রায়পুরায় জনবলের সংকট ও দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকায় ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণকেন্দ্রে প্রায়ই ঝুলে থাকে তালা। নির্দিষ্ট সময়ের দুই থেকে তিন ঘণ্টা, এমনকি চার ঘণ্টা পরেও অর্থাৎ দুপুর ১২টা-১টার পরে উপস্থিত হওয়ার অভিযোগ সেবা গ্রহীতাদের। সরকারি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রায়পুরা উপজেলার ২৪ ইউনিয়নের মা ও শিশু চিকিৎসাসেবা গ্রহীতারা।
জানা যায়, ২৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত রায়পুরা উপজেলা। এ উপজেলায় ৭ লক্ষাধিক লোকের বসবাস। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের আওতাধীন এ উপজেলায় ২৪টি ইউনিয়নের মধ্যে ১৯টিতে রয়েছে তাদের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণকেন্দ্র। মা ও শিশুর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রতিটি কেন্দ্রে এক জন উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার, এক জন ভিজিটর, এক জন ফার্মাস্টি, এক জন আয়া ও এক জন অফিস সহায়ক/নিরাপত্তা প্রহরী থাকার কথা। কিন্তু এ উপজেলায় দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। ১৯টি ইউনিয়নের অন্তত ছয়টিতেই দীর্ঘদিন ধরে জনবল না থাকায় কোনো কার্যক্রম নেই। এদের দুই-একটিতে আয়া ও নিরাপত্তা প্রহরী থাকলেও তাদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। ইউনিয়নগুলো হলো : চরমধুয়া, মুছাপুর, চর আড়ালিয়া, চরসুবুদ্ধি, চানপুর ও নিলক্ষা। এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো নিয়মিত ব্যবহার না করায় নষ্ট হচ্ছে স্থাপনাসহ আসবাবপত্র ও প্রয়োজনী জিনিসপত্র। বাকি ১৩টির মধ্যেও অধিকাংশটিতে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার, ভিজিটর, ফার্মাসিস্ট, আয়া ও নিরাপত্তা প্রহরীর পদ শূন্য রয়েছে। এছাড়াও উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা সহকারী কর্মকর্তার তিনটির মধ্যে দুটি, মেডিক্যাল অফিসারের দুটিই পদ শূন্য আছে কয়েক বছর ধরে। সরেজমিনে গত সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায় উপজেলার উত্তর বাখরনগর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, সেবাকেন্দ্রের গেটে তালা ঝুলছে। বাইরে সেবা নেওয়ার জন্য ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত ১০/১২ জন সেবা গ্রহীতা দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার মো. হারুনুর রশিদের জন্য অপেক্ষা করছেন। লিজা আক্তার, আকলিমা খাতুনসহ কয়েক জন বলেন, এখন বাজে ১১টা। আমরা এ সময় আরো কয়েক দিন এসে ডাক্তারের দেখা না পাওয়ায় ফিরে গেছি। আজও তো দেখছি হাসপাতালে তালা ঝুলছে।
গোলাপ মিয়া নামে ষাটোর্ধ্ব এক জন বলেন, ১২টা ১টার সময় এখানে ডাক্তার আসেন। প্রায়ই রোগীরা এসে সেবা না নিয়েই ফিরে যাচ্ছেন। এদিকে, ঘড়ির কাঁটা ঠিক দুপুর ১টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ তালা খুলে হাসপাতালে ঢুকে অগোছাল টেবিল-চেয়ার পরিষ্কার করতে লাগলেন উত্তর বাখরনগর উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার মো. হারুনুর রশিদ। এরই মধ্যে আট থেকে ১০ জন সেবা গ্রহীতা উপস্থিত। সেবা শেষে প্রতিবেদক এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, ঢাকা থেকে প্রশিক্ষণ ভাতা নিয়ে ট্রেনে আসতে কিছুটা দেরি হয়েছে। এ সময় অন্যান্য দিনে দেরিতে অফিসে উপস্থিত হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সত্যতা স্বীকার করে বলেন, রোগী আসতে দেরি হয় বিধায় সকালে নাস্তা করে কিছুটা সময় এদিক সেদিক হাঁটাহাঁটি করায় মাঝেমধ্যে দেরি হয়। উত্তর বাখরনগর ইউপি চেয়ারম্যান মো. হাবিবুল্লাহ হাবিব বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমি তাদের সঙ্গে কথা বলব এবং খোঁজ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষতে অবহিত করব। পার্শ্ববর্তী পলাশতলী ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম ভুইয়া বলেন, আমার এখানেও একই অবস্থা। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের আমি খুঁজে পাইনি কখনো। বিষয়টি স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে মৌখিকভাবে অবগত করেছি।
এ ব্যাপারে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রোমানুর নাহার বলেন, শূন্য পদসমূহ পূরণের জন্য সুপারিশ করা আছে এবং দায়িত্ব অবহেলার বিষয়টি নিয়ে আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলব। উপ-পরিচালক পরিবার পরিকল্পনা নরসিংদীর অরবিন্দ্র দত্ত বলেন, শুধু আমাদের এখানেই নয়, সারা দেশেই জনবল সংকট রয়েছে। জনবল সংকটের কারণে কেন্দ্র ও কোয়ার্টারগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিত থাকেন না তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্হা গ্রহণ করা হবে।
