসময়ে হায় হায় কেউ কারো নয়’

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এই আচরণের ব্যত্যয় ঘটাইতে হইবে

টিকিয়া থাকিতে চাওয়া মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি

পবিত্র আশুরা: অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের চেতনা

প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থাপনা