শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

আমরা পারি-আমরাই পারি

আপডেট : ২৫ জুন ২০২২, ০৩:২৭

স্বপ্নের পদ্মা সেতু বাঙালির সক্ষমতার প্রতীক। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাহসী উচ্চারণের মধ্য দিয়ে এই সক্ষমতার যাত্রা শুরু হয় ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ। রেসকোর্স ময়দানের জনস্রোতে তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন—‘দাবায়ে রাখতে পারবা না’। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ছুড়ে দেওয়া সেই চ্যালেঞ্জের বাস্তব রূপ আজকের পদ্মা সেতু। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের মানুষ আজ সবিস্ময়ে দেখছে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন—বঙ্গবন্ধু তনয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্ন জয়ের গল্প। ১৯৯৬ সালে প্রথম বারের মতো প্রজাতন্ত্রের ক্ষমতায় এসে পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের হাতেখড়ির শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাপান সফরকালে তিনি পদ্মা সেতু ও রূপসা সেতুর রূপরেখা তুলে ধরেন। রূপসা সেতু ইতিমধ্যেই বাস্তবায়িত হয়েছে। পর্বতসম বাধা-বিপত্তি মোকাবিলার পর পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন দেখল বিশ্ববাসী। পদ্মা সেতুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর বজ্রবাণী প্রতিধ্বনিত হলো আবারও—‘দাবায়ে রাখতে পারবা না’। বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে বাঙালির লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের এ দৃশ্য অত্যন্ত গর্বের, গৌরবের।

পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের এ পর্যায়ে জাপানের রাষ্ট্রদূতের পক্ষ থেকে ঘোষণা আসছে, আগামীতে পদ্মা সেতুর মতো প্রকল্প বাস্তবায়নে জাপান হবে সহায়ক-সহযাত্রী। একটা কথা স্মরণ করতে চাই—যে সময় পদ্মা সেতু থেকে দাতাগোষ্ঠী মুখ ফিরিয়ে নেয় সে সময় জাইকার প্রতিনিধি বলেছিলেন, ‘লিড প্রতিষ্ঠান হিসেবে পদ্মা সেতু থেকে বিশ্বব্যাংক মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন করা জাইকার পক্ষে সম্ভব নয়, তবে আমরা জানি এবং বিশ্বাস করি এখানে দুর্নীতির কোনো ঘটনা ঘটেনি’। অর্থাত্, সেদিনের জাইকার প্রতিনিধি এবং এখন জাপান রাষ্ট্রদূতের আজকের কথার অদ্ভুত মিল পাওয়া যাচ্ছে—আনীত অভিযোগের গল্প নিছক বানোয়াট। এই সেতুর সফল বাস্তবায়ন সামনের দিনগুলোতে দেশে বৃহত্ অবকাঠামো নির্মাণের সম্ভাবনার বিষয়ে আমাদের আশাবাদী করে তোলে। একটা বিষয় ভুলে গেলে চলবে না, পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বন্ধ হয়ে গেলে যখন দেশীয় অর্থায়নে সেতু নির্মাণের কথা ওঠে তখন দেশিবিদেশি বহু অর্থনীতিবিদ-গবেষক বিপক্ষে মত-যুক্তি দিয়েছিলেন। তবে আজ আমরা দেখছি, তাদের কণ্ঠেও ঝরছে প্রশংসার বাণী। বলতেই হয়, হাজারো প্রতিকূলতাকে মাড়িয়ে পদ্মা সেতুর আজকের বাস্তবতার পুরো কৃতিত্ব এই বাংলার মানুষের, আর একজন ‘সাহসী শেখ হাসিনার’। অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের ভবিষ্যদ্বাণীকে পাশ কাটিয়ে দৃঢ় এবং একক সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে যান রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা। যার ফলাফল আজকের পদ্মা সেতু। এখানেই একজন নেতার পরিচয়, এখানেই বিজ্ঞ নেতৃত্বের মুনশিয়ানা। ভিশনারি লিডারশিপের দৃষ্টান্ত এটাই। দূরদর্শিতা এখানেই।

আধুনিক বিশ্বব্যবস্হায় যোগাযোগ ব্যবস্হা হচ্ছে সবচেয়ে বড় সম্পদ, অর্থের ফ্রেমে এর গুরুত্ব পরিমাপ করা যাবে না। কাজেই পদ্মা সেতুর বাস্তবায়নের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্হার উন্নয়নের ফলে বৃহত্ পরিসর-বলয়ে যুক্ত হবে এই বাংলা। এই সেতুকে ঘিরে বাড়ছে অর্থনীতির হিসাবনিকাশও। চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার মানুষ ব্যাপকভাবে উপকৃত হওয়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাবে, এই অঞ্চলের সঙ্গে সঙ্গে বাড়বে জাতীয় প্রবৃদ্ধি। একটা বিষয় আমরা ভুলে যাচ্ছি—বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন করলে তা ফেরত দিতে হতো। কেননা বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন কোনো দয়া বা অনুদান নয়। বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন না করে পিছিয়ে যাওয়ায় নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত হয়েছে সেতু। এতে বরং আমাদের আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে। বেড়েছে আত্মশক্তি, আত্মবিশ্বাস। বিশ্বব্যাংকের এই পিছিয়ে যাওয়ার ফলে একটা বিষয় সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে, বাংলাদেশ সক্ষম, পারঙ্গম।

পদ্মা সেতু সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার এই মাহেন্দ্রক্ষণে বঙ্গবন্ধুর বলে যাওয়া কথা স্মরণ করতে চাই। ১৯৭২ সালের ১০ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে নৌবাহিনীর এক অনুষ্ঠানে দীর্ঘ ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে। এই দেশের কিছু মানুষ বিদেশের লোককে ভাড়া করে, দাওয়াত করে এই দেশে নিয়ে আসে অপতত্পরতা চালাতে। বিদেশে বসে ষড়যন্ত্র চলে’। বঙ্গবন্ধুর সেই কথার বাস্তব চিত্র দেখেছি আমরা পদ্মা সেতুর বেলায়। পদ্মা সেতুকে ঘিরে বিদেশে ষড়যন্ত্র চলেছে। এদেশের একটা গোষ্ঠী দেশেবিদেশে অপপ্রচার চালিয়ে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করতে চেষ্টা চালিয়েছে। মানতে হবে, একটা সময় পদ্মা সেতুর স্বপ্ন বিবর্ণ হতে শুরু করে, আশা-স্বপ্ন হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। সবাই মুখ ফিরিয়ে নেয় অর্থায়নের ক্ষেত্রে। শুধু একজন ব্যক্তিই সেসময় পদ্মা সেতুর স্বপ্নকে উঁচিয়ে ধরে রাখেন। তিনি এ দেশের জনগণের জনদরদি নেতা শেখ হাসিনা। পদ্মা সেতু তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, চ্যালেঞ্জ, প্রচেষ্টার ফসল। এই সেতু বাস্তবায়নের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন—‘আমরা পারি—আমরাই পারি’। 

এই সক্ষমতা বাংলাদেশকে এনে দিয়েছে মর্যাদার আসন, যা আগামীর বিশ্বে দেশকে, দেশের মানুষকে গৌরবের আসনে প্রতিষ্ঠিত করবে। একটা বিষয় ভালোভাবে মাথায় রাখতে হবে, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালি জাতি ছিল নিরস্ত্র-নিরন্ন। সেই জাতি ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করে ৩০ লাখ তাজা প্রাণের রক্ত ঝরিয়ে ছিনিয়ে এনেছে লাল-সবুজের পতাকা। স্বাধীনতার ৫১ বছরে এসেও আমরা দেখলাম সেই একই চিত্ররূপ। অর্থের প্রশ্নে আমরা একা হয়ে পড়েও দেশিবিদেশি ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে পদ্মা সেতুর মতো স্হাপনা গড়তে সক্ষম হলাম পদ্মার মতো প্রমত্তা নদীর বুকে। এই সাফল্য অর্জন যুদ্ধজয়ের সমান। বঙ্গবন্ধু তার প্রতিটি ভাষণে অনুপ্রাণিত করে গেছেন আপামর বাঙালিকে। সে ভাষণ থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশের জনগণ নিজস্ব অর্থ নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়েছে, বাস্তব রূপ দিয়েছে পদ্মা সেতুকে। এই মনোবল, নিজস্ব শক্তিমত্তার প্রতি এই আস্হা বিশ্বজয়ের চেয়ে কম নয়। বাঙালির স্বপ্ন পূরণের এই ক্ষণে সগর্বে বলতে চাই, ভাগ্যবান বাঙালি জাতি পেয়েছিল একজন মানবিক বঙ্গবন্ধুকে, পেয়েছে একজন মানবিক শেখ হাসিনাকে। মনে রাখতে হবে, পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশের মাটিতে পা রেখেই বঙ্গবন্ধু ছুটে যান সাধারণ মানুষের কাছে। সে সময় তিনি পরিবার-পরিজনের কাছে ছুটে যাননি। পাকিস্তানের কারাগারে অনিশ্চয়তার বন্দিজীবন কাটিয়ে দেশে ফিরেই তিনি ছুটে গেছেন স্বজনের কাছে—জনতার ভুবনে, বাঙালির মিছিলে। এ কারণেই ইতিহাসের পাতায় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে অমর হয়েছেন তিনি। ’২২ সালের বাংলাদেশেও আমরা দেখছি একই দৃশ্য—বাঙালি পেয়েছে এক মহান নেতা, মানবিক প্রধানমন্ত্রী। বিপদে-সংকটে মানুষের দোরগোড়ায় ছুটে যাওয়া এমন দেশনেতা কজন আছে এই বিশ্বে? দুর্যোগের আঁচ পেলেই সংকটাপন্ন জনতাকে বুকে জড়ান মানবিক শেখ হাসিনা। শত ব্যস্ততার মধ্যেও সাম্প্রতিক বন্যাকবলিত এলাকায় তার ছুটে যাওয়ার মতো ঘটনাগুলোকে কোন মূল্যে হিসাব করা যায়?

১৫ই আগস্টকে বাঙালি জাতি ভুলে যায়নি। ২১ শে আগস্টকেও ভুলে যাইনি আমরা। বারবার ষড়যন্ত্র হয়েছে। তবে দিনশেষে মুখ থুবড়ে পড়েছে সব অপচেষ্টা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে দেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করার অপচেষ্টা ধূলিসাত্ হয়েছে। ২১ শে আগস্টের আঁধার কেটেও ফুটেছে আলোর ঝলকানি। আজকের বাংলায় বাঙালির আলোর মিছিলে পতাকা হাতে সম্মুখসারির নেতৃত্বে আছেন একজন আলোর দিশারি। ‘যতক্ষণ শেখ হাসিনার হাতে দেশ, পথ হারাবে না বাংলাদেশ’—বাঙালির এই আত্মবিশ্বাসের প্রতিদান দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এরই বাস্তব রূপ পদ্মা সেতু। এই সেতু বিশ্বকে দেখিয়েছে চমক, বাঙালিকে করেছে আত্মপ্রত্যয়ী। এই অর্জন অনন্য। এই অর্জন অসামান্য। অনন্য অর্জনের এই মিছিলে শামিল হয়ে কবিগুরুর কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে আমিও বলতে চাই—‘কে ডাকে রে পেছন হতে,/ কে করে রে মানা, /ভয়ের কথা কে বলে আজ—/ভয় আছে সব জানা।’

লেখক: সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন