বুধবার, ১৭ আগস্ট ২০২২, ১ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বিশৃঙ্খলার যুগে মুক্তবাণিজ্যের ঝুঁকি

আপডেট : ৩০ জুন ২০২২, ১০:৪৪

যুদ্ধোত্তর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার তৃতীয় যুগে বাস করছি আমরা। চল্লিশের দশকের শেষের দিক হতে সত্তরের দশক পর্যন্ত ছিল প্রথম যুগ, যা ‘উদারনৈতিক যুগ’ হিসেবে পরিচিত। এ যুগের প্রধান বিষয় হলো, শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ধনী দেশগুলোর ঘনিষ্ঠ মিত্রতা। আশির দশকের শুরুতে এবং বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ‘নব্য উদারনীতি’ নামে পরিচিত অর্থনৈতিক উদারনীতি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। ১৯৯৫ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সৃষ্টি এবং ২০০১ সালে চীনের যোগদান— দ্বিতীয় যুগে মোটাদাগে উল্লেখ করার মতো বিষয়।

আমরা এখন বৈশ্বিক বিশৃঙ্খলার এক নতুন যুগে প্রবেশ করছি। যেখানে অভ্যন্তরীণ ভুল বোঝাবুঝি এবং বৈশ্বিক সংঘাত-সংঘর্ষের বিষয়গুলোই মুখ্য। অভ্যন্তরীণভাবে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করার ব্যর্থতা এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা ও সুযোগ প্রদানে ব্যর্থতা ফুটে উঠছে। এগুলো জাতীয়তাবাদের অলংকারমূলক বিষয়াবলি এবং জেনোফোবিয়ার পরিবর্তে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ প্রতিযোগীদের বিশেষত চীনের ওপর ক্রোধকে কেন্দ্রীভূত করেছে। চীনের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিযোগিতার বিষয়টিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমবর্ধমান দ্বিপক্ষীয়-পক্ষপাতমূলক হয়ে উঠেছে, যেখানে চীন নিজেই অধিকতর নিপীড়ক এবং অন্তর্মুখী ভূমিকায় রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের সঙ্গে সঙ্গে এ জাতীয় বিভাজন আরো গভীর হয়েছে।

এমন একটি বিশ্বে কীভাবে একটি ‘উদারনৈতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা’ চলমান রাখা যেতে পারে? এর উত্তর হবে—‘এটা বেশ কষ্টসাধ্য’। যদিও প্রায় সবাই বিপদ ও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, তা সত্ত্বেও প্রত্যেককে এ বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। সৌভাগ্যবশত, কম শক্তিশালী হলেও অনেক দেশই বুঝতে পারে যে, বিপদটা কী ও তা কতটা গুরুতর। এক্ষেত্রে যুদ্ধরত পরাশক্তিদের দিকে তাকিয়ে না থেকে যত দ্রুত সম্ভব তাদেরই উদ্যোগ নেওয়া উচিত। এই প্রেক্ষাপটে জেনেভায় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে যে সীমিত সাফল্য অর্জিত হয়েছে সেটাও তাত্পর্যপূর্ণ। কেননা, তারা প্রক্রিয়াটি অন্তত শুরু করেছে।

যা হোক, উদার বাণিজ্য ব্যবস্থার মৌলিক চ্যালেঞ্জগুলো খুঁজে বের করে সেগুলোর সমাধান করাটাও গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে পাঁচটি বিষয় আলোচনা করা যেতে পারে।

প্রথমত, স্থায়িত্ব। গ্লোবাল সাদৃশ্যগুলোর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা মানবতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই উদ্দেশ্যের সঙ্গে বাণিজ্যবিধি সম্পূর্ণরূপে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। ধ্বংসাত্মক ভর্তুকি মোকাবিলার জন্য একটি সুস্পষ্ট ফোরাম হলো ডব্লিউটিও, বিশেষ করে মৎস্যক্ষেত্রে। সাধারণভাবে, এটি কার্বনের মূল্যের মতো আলোচিত নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। উপযুক্ত মূল্য ছাড়াই উত্পাদন স্থানান্তর রোধ করার জন্য প্রান্তিক মূল্য সমন্বয় অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, প্রণোদনা এবং জরিমানা উভয়ই। জলবায়ু পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বড় আকারের সহায়তার সঙ্গে সমন্বয় করেই এগুলো করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা। অর্থনৈতিক এবং অধিকতর কৌশলগত বিষয় আলাদা করতে হবে, যাতে ব্যবসার কিছু কিছু বিষয়ের পরিচালনায় সরকারকে যুক্ত করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, সাপ্লাই চেইনে বলিষ্ঠতা ও স্থিতিস্থাপকতার অভাব রয়েছে। কোম্পানিগুলোকে বহুমুখী বৈচিত্র্যতা অর্জন করতে হবে যদিও তা ব্যয়বহুল। ক্ষেত্রবিশেষ সরকার সরবরাহ চেইন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সাহাঘ্য করতে পারে। কিন্তু এ ধরনের জটিল কাজ তারা করতে পারবে বলে মনে হয় না। তবে সরকারের এক্ষেত্রে বড় আগ্রহের কারণ আছে। কেননা সম্ভাব্য শত্রুদের থেকে আমদানির ওপর দেশের অর্থনীতি অত্যধিক নির্ভরশীল, যেমন ইউরোপের রাশিয়া থেকে গ্যাস আমদানি। একই সঙ্গে, অবশ্যই প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে হবে, বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তা সম্পর্কিত বিষয়ে। এটি করার একটি উপায় হলো, নিরাপত্তার স্বার্থে বিবেচিত পণ্য এবং ক্রিয়াকলাপের একটি নেতিবাচক তালিকা তৈরি করা, বাণিজ্য বা বিনিয়োগের নিয়ম-কানুনগুলোকে অব্যাহতি দেওয়া কিন্তু অন্যথায় রেখে দেওয়া।

তৃৃতীয় হলো ব্লক। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি জ্যানেট ইয়েলেন নিরাপত্তা উদ্বেগের আংশিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে ‘ফ্রেন্ড হেয়ারিং’-এর কথা বলেছেন। অন্যরা বলেছেন আঞ্চলিক ব্লকের ব্যাপারে। যদিও কোনোটাই পরিপূর্ণ নয় এই অর্থে যে, ‘বন্ধু’ হলো চিরকালের এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোসহ বেশির ভাগ উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বাদ দেবে: ভিয়েতনাম কি বন্ধু, শত্রু, নাকি কিছুই নয়? এটি অনিশ্চয়তা তৈরি করবে এবং মাসুল বাড়াবে। একইভাবে, বিশ্ববাণিজ্যের আঞ্চলিকীকরণকেও ব্যয়বহুল করবে। সর্বোপরি, এটি উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপকে এশিয়ার বাইরে আবদ্ধ করবে, বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল এবং সবচেয়ে অর্থনৈতিকভাবে গতিশীল অঞ্চলকে চীনের কাছে ছেড়ে দেবে। যদিও এই ধারণা অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত ক্ষেত্রে বাতুলতা।

চতুর্থ, গুণগতমান। অধিক আয়ের দেশের স্বার্থ অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে গুণগতমান নিয়ে বিতর্ক বাণিজ্য আলোচনার একটি কেন্দ্রীয় উপাদান হয়ে উঠেছে। এরূপ একটি বিতর্কিত উদাহরণ হলো মেধা সম্পদ। যেখানে কিছু সংখ্যক পশ্চিমা কোম্পানির স্বার্থ জড়িত। আরেকটি হলো শ্রমের মান। এগুলো ছাড়াও এমন কিছু ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে মানগুলো অপরিহার্য। বিশেষ করে, ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিনিময়কৃত তথ্য-উপাত্তের গুণগতমানের প্রয়োজনীতা অপরিহার্য। এসবের অনুপস্থিতিতে বৈশ্বিক বাণিজ্য অসামঞ্জস্যপূর্ণ চাহিদার কারণে ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। প্রকৃতপক্ষে এই কারণে ইইউ’র একক বাজারের জন্য যথেষ্ট নিয়ন্ত্রক সমন্বয়ের প্রয়োজন হলেও ব্রেক্সিটারদের বেলায় তা ঘটে না।

সবশেষে, দেশীয় নীতি। একটি উন্মুক্ত ব্যাবসায়িক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা ভালো দেশীয় প্রতিষ্ঠান এবং নীতিগুলো ছাড়া অসম্ভব হবে, যার লক্ষ্য জনসাধারণকে সুরক্ষা সম্পর্কে সচেতন করে তোলা এবং বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তনগুলোর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত সবাইকে সাহাঘ্য করা। এগুলোর অনুপস্থিতিতে, বিশ্বের জন্য সুবিধা নিয়ে আসা বাণিজ্যের বন্ধনকে একটি অজ্ঞাত জাতীয়তাবাদ বাধাগ্রস্ত করবে।

বিশ্বের নতুন যুগে বিশাল সব চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এমন সম্ভাবনা রয়েছে যে, বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। এমন একটি বিশ্বে, একটি উন্নত ভবিষ্যতের আশা হারাবে কোটি কোটি মানুষ এবং চলমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো অপূর্ণই থেকে যাবে। বিশ্ববাণিজ্য এক্ষেত্রে একটি উপাদান মাত্র। কিন্তু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বহুপাক্ষিক নিয়ম-নীতি থাকলেও উদার বাণিজ্যের ধারণা ছিল মহৎ। এটা বিলীন হতে দেওয়া ঠিক হবে না। এক্ষেত্রে যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করতে না পারে, তবে অন্যদের এগিয়ে আসা উচিত।

লেখক: ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কমান্ডার’ উপাধিতে ভূষিত ফিনান্সিয়াল টাইমস-এর লন্ডনের প্রধান অর্থনীতির ভাষ্যকার।
যুক্তরাজ্যের ফিনান্সিয়াল টাইমস থেকে ভাষান্তর: সুমৃৎ খান সুজন

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন