শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ছেলের কাছে চিঠি ও বাক্‌স্বাধীনতা

আপডেট : ২৬ জুন ২০২২, ১১:২১

আমি যা চিন্তা করি, তা লিখতে পারব না, প্রকাশও করতে পারব না। আমার চিন্তা যদি সরকারের মতমতো করতে হয়, আপস করতে হয়, তাহলে তা তো অসত্য হয়ে যাবে। চিন্তা ও লেখার স্বাধীনতা নিজস্ব অধিকার, সম্পূর্ণ নিজস্ব।

১৯৭৫-এর জুনে ভারতে জরুরি অবস্থা জারি করার পরে সাংবাদিক গৌর কিশোর ঘোষকে লেখার অপরাধে জেলে নেওয়ার পর তিনি ১৩ বছরের ছেলের কাছে যে চিঠি লেখেন, ঐ চিঠিতে এমন কিছু কথা ছিল।

লেখক ও সাংবাদিক গৌর কিশোর ঘোষের জন্মশতবর্ষে এসে স্বাভাবিকই একটা প্রশ্ন আসে, তিনি কেন কোনো সম্পাদক বা কোনো বুদ্ধিজীবীকে এই চিঠি না লিখে তার ১৩ বছরের ছেলেকে লিখলেন? গৌর কিশোর ঘোষের শরীর ঐ সময় ভালো ছিল না। ঐ জেলেই তার তৃতীয় বার হার্ট অ্যাটাক হয়। তাই কি তিনি ভেবেছিলেন, তার ছেলে হয়তো কোনো একদিন নতুন প্রজন্মের কাছে, অর্থাত্ তার ছেলের প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেবে এই কথাগুলো। বাস্তবে যে সমাজে মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকে না বা মত প্রকাশের ওপর বাধা দেওয়া হয়, ঐ সমাজ ঐ মুহূর্তে যত না ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তার থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঐ রাষ্ট্র বা সমাজের নতুন প্রজম্ম। কারণ, সেই প্রজন্ম তখন বেড়ে ওঠে মত প্রকাশের স্বাধীনতাহীন, অর্থাত্ স্বাধীনভাবে চিন্তা করার অধিকারহীন একটি সমাজে বা রাষ্ট্রে। মানুষকে মূলত আজ এই মানুষ বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে নিজেকে দাঁড় করাতে সাহাঘ্য করেছে তার স্বাধীন চিন্তা। মানুষ তার স্বাধীন চিন্তার মাধ্যমেই বেড়ে ওঠে আর পশু বেড়ে ওঠে তার নিত্যদিনের আচরণে বা স্বভাবজাত আচরণের মাধ্যমে। এখানেই মানুষ আর পশুতে পার্থক্য। এই পার্থক্যই মানুষকে আজকের এই অবস্থানে এনেছে।

তাই লেখক ও সাংবাদিক গৌর কিশোর ঘোষের ঐ চিঠি শুধু সেদিনের ভারতে জারি হওয়া জরুরি আইনের মাধ্যমে যে বাক্স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল তারই প্রতিবাদ ছিল না, ছিল নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার জন্য সাহসী হওয়ার প্রেরণার একটি অংশ। ভারতে ১৯৭৫ সালের ২৬ জুন রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দি আলি আহমদের দ্বারা তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী জরুরি আইন জারি করার সঙ্গে সঙ্গেই মত প্রকাশ সংকুচিত হয়ে যায়। এর সপ্তাহ তিনেক বাদে আপত্তিকর সংবাদ প্রকাশ ও প্রেস কাউন্সিল ভেঙে দেওয়া সংক্রান্ত দুটো অর্ডিন্যান্স জারি হয়। এর ফলে ঐ সময় ভারতের রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য, স্পিকার, রাজ্যপালসহ এ ধরনের পদের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সব ধরনের সমালোচনা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে সত্য সমালোচনা তুলে দিয়ে শুধু সন্তুষ্ট করার লেখা লেখার জন্য তখন বাধ্য করা হতে থাকে সাংবাদিক ও লেখকদের। সেই কাজে লোক যে কিছু মেলেনি তা নয়। মিলেছিল, কিন্তু এ কাজের সুদূরপ্রসারী ফল নানাভাবে লেখক ও সাংবাদিকদের ক্ষতি করে। কারণ, সত্যিকার অর্থে কোনো সভ্যতা লেখক ও সাংবাদিকের স্বাধীন চিন্তায় কখনোই হস্তক্ষেপ করে না। এই স্বাধীন চিন্তার ফলে যে শুধু সাংবাদিক ও লেখকের পেশা বেঁচে থাকে তা নয়; রষ্ট্র ও সমাজের সব পেশার উন্নতি ঘটে স্বাধীন চিন্তার ভেতর দিয়ে। ভবিষ্যতে রাষ্ট্র, সমাজ ও তার মানুষ কোথায় যাবে, তা যদি সম্মিলিতভাবে স্বাধীন মনে চিন্তা না করা হয়, তাহলে তো সেই পথ কখনোই বের হয় না।

তাছাড়া এটা সত্য যে, হাজার হাজার বছরের ইতিহাস খুঁড়লে দেখা যায় সমাজে কিছু মানুষ থাকে, তারা স্বাধীনভাবে বর্তমান ও ভবিষ্যত্কে নিয়ে চিন্তা করতে পারে। তাদের মনের ভেতরে বা চরিত্রের ভেতরে এক অদ্ভুত সাহস ও কোমলতার সংমিশ্রণ থাকে। মানুষের প্রয়োজনে তারা যেমন যে কোনো ঝুঁকি নেওয়ার জন্য সাহসী হয়ে ওঠে, আবার তাদের মনগুলোই মানুষের দুর্দশায় সব থেকে বেশি কাঁদে।

তাই দেখা যায়, যখন সমাজে রাজনীতি থেকে শুরু করে যে কোনো পেশা বা যে কোনো ব্যক্তির কাজ মানুষের কল্যাণের জন্য, মঙ্গলের জন্য পা ফেলে, ঐ সময় ঐ লেখক বা সাংবাদিকেরা তাদের পাশে এসে দাঁড়ান। ১৯৭১ সালে যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী তার সাহসী মন ও কোমল হূদয় নিয়ে বাংলাদেশের নরহত্যা বন্ধের বিপরীতে দাঁড়ালেন, শুধু ভারতের লেখক ও সাংবাদিকেরা নন, সারা বিশ্বের লেখক ও সাংবাদিকেরা সেদিন ইন্দিরাকে ধন্য ধন্য করেছিলেন। সেদিন জনপ্রিয়তায় ও মানবিকতার পথে শ্রীমতি গান্ধী প্রতিদিন নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে থাকেন। সেদিন ইন্দিরা গান্ধী কোথায় নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন আবার মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার পর তার অবস্থা কী হয়েছিল, তা মাত্র কয়েকটি লাইনে ‘সাত দশক :আনন্দবাজার ও সমকাল’ বইয়ে শিপ্রা সরকার লিখছেন, ‘বাংলাদেশের অভু্যত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধের সাফল্য ইন্দিরাকে যদি পৌঁছে দিয়ে থাকে গৌরবের শিখরে, তবে ’৭৫-এর জুনে ভারতে অভ্যন্তরীণ জরুরি অবস্থা জারির পর তার জনপ্রিয়তা নেমে যায় তলানিতে। যেন চাঁদে পূর্ণগ্রহণ। হাজার হাজার মানুষ কারাগারে। সংবাদপত্র স্বাধীনতাহীন। জনসাধারণের মৌলিক অধিকার অপহূত।’

ইন্দিরা গান্ধী তার রাজনৈতিক জীবনের মধ্যেই বুঝেছিলেন, বাস্তবে মিডিয়ার কোনো ধরনের স্বাধীনতা, মানুষের স্বাধীন চিন্তা ও কথা বলার অধিকার কেড়ে নিলে মানুষের যেমন ক্ষতি হয়, তার থেকে বেশি না হলেও মোটেই কম ক্ষতি হয় না রাজনীতিবিদের জীবনে। সেখানেও চাঁদের আলো পূর্ণগ্রাসের কালো ছায়ায় ঢেকে যায়। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক মঞ্চে ওঠা মূলত তিন বছর বয়সে তার ঠাকুরদা মতিলাল নেহরুর কোলে বসে। চার বছর বয়সে নিজের খেলনাকে বিদেশি পণ্য হিসেবে নিজেই আগুনে পোড়াতে দেন। এই রাজনৈতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা বলে তার সম্বিত ফিরে পেতে দেরি হলেও তিনি একেবারে অন্ধ হয়ে যাননি চিরকালের জন্য। ১৯ মাস পরেই তিনি সম্বিত ফিরে পান। বাক্স্বাধীনতা ও মানুষের মৌলিক অধিকারের ওপর যে কঠোরতা তিনি জারি করেছিলেন, সেখান থেকে সম্পূর্ণ ফিরে আসেন। এই ১৯ মাসের মূল্য তাকে আড়াই বছরের বেশি ক্ষমতার বাইরে থেকে দিতে হয়েছিল। কিন্তু মাত্র ১৯ মাসে সম্বিত ফিরে পেয়েছিলেন বলেই আড়াই বছর পরে আবার সগৌরবে ফিরতে পেরেছিলেন।

আর এই যে ইন্দিরা গান্ধী রাজনীতিতে ফিরে আসতে পারলেন, এই ফিরে আসতে পারার নিরাপত্তা বা সুযোগ তিনি পেলেন রাষ্ট্র ও সমাজে বাক্স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। ঠিক একইভাবে কোনো রাষ্ট্রের আগামী প্রজন্মের নিরাপত্তা কখনোই শুধু খাদ্য ও বাসস্থানে নিশ্চিত হয় না। বাস্তবে যে কোনো মানুষের প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় তার চিন্তার স্বাধীনতার ভেতরে, তার বিবেকের স্বাধীনতার ভেতরে, তার উন্মুক্ত জ্ঞান আহরণের সুযোগের মধ্যে। আর এ কারণেই লেখক ও সাংবাদিক গৌর কিশোর ঘোষ তার ১৩ বছরের সন্তানের কাছে লেখা চিঠিতে লেখার স্বাধীনতা বা বাক্স্বাধীনতা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে নিরপত্তাও চলে যায়, সে কথাই লিখেছেন। তিনি তার সন্তানের কাছে লেখা চিঠির মাধ্যমে বলতে চেয়েছেন, তাদের, অর্থাৎ আগামী প্রজন্মের প্রকৃত নিরাপত্তা চিন্তার স্বাধীনতার পরিবেশই নিশ্চিত করবে।

চিন্তার স্বাধীনতা না থাকলে যে মানুষের সত্যিকার অর্থে কোনো নিরাপত্তা থাকে না, তার প্রমাণ আরো অনেক ক্ষেত্রে মেলে। কোনো দেশ কমিউনিজমের মতো চিন্তাধারা বা পশ্চাত্পদ চিন্তাধারাকে আঁকড়ে ধরে বা বাড়তে দিয়ে মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা যখন কেড়ে নেয়, কোনো স্বৈরাচারী শাসক যখন চিন্তার স্বাধীনতা কেড়ে নেয়, ঐ সময় ঐ দেশের অনেক বুদ্ধিজীবী শুধু দেশ ছাড়েন। এমনকি নতুন প্রজন্মের ভেতরে যারা জেগে থাকেন, যাদের চোখে দলীয় বা পশ্চাৎপদ গোষ্ঠীর অন্ধত্ব জেঁকে বসতে পারে না, তারাও দেশ ছাড়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে যান। তারা প্রকৃত গণতান্ত্রিক দেশ খোঁজেন। অর্থাৎ, চিন্তার উন্মুক্ত পরিবেশ খোঁজেন। গৌতম বুদ্ধ রাজ সিংহাসন ছেড়ে জ্ঞানবৃক্ষের নিচেই গিয়েছিলেন। সেই উন্মুক্ত জ্ঞানের পরিবেশেই তিনি মানুষের নিশ্চয়তা পেয়েছিলেন, রাজপুরীর অঢেল খাদ্য ও বিশাল গৃহে নয়।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক, সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন