শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

পদ্মা সেতু: শেখ হাসিনার সক্ষমতার স্মারক

আপডেট : ২৬ জুন ২০২২, ১০:৩৬

উদ্বোধন হয়ে গেল পদ্মা সেতু। আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার সফল রাষ্ট্রনায়ক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসীম সাহসিকতা, বিপুল আত্মবিশ্বাস, সততা ও দৃঢ়তায় সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করে এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ‘দুর্মর’ কবিতায় বলেছেন— ‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলাদেশ/ কেঁপে কেঁপে ওঠে পদ্মার উচ্ছ্বাসে,/ ...সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী/ অবাক তাকিয়ে রয়:/ জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার/ তবু মাথা নোয়াবার নয়।’ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য উত্তরসূরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিশ্ববাসীকে আবারও চিনিয়েছেন— বাঙালি মাথা নোয়াবার নয়।

বিপুল সাহস নিয়ে, শত প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে যেভাবে তিনি জনগণের স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছেন, তার শত ভাগ উপলব্ধি হয়তো কখনোই আমরা করতে পারব না। যড়যন্ত্রকারীরা পদ্মা সেতু নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরিবারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে তার মন্ত্রিসভার সদস্য, উপদেষ্টা এবং সচিবকে। কিন্তু সব অসত্ ও অশুভ-উদ্দেশ্যকে নস্যাৎ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলার জনগণকে পাশে নিয়ে বাংলাদেশের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করেছেন, বাংলাদেশকে জয়ী করেছেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চ্যালেঞ্জ আর ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তায় সব চক্রান্তের অবসান হয়। নেতৃত্বের অবিচল দৃঢ়তার কাছে বিশ্বব্যাংকসহ সব দাতাগোষ্ঠীর মোড়লিপনা এবং মিথ্যা অহমিকার পরাজয় ঘটে। পদ্মা সেতুর অর্থায়নে ২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল তারিখে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। আকস্মিকভাবে মিথ্যা অপবাদ, গুজব, অপপ্রচারের ওপর ভিত্তি করে ২০১২ সালের ২৯ জুন পদ্মা সেতু ‘প্রকল্পে দুর্নীতির চেষ্টার কল্পিত অভিযোগ’ এনে বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি বাতিল করে দেয়। তখন বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন।

তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, কোনো দুর্নীতির প্রশ্নই ওঠে না। অতঃপর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ৯ জুলাই ২০১২ তারিখের সভায় নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো। একই সঙ্গে ঋণচুক্তি বাতিল করাসংক্রান্ত তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার জন্য বিশ্বব্যাংককে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করা হবে না মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে সে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি, এমনকি ২০১৭ সালে কানাডার একটি আদালতের রায়ে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ ভিত্তিহীন বলা হয়। বিশ্বব্যাংক এবং দাতাগোষ্ঠীর ঋণসহায়তা ছাড়াই নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু তৈরির কাজ শুরু করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ও জাতির গৌরবের এক ইতিহাস রচনা করেছেন।

পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের পদক্ষেপ হিসাবে ২০০০ সালে প্রাকসম্ভাব্যতা পরিচালনা করা হয় এবং এর ভিত্তিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০১ সালের ৪ জুলাই তারিখে মাওয়া অবস্থানে পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ভিত্তিতে ১০ হাজার ১৬১ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়সংবলিত ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) ২৪ আগস্ট ২০০৭ তারিখের একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। অনুমোদিত ডিপিপি অনুযায়ী সেতুর দৈর্ঘ্য ছিল ৫ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার। সেখানে তিনটি স্প্যান নেভিগেশন ক্লিয়ারেন্সের কথা উল্লেখ ছিল। ডিটেইলড ডিজাইনের পর ডিপিপি সংশোধন করা হবে তাও প্রথম ডিপিপিতে উল্লেখ ছিল। পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত ডিজাইন অনুযায়ী সেতুর দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার (ভায়াডাক্টসহ ৯ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার) এক লেভেলের পরিবর্তে দুই লেভেলের সেতু অর্থাত্ সড়ক এবং রেলের উভয় সুবিধার জন্য দ্বিতল সেতু নির্মাণ, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ৩টি স্প্যানের স্থলে ৩৭টি স্প্যানের নেভিগেশন ক্লিয়ারেন্সের জন্য উচ্চতা বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের প্রভিশন রাখা, অপটিক্যাল লাইন পরিবহনের সুবিধা, সংযোগ সড়কের উচ্চতা বৃদ্ধি, ভূমিকম্পের সহনীয়তা মাথায় রেখে সিসমিক লোডিং বৃদ্ধিকরণ, ভূমি অধিগ্রহণের পরিমাণ বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণে ২০ হাজার ৫০৭ কোটি ২০ কোটি টাকা লক্ষ টাকা ব্যয়ে সংশোধিত ডিপিপি ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি তারিখের একনেক সভায় অনুমোদিত হয় ।

২০১৬ সালে পদ্মা সেতু প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনী আনা হয়। সংশোধনীতে প্রকল্পব্যয় ধরা হয় ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি ৩৯ লক্ষ টাকা, যা ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে অনুমোদন করা হয়। ব্যয়বৃদ্ধির জন্য এখানে উল্লেখ করা হয়েছে নদীশাসনের জন্য অতিরিক্ত ১ দশমিক ৩ কিলোমিটার, অতিরিক্ত ১ হাজার ৫৩০ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণ, ESST (Engineering Support and Safety Team ও Reverine Vessel সংগ্রহ, মাওয়া ও কাওড়াকান্দি ফেরিঘাট স্থান পরিবর্তন এবং দুটি থানা বিল্ডিং নির্মাণ ইত্যাদি। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৩০ জুন অতিরিক্ত ১ হাজার ১৬২ দশমিক ৬৭ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের জন্য ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হওয়ায় ডিপিপিতে খরচ দাঁড়ায় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৯ কোটি লক্ষ টাকা। এই হলো মোটাদাগে পদ্মা সেতু নির্মাণ ব্যয়সংক্রান্ত তথ্য।

সরকার, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এবং সচেতনমহলের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে খরচ বৃদ্ধির যৌক্তিকতা যখন তুলে ধরা হচ্ছে তখন আবার কেউ কেউ বলা শুরু করছে টোল আদায়ের হারটা বেশি হয়ে গেছে। টোলের হার নির্ধারণের যৌক্তিকতার প্রসঙ্গ টেনে ১৮ জুন ২০২২ রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এক জাতীয় সেমিনারে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জামান বলেন যে, তিনি একজন ট্রাকচালকের সঙ্গে কথা বলে দেখেছেন পদ্মা সেতুতে মাঝারি ট্রাকের (পাঁচ থেকে আট টন) জন্য টোল ২ হাজার ৮০০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও (পূর্ববর্তী ১ হাজার ৮০০ টাকা) ফেরিতে তোলা বাবদ ২০০ টাকা, দুই-তিন দিন আটকা পড়লে ট্রাকে থাকা দুই জনের খরচ বাবদ আরো ২ হাজার বা তার বেশি টাকা এবং অন্যান্য খরচ বাবদ তাদের হিসাব মতে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হতো। এছাড়া চার থেকে পাঁচ দিন সময় নষ্ট হতো। ঘাটে দুই-তিন কিলোমিটারের লাইন যে অসহনীয় তা ভুক্তভোগীরাই অনুমান করতে পারবেন। এখন একই ট্রাক চার- পাঁচ দিনে দুই-তিনটা ট্রিপ দিতে পারবে। তাই, যারা সমালোচনা করছেন তা যথার্থ নয়।

পদ্মা সেতু ও সংযোগ সড়ক এশিয়ান হাইওয়ে রুট এএইচ-১-এর অংশ হওয়ায় তা যথাযথ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে এশিয়ান হাইওয়ে এবং এশিয়ান রেলওয়ের যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এই পথে ভারত, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সুবিধা হবে। খুলনা থেকে ঢাকার দূরত্ব প্রায় ২৭০ কিলোমিটার কিন্তু কখনো কখনো সময় লাগে ৮/১০ ঘণ্টা, পদ্মা সেতু দিয়ে সেই ভ্রমণ সময় কমে আসবে মাত্র চার ঘণ্টায়। পদ্মা সেতু ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, কাঁচামাল সরবরাহ ও শিল্পায়ন সহজতর করতে সহায়তা করবে, ফলে গড়ে উঠবে বড় বড় শিল্প ও শিল্পাঞ্চল। চিংড়ি, কাপড় ও পাটজাত পণ্যের ব্যবসার আরো প্রসার ঘটবে।

সেতুর পাশে গড়ে উঠবে বিভিন্ন ধরনের বিনোদন পার্ক ও পর্যটন কেন্দ্র, হোটেল-মোটেল এবং বেসরকারি শিল্প শহর। তাছাড়াও দক্ষিণাঞ্চলের কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত, সুন্দরবন, ষাটগম্বুজ মসজিদ, মাওয়া ও জাজিরায় পুরোনো-নতুন রিসোর্টসহ পর্যটন কেন্দ্র দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করবে। ফলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে। পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় নদীর ভাটিতে সাতটি ৪০০ কেভি বৈদ্যুতিক টাওয়ার নির্মাণের জন্য প্ল্যাটফরম নির্মাণাধীন। এর মাধ্যমে পায়রা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের সুযোগ সৃষ্টি এবং ভোক্তা পর্যায়ে সুষম বণ্টন সুবিধা নিশ্চিত হবে। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুটি নৌ বন্দরের একটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এলাকায় অবস্থিত। মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দর নতুন উদ্যমে চালু থাকবে। পদ্মা সেতুর মাধ্যমে নিকট ভবিষ্যতে রেল যোগাযোগ ঢাকা থেকে যশোর হয়ে দেশের সর্ববৃহত্ স্থলবন্দর বেনাপোল পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ফলে যাত্রীসাধারণ ভ্রমণ এবং পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয়সাশ্রয় করতে পারবেন।

পদ্মা নদীর উভয় পারে মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলায় ভূমি অধিগ্রহণের ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন পরিকল্পনা অনুসারে নদীর দুই পাড়ে সাতটি মডেল টাউন তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলাসমূহের বার্ষিক জিডিপি ২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং দেশের সামগ্রিক জিডিপি ১ দশমিক ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। অর্থনীতিবিদের মতে এই প্রবৃদ্ধির মাত্রা আরো ছাড়িয়ে যাবে।

বাংলার জনগণ চেয়েছিল এই সেতুর নাম তার নামে করার জন্য। কিন্তু তিনি তাতে সায় দেননি। যিনি ইতিহাস রচনা করেন তার নাম প্রস্তরফলকে নয়; তার নাম থাকে মানুষের অন্তরে। ‘শেখ হাসিনা’ বাংলার মানুষের হূদয়ে চিরজাগরুক থাকবেন। পদ্মা সেতু হচ্ছে, আমাদের আত্মমর্যাদা, দৃঢ়তা ও অর্থনৈতিক শক্তিমত্তার প্রতীক। সব অসত্য ও ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে আমাদের পদ্মা সেতু নির্মিত হয়েছে তাও নিজেদের গাঁটের টাকায়; বাইরের কারো দয়ায় নয়। এই গর্ব আমাদের। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সততা, দৃঢ়তা, প্রজ্ঞা ও সাহসিকতার কাছে পরাজিত হয়েছে ষড়যন্ত্রকারীরা।

লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও চেয়ারম্যান, পরিচালনা পর্ষদ, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।

ইত্তেফাক/এসজেড