মঙ্গলবার, ০৯ আগস্ট ২০২২, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

তালার পাঁচ জয়িতার গল্প

পাঁচ ক্যাটাগরিতে তাদের সম্মাননা দিয়েছে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর

আপডেট : ২৯ জুন ২০২২, ১০:০১

সমাজ ও পরিবারের নানা বাঁধা কাটিয়ে জীবন সংগ্রামে সাফল্য অর্জন করেছেন সাতক্ষীরার তালা উপজেলার ৫ নারী। নানা বাঁধা বিপত্তিকে পায়ে মাড়িয়ে তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই নারীদের খুঁজে বের করে ‘জয়ীতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ শীর্ষক কর্মসূচীর আওতায় ৫টি ক্যাটাগরিতে সম্মাননা দিয়েছে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর। এ সকল নারীদের প্রত্যেকের জীবনে রয়েছে অসীম আত্মশক্তি ও সংগ্রামের আলাদা আলাদা জীবন কাহিনী।

শিক্ষা-চাকুরীক্ষেত্রে সফল মুর্শিদা: শিক্ষা ও চাকুরীক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী মুর্শিদা খাতুন। তিনি তালা উপজেলার জুজখোলা গ্রামের শিক্ষক মো. সাইফুল্লাহ’র স্ত্রী। উচ্চ মাধ্যমিক পাড়াকালীন সময় তার বিয়ে হয়। শ্বশুরবাড়িতে এসে নানা প্রতকুলতার মাঝেও তিনি পড়াশুনা অব্যাহত রেখেছিলেন। উক্ত পড়াশুনার ক্ষেত্রে স্বামী তাকে ব্যাপক উত্সাহ যুগিয়েছিলেন। পর্যায়ক্রমে তিনি বিএ, এমএ এবং বিএড ডিগ্রী অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি জেসিএস মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সমাজের পিছিয়েপড়া জনগোষ্ঠী বিশেষ করে নারী সমাজকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে কাজ করে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

সফল জননী রোকেয়া বেগম: সফল জননী হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত রোকেয়া বেগম। তিনি তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের পাঁচরোখী গ্রামের মো. আ. মজিদ শেখের স্ত্রী। ছোট বেলায় পড়ালেখায় বেশ ভালই ছিলেন তিনি। ২ ভাইয়ের একমাত্র বোন হিসেবে বেশ আদরের ছিলেন তিনি। হঠাৎ করে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় বিয়ে হয়ে যায় তার। বিয়ের সময় তার স্বামী ৮ম শ্রেণিতে পড়তেন। পরবর্তীতে তিনি এসএসসি পাশ করেন। তাদের ছিলে যৌথ সংসার। প্রতিদিন পরিবারের ২৫ সদস্যর রান্নাবান্না করার পাশাপাশি ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে ধান ভেনে চাল বানাতে হতো তাকে। শ্বশুরের অবস্থা কিছুটা ভাল থাকায় সংসারের পাশাপাশি বিভিন্ন কৃষি পেশায়ও তাকে পরিবারকে সহযোগিতা করা লাগতো। ১৯৬৮-৬৯ সালের দিকে তাদের বড় ছেলের জন্ম হয়। বড় ছেলে মশিয়ার রহমানের বয়স ১২/১৩ বছর হলে যৌথ সংসারে লোকজন বাড়তে থাকায় তাদেরকে পৃথক কর দেয়া হয়। ধীরে ধীরে ৫ ছেলে ও ২ মেয়ের জন্ম হয় তাদের ঘরে। অনেক কষ্ট করে তাদেরকে লেখাপড়া শিখিয়েছিলেন তিনি। ছেলে-মেয়েরা সকলেই শিক্ষিত এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত। তবে ২০১৮ সালে মেজ ছেলে মো. আতিয়ার রহমনের আকস্মিক মৃত্যুতে তিনি বেশ ভেঙ্গে পড়েন।

নির্যাতিতা থেকে উদ্যোমী, স্বাবলম্বী ফারহানা: নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নব উদ্যমে জীবন শুরু করা নারী ফারহানা ইয়াসমিন। তিনি তালা উপজেলার ইসলামকাটী ইউনিয়নের চাঁদপুর গ্রামের আব্দুল আজিজ শেখ ও আকলিমা বেগমের কন্যা। ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বর মাসে স্বামীর পছন্দে এবং শ্বশুর-শাশুড়ির অমতে মাগুরা ইউনিয়নের চাঁদকাটি গ্রামের তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে শ্বশুর-শাশুড়ির নির্যাতনের শিকার হন তিনি। বিয়ের ২ বছর তাদের সংসারে একটা পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। ধীরে ধীরে স্বামী তার সাথে দুর্ব্যবহার শুরু করে। মাঝে মাঝে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলে বাবার বাড়িতে থাকতেন তিনি। এরমধ্যে আরও একটি কন্যা সন্তান জন্ম হয় তাদের ঘরে। তখন স্বামীর অত্যাচার আরও বেড়ে যায়।

একদিন স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়ি মিলে ছেলেকে কেড়ে নিয়ে তার কাছে মেয়েটাকে দিয়ে তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। নতুন করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে দৃঢ়ভাবে জীবন শুরু করেন। নতুন করে স্কুলে ভর্তির পাশাপাশি দর্জি বিজ্ঞানে ভর্তি হন তিনি। এক পর্যায়ে এসএসসি পাস করে তিনি বে-সরকারী সংস্থা উত্তরণের স্বাস্থ্য কর্মী হিসেবে নিয়োগ পেয়ে চাকুরী করতে থাকেন। অবসরে সেলাই মেশিনের কাজ করে মামলার ব্যয়ভারের পাশাপাশি পড়াশুনা চালিয়ে যেত। এক পর্যায়ে এইচএসসি পাস করেন। তিনি ২০১৬ সালে ইসলামকাটী ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা আসনে নির্বাচন করে পরাজিত হন। কিন্তু ২০২১ সালে তিনি নির্বাচন করেন এবং বিপুল ভোটে জয়ী হন।

অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী রেশমা বেগম: জীবন সংগ্রামে দারিদ্রকে পিছনে ফেলে সাফল্য অর্জন করেছেন রেশমা বেগম। তিনি তালা সদরের মো. নজির আলী শেখের স্ত্রী। ১৯৮২ সালের ২৫ মে জালালপুর ইউনিয়নের জেঠুয়া গ্রামের একটি নিম্নবিত্ত পরিবারে তার জন্ম। নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনার পর ১৯৯৯ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়। ২০০৬ সালে শুরু করেন বিউটি পার্লারের ব্যবসা। কারও সাহায্য ছাড়াই এগিয়ে যেতে থাকেন। সেই থেকে তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বর্তমানে পার্লার ব্যবসার পাশাপাশি তিনি নারীদের এন্টিক গহনাসহ সব ধরণের পোশাক অনলাইন ও অফলাইনে বিক্রি করছেন। বর্তমানে তার তালা জেলা পরিষদ সুপার মার্কেটে রয়েছে “স্টার লেডিস” নামের মানসম্মত একটি কাপড়ের শোরুম। সেখানে ৪ জন কর্মচারী নিয়োজিত রয়েছে। নির্মাণ করছেন ৪তলা ফাউন্ডেশনের দ্বিতল ভবন। বর্তমানে স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখে শান্তিতে জীবন যাপন করছেন অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী রেশমা বেগম।

সমাজ উন্নয়নে আশরাফুন নাহার: একজন নারী হয়েও জীবন সংগ্রামের মাঝে সমাজের উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন আশরাফুন নাহার। তিনি উপজেলার জাতপুর গ্রামের মৃত. শামসুর রহমান ও আমেনা খাতুনের কন্যা। সমাজ উন্নয়নের জন্য সংসার করার সুযোগ হয়নি তার। নারীদের নিয়ে গ্রামে গ্রামে সমিতি তৈরি করার পাশাপাশি নকশীকাঁথা তৈরির কাজ শুরু করেন তিনি। এগুলো বিভিন্ন দেশে রপ্তানিও শুরু করেন। মেডরী নামের এক জাপানী মহিলা এসব কাজে তাকে সহযোগিতাও করেন। এভাবে ধীরে ধীরে এলাকায় নারীবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠে এটি। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমও বিভিন্ন জেলায় বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে নারী বান্ধব এ প্রতিষ্ঠানটির অনেক বেশি সক্ষমতা বেড়েছে। নারীরাও সফলভাবে তার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন।

ইত্তেফাক/এমআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

তালায় প্রতিপক্ষের হামলায় এক ব্যক্তি নিহত

সাতক্ষীরার প্রাণসায়ের খাল কচুরিপানায় ভরা ভারী বর্ষণে জলাবদ্ধতার আশঙ্কা

৭০০ কেজি ভেজাল দুধের জেলি উদ্ধার

মানবতাবিরোধী অপরাধে হামিদ গ্রেফতার

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

কাঁচামালের সংকটে তালায় হারিয়ে যাচ্ছে মাদুরশিল্প

তামান্না হত্যা মামলায় ৪ আসামির জামিন নামঞ্জুর

তালায় পাটের দাম নিয়ে শঙ্কায় কৃষক 

শ্যামনগরে বেড়িবাঁধ ভেঙে ৯ গ্রাম প্লাবিত, পানিবন্দি ২৫ হাজার মানুষ