শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

স্বপ্ন আজ সত্য হইয়া ধরায় নামিল

আপডেট : ২৫ জুন ২০২২, ০২:২৫

আজ বহুল প্রত্যাশিত পদ্মা সেতুর উদ্বোধন। যেই পদ্মা দেশের ল্যান্ডস্কেপকে দুই ভাগ করিয়া রাখিয়াছিল, এই সেতুর সংযোগের মাধ্যমে সার্বিক অর্থে দেশকে একত্রিত করিল। এইরকম, এই স্তরের একটি সেতু নির্মিত হইবে তাহা একসময় কল্পনাও করা যায় নাই; কিন্তু আজ ২৫ জুন ২০২২ ইহা বাস্তবতা। এই সেতুর তাত্পর্য অপরিসীম। ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হইতে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের ক্ষেত্রে এই সেতু বিশেষ অবদান রাখিবে। এই সেতুর সহিত গৃহীত রেল-সংযোগ সম্পূর্ণ হইলে তাহা এতদ অঞ্চলে বিশেষ ভূমিকা রাখিবে। যোগাযোগব্যবস্হায় আনিবে আমূল পরিবর্তন। সেতু চালু হইবার পর ইহা বাংলাদেশের জিডিপিতে ১ হইতে ২ শতাংশের অধিক অবদান রাখিবে বলিয়া অর্থনীতিবিদরা মত দিয়াছেন। এই সেতু শুধু ২১ জেলাকে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সংযুক্তই করিবে না, ইহা গোটা অঞ্চলকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রে পরিণত করিবে। শুধু তাহাই নহে, এই সেতু আঞ্চলিক ইকোনমিক করিডর হিসাবে কাজ করিবে। বাংলাদেশের অবস্হানগত সুবিধার কারণে কর্মচঞ্চল একটি অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হইবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অর্থনৈতিক অগ্রগতির যেই মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করিয়াছেন, সেই ক্ষেত্রে এই সেতু বিশেষ সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করিবে। তিনি ইতিমধ্যে বিনিয়োগে সহযোগিতার জন্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করিয়াছেন। বড় পরিসরে পরিকল্পিত শিল্পায়নে যাইতে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়িয়া তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হইয়াছিল এক যুগ পূর্বে। দেশের অর্থনীতিকে আগাইয়া লইতে ২০১০ সালে গড়িয়া তোলা হইয়াছিল বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কতৃ‌র্পক্ষ। তাহার পর হইতে দেশব্যাপী একের পর এক অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ করা হইতেছে। সম্প্রতি ৬০টির অধিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করিয়াছে। দেশের চলমান অন্যান্য মেগা প্রজেক্টগুলি যে উন্নয়নের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ তাহা উন্নত বিশ্বের অবকাঠামো ও নির্মিত প্রকল্পগুলির দিকে তাকাইলেই পরিষ্কার হইয়া যায়।

একটি দেশ কতটা আগাইয়া গিয়াছে তাহা নির্ভর করে দেশটির অবকাঠামো উন্নয়নের উপর। একটি সেতু বা বন্দর শুধু জনগণের যাতায়াত বা পণ্য পরিবহনেই সহায়তা করে না, ইহা কলকারখানা প্রতিষ্ঠায়, কর্মসংস্হানে, পঁুজি বৃদ্ধিতে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখিতে পারে। অবকাঠামো একটি দেশে যত দ্রুত প্রতিষ্ঠিত হয়, জনমানুষের দোরগোড়ায় চলিয়া যায়, ততই দ্রুত সেই জাতি উন্নয়ন ও সভ্যতার ক্ষেত্রে আগাইয়া যায়। অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলিয়াছেন, আমাদের অর্থনীতিকে উচ্চ পর্যায়ে লইয়া যাওয়ার যেই পথ তাহা সহজ নহে; কিন্তু যদি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত, সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগ লওয়া যায় তাহা হইলে ইহা অর্জন করা সম্ভব। এই সেতু নিঃসন্দেহে এই অঞ্চলকে উজ্জ্বল করিবে। পদ্মা সেতুতে রেল সংযুক্ত হইবার পর ইহা বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার ও চিনের মধ্যে অর্থনৈতিক একটি করিডর হিসাবে বিশেষ ভূমিকা রাখিবে। উত্তর-পূর্ব ভারত, মিয়ানমার ও চিনের সহিত বাণিজ্য আরো নিবিড় হইতে বিশেষ সহায়তা করিবে। বর্তমান বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মচঞ্চল অঞ্চল হইল এশিয়া। চীন, ভারত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো দেশের উপস্হিতি রহিয়াছে এইখানে। সমগ্র এশিয়ার মানচিত্রের দিকে তাকাইলে দেখা যাইবে বাংলাদেশ প্রায় মধ্যবিন্দুতে অবস্হান করিতেছে। তাহা ছাড়া সার্ক, বিমসটেকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলির আঞ্চলিক করিডর তৈরির বিষয়ে যেই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হইয়াছে, তাহাতে পদ্মা সেতু বিশেষ ভূমিকা রাখিবে।

কবি নজরুল বলিয়াছিলেন, ‘যে চাঁদ সাগরে জোয়ার আনে সে হয়তো তাহার শক্তি সম্পর্কে আজো না ওয়াকিব।’ পদ্মা সেতু নির্মাণের মধ্য দিয়া বাংলাদেশের কতটা অর্জন হইল, ইহার সুফল কতটা সুদূরপ্রসারী তাহা হয়তো আজ অনেকে অনুধাবন করিতে পারিবেন না; কিন্তু এই সেতু বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি বিপ্লব ঘটাইয়া দিবে বলিয়াই আমাদের চিন্তা ও কামনা। নানামুখী প্রতিবন্ধকতা পার করিয়া এই সেতু সার্থকভাবে গড়িয়া তোলায় আবারও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তথা সরকারকে অভিনন্দন। 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন