শনিবার, ২০ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

আসুন ঘৃণার বদলে ভালোবাসার চাষ করি

আপডেট : ২৮ জুন ২০২২, ১৯:৩২

আমরা ভালোবাসার বদলে ঘৃণার চাষ করছি। আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিভাজন আর পরশ্রীকাতরতা। এই বিভাজন সমাজে অবিশ্বাস আর অস্থিরতা তৈরি করছে। প্রতিনিয়ত আমরা একা হয়ে যাচ্ছি। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে আমাদের তরুণ সমাজ ভুল পথে পরিচালিত হবে। আগামীর বংলাদেশের জন্য আসুন ঘৃণার বদলে ভালোবাসা ছড়িয়ে দিই।

একটা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবার, সম্মানিত হবার সমাজ নির্ধারিত পন্থা আছে, মাপকাঠি আছে। এর জন্যে সময় লাগে, লাগে পরিশ্রম ও মেধা। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই অস্থির সময়ে দেখছি অন্য গল্প।

আমাদের পেয়েছে অন্যকে ছোট করে নিজে বড় হবার নেশায়। খুব বিশ্রী ব্যাপারটা! নিজে যা পারি না সেটা অন্য কেউ করলে মেনে নিতে কষ্ট হয়। অন্যের সফলতাকে ছোট করে নিজের ব্যর্থতাকে প্রশমিত করার অপপ্রয়াস চোখে পড়ছে খুব। কিন্তু, মহান স্রষ্টা যাকে সম্মানিত করেন সেখানে আপনার/আমার নির্বোধ কথায় কী আসে যায়।

একটা উদাহরণ দেই। পদ্মা সেতু নিঃসন্দেহে আমাদের জাতীয় জীবনে এক অনন্য মাইলফলক।আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অদম্য সাহসিকতা, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং অসীম আত্মপ্রত্যয়ের ফসল এই সেতু। সব দিক বিবেচনায় এটি ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ সরকারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাফল্য। শুধু রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগের জন্যেই নয়, পুরো জাতির জন্যেই অসম্ভব গর্ব ও ভালোবাসার একটি অবিনাশী অধ্যায় এই পদ্মা সেতু। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পর্যালোচনায় দেখা যায় কোন কোন ব্যক্তি কিংবা জনগোষ্ঠী হীন মানসিকতার পরিচয় দিয়ে এখানেও যদি/কিন্তু খুঁজছেন। এই অভূতপূর্ব সাফল্যকে হাস্যকর কর্মকাণ্ড করে খাটো করে দেখার অপচেষ্টা করছেন।

আমরা সাধারণত অন্যের প্রশংসা করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না। তবে মানসিক দৈন্যতার কারণে অন্যের আন্তরিক প্রচেষ্টাকে সম্মান দিতে না পারলেও চুপ থাকাই শ্রেয়।

আরেকটি উদাহরণ প্রাসঙ্গিক মনে করছি। সাম্প্রতিক অনেক লেখাতেই দেখি বিসিএস প্রসঙ্গ টেনে মহাজ্ঞানী বোদ্ধারা বলার চেষ্টা করেন, রাজধানী কিংবা মুদ্রার নাম মুখস্থ করে বিসিএস ক্যাডার হচ্ছে সবাই। ব্যাপারটা আসলেই কি তাই? যারা আদতে হয়েছে কিংবা নিদেনপক্ষে এই পরীক্ষায় এজেন্ট করেছে তাঁরা ঠিকই জানেন এর সিলেবাস কিংবা পরীক্ষা পদ্ধতি সম্পর্কে। এটা একটা মৌলিক পরীক্ষা যা সকলের জন্যেই সমান এবং তুলনামূলক স্বচ্ছ, বিতর্কমুক্ত গ্রহণযোগ্য নিয়োগ প্রক্রিয়া। 

কোন পদ্ধতি কিংবা প্রক্রিয়াই শ্রেষ্ঠ নয়। সময় এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তন হতেই পারে। কিন্তু তাই বলে, ব্যক্তিগত অপারগতার কারণে এই পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে মনগড়া কথা বলা কিংবা অহেতুক সমালোচনা করা সমীচীন নয়। কারণ,যারা পারে তারা সবখানেই পারে, সবকিছুতেই পারে। যে গড়তে জানে শিবও গড়তে জানে বাঁদরও গড়তে জানে।

এটা সত্য যে, বিসিএস নিয়ে সমাজে বাড়াবাড়ি রকমের মাতামাতি, আধিখ্যেতা আছে। এটা ঠিক নয় এবং সমর্থনও করি না। শিক্ষকতা, গবেষণা, প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, কর্পোরেট  কিংবা কারিগরী সেক্টর সব পেশাই গুরুত্বপূর্ণ এবং সম মর্যাদার। তাই মেধাবীদের সব সেক্টরেই প্রয়োজন আছে। 

সমস্যা হলো, আমাদের সব বিষয়ে বাড়াবাড়ি রয়েছে। হুজুগের ঠেলায় মাথায় তুলতেও দেরি করি না আবার পায়ের তলায় ফেলতেও দ্বিধা করি না। আমরা গঠনমূলক সমালোচনা জানি না, আমরা বুঝি অযৌক্তিক বিরোধিতা। আমরা প্রশংসা করতে গিয়ে করে ফেলি চাটুকারিতা। আমরা আত্মমর্যাদাবান না হয়ে আত্মঅহংকারী হয়ে উঠি।

আমি মনে করি, যে প্রশংসার যোগ্য তাঁকে প্রশংসা করতে কার্পণ্য করা উচিৎ নয়। আমরা নিজেরা আত্মমর্যাদাবান হলেই অন্যকে সম্মান দেয়ার সুন্দর সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হতে পারি। আত্মমর্যাদা আর আত্মঅহং এক বিষয় নয়। আমি ন্যায্য বিষয়ে আপনার সাথে দ্বিমত পোষণ  করতে পারি। মানুষ হিসেবে আপনার উন্নত ও নায্য অবস্থান আপনার আত্মমর্যাদার পরিচায়ক আর 'কেবল আপনিই সবার চেয়ে সেরা' এমনটা ভাবাটা আত্ম অহংকার যা নিন্দনীয়।

বস্তুত, সমাজে শ্রেণি চেতনা আর পরশ্রীকাতরতা প্রবল হবার দরুন ব্যক্তিগত কিংবা পেশাগত জীবনে নৈরাশ্যবাদীরা সবকিছুতেই হায় হায় রব তোলে। তাদের কাছে কোন ব্যক্তি, কর্ম কিংবা পেশার মানুষই সম্মানের নয়। তাঁরা কাউকেই ভালো বলতে অভ্যস্ত নন। একটা এন্টি এস্টাবলিশমেন্ট মানসিকতা নিয়ে সবকিছুরই নেতিবাচক ব্যাখ্যা করতে চায়। প্রথাবিরোধীতার নামে জনপ্রিয়তার সস্তা রাস্তায় নামতে চায়, ভাইরাল হতে চায়। সব কিছুতেই ভুল খুঁজতে খুঁজতে ভুল না পেলে শেষ অবধি "বেশি ভালো কিন্তু ভালো নয় " বলে সান্ত্বনা খুঁজে। এই প্রজাতির লোকজন নেতিবাচক মানসিকতার কারণে অন্যের প্রশংসার চেয়ে নিন্দা করে সুখ পায়। যে ব্যক্তি উপকার করতে পারে তাঁর চেয়ে বেশি সম্মান করে এমন ব্যক্তিকে ,যার ক্ষতি করার ক্ষমতা আছে।

মানুষ হিসেবে অন্যকে সম্মান দিলে কারো কিছু কমে যায় না। আমাদের বুঝতে হবে, ভুল করে কেউ এভারেস্ট জয় করে ফেলে না। মন চাইলেই রিসার্চার (গবেষক) হয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। হুট্ করে কেউ হায়ার স্টাডি এর স্কলারশিপ পেয়ে যায় না। দুই-তিন সপ্তাহ পড়ে কেউ ক্লাসে ফার্স্ট হয়ে যাবে না। কয়েক মাস পড়েই কেউ ডাক্তার/ইঞ্জিনিয়ার হয়ে যায় না। আন্দাজে দাগায়ে বা মুদ্রা/রাজধানীর নাম মুখস্থ করেই কেউ বিসিএস পাশ করে ফেলে না। আর রাতারাতি কেউ রাজনৈতিক নেতৃত্ব পেয়ে যান না। কারণ প্রেস্টিজিয়াস কোন কিছুই সহজ না এবং সহজ কোন কিছুই প্রেস্টিজিয়াস না।

আপনি পারেননি বলে আরেকজনকে টেনে আপনার কাতারে আনার চেষ্টা করেন কেন? অন্যের কাঙ্ক্ষিত অর্জন কিংবা উত্তম কর্মকে ছোট করে বড় হবার সুযোগ নেই। এটা দৈন্যতার পরিচায়ক। অন্য কারো ভুল চিহ্নিত করে বড় হবার চেষ্টা না করে নিজেকে উন্নত করার চেষ্টাই উত্তম পন্থা।

প্রচেষ্টা আর নিবেদন থাকলে সময় এবং যোগ্যতা অনুযায়ী আপনারও হবে। আর না হলেই কী? জগতে পেশা, অবস্থান  আর তথাকথিত সাফল্যই কী সব? আর প্রকৃত সাফল্য কীসে নিহিত এটাও তো চন্দ্র সূর্যের মতো পরিষ্কার নয়।

আসুন সংকীর্ণতা পরিহার করে উদারতা ও ভালোবাসার ফেরি করি। নিজ যোগ্যতায় আস্থা রাখি, পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্মান বজায় রাখি।

লেখক: অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এ সার্কেল), নারায়ণগঞ্জ।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি