শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

আত্মতৃপ্তি লাভ মানে যবনিকা পতন

আপডেট : ২৯ জুন ২০২২, ০৯:৪৯

আত্মতৃপ্তির প্রয়োজন রহিয়াছে বটে। আত্মতৃপ্তির মাধ্যমে আমাদের শরীরে অক্সিটোসিন হরমোনের নিঃসারণ ঘটে। ফলে আমরা সুখানুভূতি লাভ করি; কিন্তু আমরা যাহা লইয়া আত্মসুখ অনুভব করি, তাহার নেপথ্যে শক্ত ভিত্তি রহিয়াছে কি না—তাহা দেখিতে হইবে। গর্ব-অহংকার ও আত্মসন্তুষ্টির কিছু নেতিবাচক দিকও রহিয়াছে। যাহার লক্ষ্য যত ছোট, তাহারই সন্তুষ্টি অধিক। এই জন্য মনোবিশ্লেষকরা বলিয়া থাকেন—অসন্তুষ্টির মধ্যেই রহিয়াছে উত্তুঙ্গ সাফল্যের বীজ। তৃপ্তিলাভ মানে যবনিকা পতন। দ্য এন্ড। সুতরাং ক্রমবর্ধমান উন্নতির সোপানে অতৃপ্তিই হইল চালিকাশক্তি। অন্যদিকে অহংকার করা তো আমাদের ধর্মে সরাসরি নিষেধ রহিয়াছে।

উন্নয়নশীল বিশ্বের কথাই ধরা যাক। বিশ্বের কোথাও কোথাও যতটুকু উন্নয়নচিত্র দেখিতে পাওয়া যায়, অনেকেই ইহাকে আত্মতৃপ্তির সহিত ইতিবাচকভাবে দেখিতে চাহেন; কিন্তু সার্বিক বিবেচনা উপেক্ষিত থাকিয়া যায়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, উপজেলা-ইউনিয়ন পর্যায়েও সুন্দর দালানের হাসপাতাল তৈরি হইয়াছে; কিন্তু সেইখানে যদি সঠিকভাবে চিকিত্সা না মিলে, সেবা না মিলে তাহা হইলে আত্মসন্তুষ্টির সুযোগ থাকে কি? তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে সাধারণত আত্মতৃপ্তির প্রবণতা অধিক লক্ষ করা যায়; কিন্তু তাহাদের মনে রাখা দরকার, জনগণের মৌলিক চাহিদার চিত্র সম্পর্কে জ্ঞাত থাকা জরুরি। দেখা যায়, উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলি সাধারণত তাহাদের স্বাধীনতার পর হইতে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থা হইতে উন্নয়নের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ বা গ্র্যান্ট পাইয়াছে; কিন্তু সেই ঋণ বা দানের ক্ষেত্রে কখনই যথাযথভাবে প্রাধান্য দেওয়া হয় নাই কোন জিনিসটা সকলের পূর্বে প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রেই মৌলিক প্রয়োজনের দিকে নজর না দিয়া এমন সকল খাতে বরাদ্দ দেওয়া হইয়াছে, যাহা সাধারণ জনগণের জীবনমানের মৌলিক সমস্যা দূর করিতে পারে নাই। যদি কোনো এলাকার পানির লবণাক্ততা বাড়িয়া যায় এবং নিরাপদ খাওয়ার পানির অভাব দেখা দেয়, তাহা হইলে সেই সকল এলাকায় উন্নয়নের প্রধান মৌলিক দিকগুলির একটি হইবে নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা। কারণ, নিরাপদ পানি ব্যতীত মানুষ সুস্থভাবে বাঁচিতে পারে না।

আমরা দেখিয়াছি, কয়েক দশক পরপর বিশ্বে অপ্রত্যাশিতভাবে অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রবল ঝড় আসে। সেই ঝড়ে বৃহত্ রাষ্ট্রগুলি ভিতরে ভিতরে কাঁপিতে থাকে; কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক সাধারণ রাষ্ট্রই উহাকে আমলে নেয় না। তাহারা এক ধরনের আত্মতৃপ্তিতে ভুগিতে থাকে। তাহারা কি জানে না, ভয়ের কারণকে ভয় না পাওয়াটাই অত্যন্ত ভয়ের? প্রকৃত অর্থে, মানুষের চাহিদা ক্রমবর্ধমান। এই জন্য সমস্যার গ্রাফও কখনো নিম্নগামী হয় না।

জগতে চিরকালই সমস্যা ছিল, আছে, ভবিষ্যতেও নূতন নূতন সমস্যা আসিবে; কিন্তু সেই সমস্যাটিকে যদি সঠিক ও সর্বোচ্চ সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় সমাধান করা অসম্পূর্ণ রাখিয়া আত্মতৃপ্তিতে মন পরিপূর্ণ থাকে, তাহা হইলে তো ঘোরতর বিপদ ঘনাইবে! মনে রাখিতে হইবে, মহানবি রসুলুল্লাহ (সা.) মক্কা বিজয়ের পর তাহার কাজে কৌশলগত পরিবর্তন আনিয়াছিলেন, যেইখানে ছিল শান্তি ও ঐক্যের রাজনীতি। আমাদেরও সেই পথ অনুসরণ করিতে হইবে। শান্তি ও ঐক্যের রাজনীতির চর্চা করিতে হইবে। ইমান ও ধৈর্যের সহিত আমাদের প্রত্যেকের স্ব স্ব দায়িত্ব পালন করিতে হইবে। উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলির স্বাধীনতার পূর্বের আক্রমণাত্মক হিংসামূলক যেই রাজনীতি ছিল তাহা স্বাধীন দেশে কোনো অবস্থাতেই কাম্য হইতে পারে না। এই ক্ষেত্রে সুশিক্ষা, অহিংসা, ঐক্যই পারে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাইয়া দিতে। উন্নত ও কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠন করিবার জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করিতে হয়। ইহার জন্যও নিজেদের মানসিকভাবে প্রস্ত্তত করিতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে, দুর্বল ভিত্তির কিংবা ভিত্তিহীন আত্মসন্তুষ্টি সাময়িকভাবে আনন্দ দিতে পারে; কিন্তু উহা বিদ্যমান বিপুল সমস্যার সমাধান আনিবে না।

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন