মঙ্গলবার, ০৯ আগস্ট ২০২২, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সিলেট-সুনামগঞ্জে বন্যা কমলেও দুর্ভোগ কমেনি, দেখা দিয়েছে পানিবাহিত রোগ

আপডেট : ২৮ জুন ২০২২, ০৪:০০

সিলেট ও সুনামগঞ্জের কোনো কোনো এলাকায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও দুর্ভোগ কমেনি। সুরমা ও কুশিয়ারা নদীতে এখনো পানি বিপত্সীমার ওপরে বইছে। যেসব এলাকায় পানি কিছুটা কমেছে, সেখানে ময়লা ও আবর্জনা পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। শহর ও গ্রামে একই অবস্থা। বন্যাকবলিত এলাকায় পানিবাহিত রোগ দেখা দিয়েছে। ডায়রিয়া, আমাশয়, সর্দি-কাশি, জ্বর ও চর্মরোগে ভুগছে মানুষ। গত শুক্রবার এক দিনেই সুনামগঞ্জে ৯২ জন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হলে ৬২ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. আহমদ হোসেন জানিয়েছেন, ১২৩টি মেডিক্যাল টিম বন্যা উপদ্রুত এলাকায় কাজ করছে।

টাংগুয়ার হাওর পাড়ের কৃষক আমিন উদ্দিন বলেন, ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। তবে ক্রমেই বেড়ে চলছে দুর্ভোগ। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ময়লা-আবর্জনায় পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে। বাতাসে দুর্গন্ধ।

এবারের বন্যায় না খেয়ে, বিনা চিকিৎসায় কেউ মারা যায়নি : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

গতকাল সোমবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সিলেট ও সুনামগঞ্জের বন্যা-কবলিত মানুষের স্বাস্থ্যের উন্নতি ও রোগবালাই প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি গতকাল সকালে হেলিকপ্টারে করে দুর্গত এলাকা ঘুরে দেখেন। পরে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের সম্মেলন কক্ষে সিলেট বিভাগের বন্যা পরিস্থিতি, ত্রাণ ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এ সময় তিনি বলেন, এবারের বন্যায় না খেয়ে বা বিনা চিকিৎসায় একজনও মারা যায়নি, এটাই বড় প্রাপ্তি। বন্যা-পরবর্তী অসুখ মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগ প্রস্তুত। বর্তমানে সিলেটে ১৪০টিরও বেশি মেডিক্যাল টিম কাজ করছে। প্রস্তুত রয়েছে আরো ২ হাজারের বেশি কর্মী। বন্যাকবলিত এলাকার কমিউনিটি ক্লিনিক, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও হাসপাতালে সৃষ্ট সমস্যা নিরসনে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

গত ১৮ জুন বন্যায় পানি ঢুকে তলিয়ে যায় হাসপাতালের নিচতলা। বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাহত হয় চিকিৎসাসেবা। পানি ঢুকে নষ্ট হয়েছে হাসপাতালের রেডিওথেরাপি, সিটিস্ক্যান ও এমআরআই যন্ত্র। হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সও নষ্ট হয়ে গেছে।

ওসমানী হাসপাতালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা না থাকা ও চিকিৎসাসেবা বিঘ্নিত হওয়া প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে এমন জলাবদ্ধতা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পরে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন মন্ত্রী। এ সময় সিলেট সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম, বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) হিমাংশু লাল রায়, ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান ভুঁইয়া, মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি মাসুক উদ্দিন আহমদসহ স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সুরমা-কুশিয়ারা দুটি পয়েন্টের পানি এখনো বিপত্সীমার ওপরে

সোমবার সিলেটের সুরমা-কুশিয়ারার দুটি পয়েন্টে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। কানাইঘটে সুরমা বিপত্সীমার ৭০ সে.মিটার, ফেঞ্চুগঞ্জে কুশিয়ারা ১ মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় কুশিয়ারা তীরবর্তী জকিগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, দক্ষিণ সুরমা, সিটি করপোরেশনের কিছু এলাকা এবং সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরসহ বেশ কয়েকটি উপজেলায় এখনো বন্যার পানি থইথই করছে। গতকাল দুপুরেও ফেঞ্চুগঞ্জ বাজারে বন্যার পানি ছিল। নগরীর সুরমা তীরবর্তী কুশিঘাট, মেন্দিঘাট, ঝালপড়া, কুয়ারপাড় ও দক্ষিণ সুরমাসহ নিচু এলাকায় এখনো বন্যার পানি রয়েছে। বাড়িঘর, হাটবাজার থেকে বন্যার পানি খুব ধীরে নামছে। এতে বানভাসিরা খাদ্য, বিশুদ্ধ পানিসহ নানা সংকটে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।

ত্রাণ তৎপরতা : সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। সিলেট বিভাগের প্রায় অর্ধকোটি মানুষ এবারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন দুর্গম অঞ্চলে ত্রাণ পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই অনেক স্থানে বিমান বাহিনী হেলিকপ্টারে ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছে। এছাড়াও সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিজিবি, র‍্যাব, পুলিশ, কোস্ট গার্ডসহ বিভিন্ন সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন, সামাজিক সংগঠন ও ব্যক্তি উদ্যোগে ব্যাপক হারে ত্রাণ তৎপরতা চলছে।

সিলেটের দক্ষিণ সুরমা সংবাদদাতা জানান, উপজেলার অধিকাংশ মানুষ পানিবন্দি। ঘরে ও রাস্তায় এখনো পানি রয়েছে। যেভাবে পানি কমছে, তাতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরো এক সপ্তাহ লাগবে। নতুন করে বৃষ্টিপাত হলে পানি বাড়তে পারে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে এখনো মানুষ রয়েছেন। উপজেলার মোগলাবাজার, দাউদপুর, জালালপুর, সিলাম, লালাবাজার, তেতলী ইউনিয়ন বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ছাতক সংবাদদাতা জানান, সিলেট ও সুনামগঞ্জে প্রাণহানির সংখ্যা অর্ধশত। বেসরকারি বিভিন্ন সূত্রে এই তথ্য পাওয়া যায়। ছাতক-দোয়ারাবাজারের সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক বলেছেন, তার নির্বাচনি এলাকায় অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। দোয়ারাবাজারে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে ওসি জানান।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

সুনামগঞ্জে হত্যামামলায় ১ জনের আমৃত্যু, ৫ জনের যাবজ্জীবন

মেয়েকে ধর্ষণের প্রতিবাদ করায় মাকেও ধর্ষণ, গ্রেফতার ২

সিলেটের গুলশান সেন্টারে গ্রেনেড হামলার দেড় যুগ

ওসমানীনগরে তরুণীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ, গ্রেফতার ৩

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

সুনামগঞ্জে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে রিকশা, নৌকা ও জাল বিতরণ

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে সিলেটে বিক্ষোভ 

প্রধান আসামি গ্রেফতার, ওসমানীতে আন্দোলন স্থগিত

সিলেটে বন্যার্তদের পাশে প্রবাসীরা