শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

দুখু মিয়াদের দুঃখ করিবার কারণ নাই!

আপডেট : ২৮ জুন ২০২২, ০৩:২৪

রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধিদের চাইতে সরকারের নিকট আমলারা অধিক গুরুত্ব লাভ করিতেছেন— এমন অভিযোগ বহুদিন ধরিয়াই করা হইতেছে। এই অভিযোগকে একপ্রকার স্মরণ করাইয়া দিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। তিনি রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘জাতীয় বাজেটে স্থানীয় সরকারের জন্য বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় ভাচু‌র্য়ালি অংশগ্রহণ করিয়া মন্তব্য করিয়াছেন যে, আমলারা স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিদের গলায় রশি বাঁধিয়া ঘুরান। তিনি ইহাও বলিয়াছেন যে, স্থানীয় সরকারের প্রাণভোমরা এখন আমলাদের হাতে। একজন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমলাতন্ত্রের নিম্নস্তরের একজন কর্মকর্তার নিকট কীভাবে হেনস্তা এবং পদে পদে ঘুষ দিতে গিয়া হয়রানি ও দুর্ভোগের শিকার হন, তাহার একটি চিত্র তিনি তুলিয়া ধরিয়াছেন। আমরা ইহার পূর্বে দেখিয়াছি, একজন এমপির তুলনায় ডিসি বা জেলা প্রশাসককে কতটা প্রাধান্য দেওয়া হয়। এমনকি সচিবালয়ে কোনো কোনো মন্ত্রী সচিবের দাপটের কাছে একপ্রকার নতজানু হইয়া থাকেন। আমলাতন্ত্রের স্বাভাবিক রীতিনীতি ও সংজ্ঞা অনুযায়ী এমন পরিস্হিতি তো তৈরি হইবার কথা ছিল না।

একটি দেশে আমলাতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করিবার কোনো উপায় নাই। ইহা হইল শ্রমের বিভাজন, পেশাগত ব্যবস্থাপনা, ক্রমবিভক্ত সমন্বয়, চেইন অব কমান্ড, বৈধ কতৃ‌র্ত্ব ইত্যাদির সমন্বয়ে গঠিত একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান। সরকার আসে, সরকার যায়। তবে আমলাতন্ত্রের মাধ্যমেই তাহার ধারাবাহিকতা অক্ষুণ² থাকে। জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারের (১৮৬৪-১৯২০) মতে, বিশেষজ্ঞতা, নিশ্চয়তা, ধারাবাহিকতা ও ঐক্যই হইল এই বিশেষ প্রতিষ্ঠানের মূল বৈশিষ্ট্য। পুঁজিবাদের উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা হইতেই সরকারি-বেসরকারিভাবে আমলাতন্ত্রের উদ্ভব হইয়াছে। নির্বাহী বিভাগকে সহায়তা করাই তাহার প্রধান কাজ। কেহ কেহ মনে করেন, রাজনীতিবিদরা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করিতে পারেন না বলিয়াই আমলাতন্ত্রের সৃষ্টি হইয়াছে। একজন মন্ত্রী পাশাপাশি একজন এমপি অধিকাংশ ক্ষেত্রে। তাহার একটি সংসদীয় আসন আছে এবং তাহাকে যথারীতি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচনি বৈতরণি পার হইতে হয়। এই জন্য তিনি যাহাতে নিজের আসনে অধিক বরাদ্দ দিতে না পারেন, তাহা দেখিবার জন্য রহিয়াছেন আমলাগণ। উন্নয়নশীল দেশগুলিতে যেই সকল রাজনীতিবিদ ক্ষমতায় আসেন, তাহাদের অনেকের নানা প্রকার সীমাবদ্ধতা থাকে। প্রশাসন চালাইতে আসিয়া তাহারা অনেক সময় খেই হারাইয়া ফালান। অনেক সময় প্রশাসনিক আইন ও নিয়মকানুনের ব্যাপারে তাহারা অভ্যস্ত থাকেন না। এই ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাগণ হইলেন তাহাদের প্রধান সহায়ক শক্তি।

রাষ্ট্র পরিচালনা করে সরকার। নূতন একটি সরকার আসিলে আমলাতন্ত্রের ভিতরে ব্যক্তি পর্যায়ে বিভিন্ন রদবদল ঘটিয়া থাকে। এই সময় আস্থাভাজন ও বিশ্বস্ত আমলাদের প্রতিস্থাপনের কাজ চলে। এইভাবে কোনোক্রমেই সরকারি কর্মকর্তাগণ রাজনৈতিক সরকারের ইচ্ছার বাহিরে যান না, যাইতে পারেন না। আমলাতন্ত্রের সংস্কার বা মডেল পরিবর্তনের প্রয়োজন হইলে তাহা রাজনৈতিক সরকারই করিয়া থাকেন। তাহা হইলে রাজনীতিবিদদের ওপর আমলাদের ‘খবরদারি’ কীভাবে চলে? সাধারণ জ্ঞানে ইহা হইতে পারে না। আমাদের জানামতে, আমলারা এমন কাজ করেন না, যাহাতে প্রধান নির্বাহীর অনুমোদন নাই। তিনি কখন ও কীভাবে তাহা অনুমোদন দিয়াছেন, তাহা জানা না থাকিলে তাহা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অজ্ঞতার পরিচায়ক।

বর্তমান পরিকল্পনামন্ত্রী একজন নিরেট ভদ্রলোক ও সজ্জন ব্যক্তি। তাহার চাইতেও বড় কথা হইল, তিনি নিজেও একজন আমলা ছিলেন। আমলাতন্ত্রের অন্দর-বাহিরের খবর তাহার অজানা নহে। মন্ত্রীকে পার্শ্বে রাখিয়া যখন আমলাগণ বলেন, তাহারা বাজেট বাস্তবায়ন করিবেন, তখন এমন কথা বলিবার সাহস তাহারা কোথা হইতে পান তাহা উপলদ্ধি করিতে হইবে মর্মে মর্মে। এমন ক্ষমতার অনুমোদন নাই— এমন তো হইতে পারে না। অতএব, দুখু মিয়াদের দুঃখ করিবার কোনো কারণ নাই।

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন