শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

প্রকৃতির প্রতি সুবিবেচনার সময় আসিয়াছে

আপডেট : ২৬ জুন ২০২২, ১১:২৪

পৃথিবীতে দাবানল, খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, জলাবদ্ধতা, নদীভাঙন, বিভিন্ন ভাইরাস ও রোগব্যাধির উৎপাতসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাক লাগিয়াই আছে। এই সকল যে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত তাহা আজ কাহারো অজানা নহে। সম্প্রতি জাতিসংঘের এক খবরে বলা হইয়াছে যে, কোভিডের মতো জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে আমাদের মানাইয়া নিতে হইবে এবং ইহার ক্ষতি মোকাবিলায় গ্রহণ করিতে হইবে সমন্বিত ও টিকসই উদ্যোগ। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়া চলিবার কথা আমরা বহুদিন ধরিয়া বলিয়া আসিতেছি। আমরা ইহাও বলিতেছি যে, জলবায়ু পরিবর্তন পৃথিবীর কোনো নূতন ঘটনা নহে। যুগে যুগে এই ধরনের পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীতে নানা প্রলয়ংকারী প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাক আসিয়াছে। তবে আধুনিককালে জলবায়ু পরিবর্তনের গতিপ্রকৃতি যে হারে বাড়িতেছে তাহা উদ্বেগজনক। কেননা এখন কনজামশন বা ভোগ-বিলাসিতা বাড়িয়া গিয়াছে অধিক মাত্রায়। ইহার ফলে আমরা গাছপালা কাটিয়া বন উজাড় করিয়া ফেলিতেছি। প্রকৃতি ধ্বংস করিয়া গড়িয়া তুলিতেছি বিভিন্ন স্থাপনা। শুধু তাহাই নহে, মহাকাশেও আমরা বিভিন্ন গার্বেজ বা বর্জ্য সৃষ্টি করিতেছি। প্রকৃতির প্রতি আমাদের এই নির্দয় আচরণের কারণে প্রকৃতিও আমাদের উপর বিরূপ আচরণ করিতেছে।

গত বৎসর স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরে অনুষ্ঠিত হয় জলবায়ু সম্মেলন কপ-২৬। এই সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হইয়াছে যে, চলতি শতাব্দীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি কোনোভাবেই ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের অধিক হইতে পারিবে না। তাহা করিতে হইলে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে কার্বন ফুটপ্রিন্টের পরিমাণ ব্যাপক হারে কমাইতে হইবে। কিন্তু এই লক্ষ্যমাত্রার ব্যাপারে অধিক কার্বন নিঃসারণকারী দেশগুলির তেমন সাড়া পাওয়া যায় নাই। ইতিমধ্যে আমেরিকা ২০৫০, চীন ২০৬০ ও ভারত ২০৭০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে কার্বন নিঃসারণমুক্ত দেশে পরিণত হইবার ঘোষণা দিয়াছে। কিন্তু পরিবেশবিদরা এই লক্ষ্যমাত্রার আগেই কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমাইবার দাবি করিতেছেন। এই ক্ষেত্রে আসলে সমস্যা কোথায়? প্রকৃতপক্ষে এই হারে কার্বন নিঃসারণ কমাইতে গেলে উন্নত দেশগুলির শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হইবে। উন্নয়নশীল দেশগুলি কাঙ্ক্ষিত হারে উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করিতে পারিবে না। এই একই কারণে ২০১৫ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে যে জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, সেইখানে কার্বন ফুটপ্রিন্ট, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হইলেও তাহা বাস্তবায়ন করা যায় নাই। এই ক্ষেত্রে দোষারোপের রাজনীতি না করিয়া সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণই কাম্য। বিশেষ করিয়া প্রতি ইউনিট কার্বন নিঃসারণের জন্য প্রতিটি দেশের নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকিলে এই ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জিত হইতে পারে।

বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০ বৎসরের তুলনায় মানুষ ও প্রকৃতিকে চরম আবহাওয়ার মোকাবিলা করিতে হইতেছে। বর্তমানে ভারত ও বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে যে বন্যার প্রকোপ দেখা দিয়াছে তাহা জলবায়ু পরিবর্তনেরই ফসল। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী ২০৫০ সাল নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ১ কোটি ৩৩ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হইবেন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যেভাবে বাড়িতেছে তাহাতে বাংলাদেশ অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশ। আবার বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও জনবহুল অনেক দেশে কৃষি উৎপাদন কতভাবে বাড়ানো যায় তাহার প্রচেষ্টা চলিতেছে এবং রাসায়নিক সারসহ বিভিন্নভাবে উৎপাদন বাড়াইতে গিয়া পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করা হইতেছে। সুতরাং কীভাবে গ্রিনহাউজ গ্যাসের মাত্রা কমানো যায় এবং ইহার সঙ্গে মানানশীল প্রযুক্তি ও জীবনব্যবস্থা গড়িয়া তোলা যায়, সেদিকেই আমাদের অধিক মনোযোগ দিতে হইবে। উপরিউল্লিখিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের স্বাস্হ্যকর ইকোসিস্টেম ও সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য গড়িয়া তুলিবার বিকল্প নাই। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস, মিথেন গ্যাসের নির্গমণ হ্রাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, পেট্রোল ও ডিজেলের ব্যবহার কমানো, বৃক্ষরোপণের হার বৃদ্ধি, বায়ু হইতে গ্রিন হাউজ গ্যাস দূরীকরণ ইত্যাদির ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হইবে। মোদ্দা কথা, আজ প্রকৃতির প্রতি আমাদের সদয় আচরণ ও সুবিবেচনার সময় আসিয়াছে। এই জন্য যে কোনো উন্নয়ন ও দৈনন্দিন জীবনযাপন হইতে হইবে প্রকৃতিবান্ধব।

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন