বুধবার, ১৭ আগস্ট ২০২২, ১ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

যে কথাগুলো শিল্পোদ্যোক্তাসহ সংশ্লিষ্ট সবার জানা জরুরী

আপডেট : ৩০ জুন ২০২২, ২১:১৪

আপনি যদি আপনার সন্তান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি সত্যিই যত্নশীল হয়ে থাকেন, যদি তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে দেওয়ার জন্য, তাদেরকে মানুষ করার জন্য, প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এত পরিশ্রম ও ত্যাগ স্বীকার করে থাকেন, তাদের সুস্থ থাকাটা এবং ভালো থাকাটা যদি আপনার কামনা হয়, তাহলে এই লেখাটুকু পড়া আপনার জন্য খুবই জরুরী।

জীবন ধারণের নিমিত্তে মানুষ সভ্যতার সূচনা থেকেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। গুহা থেকে কৃষি, কৃষি থেকে ব্যবসা, ব্যবসা থেকে শিল্প অতঃপর শিল্প বিপ্লবের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে মানব সভ্যতা ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে এসে পৌঁছেছে। আজ অবধি বিজ্ঞানের যা আবিষ্কার আমরা দেখি এবং এর সুফল ও কুফল যা আমরা ভোগ করি তা আমদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে ব্যবসায়ী তথা শিল্পোদ্যোক্তা সম্প্রদায়। অনেক আবিষ্কারের খবরই আমরা জানি না যেহেতু এগুলো বাণিজ্যিকভাবে সফল হওয়ার মতো ছিল না বলে তারা এখানে বিনিয়োগ করে নি। সভ্যতার এই অগ্রযাত্রায় মানুষের জীবন মান উন্নয়নে ব্যবসায়ী তথা শিল্পোদ্যোক্তাদের ভূমিকা কতখানি তা বুঝতে আশা করি কারো বিশেষ চিন্তা খরচ করতে হবে না। সত্যি কথা বলতে, যে কোন অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নতি সম্পূর্ণভাবে ঐ অঞ্চলের শিল্পোদ্যোক্তাদের উপর নির্ভর করে। তারা সমাজের সীমিত সম্পদকে কাজে লাগিয়ে মানুষের অসীম অভাব পূরণের চেষ্টা করেন। বিজ্ঞান ও গবেষণায় বিনিয়োগ করে নতুন নতুন প্রযুক্তি, পণ্য ও সেবা উদ্ভাবন করেন।

তাদের উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তি, পণ্য ও সেবাগুলো মানুষের বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সমাধান করে থাকে। আর সাধারণ মানুষ পণ্য বা সেবার বিপরীতে ব্যবসায়ী তথা শিল্পোদ্যোক্তাদেরকে অর্থ প্রদান করে। শিল্পোদ্যোক্তারা আবার তাদের শিল্প কারখানা পরিচালনা করার জন্য সাধারণ মানুষের শ্রম ব্যবহার করে এবং বিনিময়ে মজুরী প্রদান করে। আর এভাবেই আমাদের সমাজ, সভ্যতা এবং অর্থনীতি যুগের পর যুগ চলছে। আপনারা হয়তো ভাবছেন ভবিষ্যতেও সবকিছু এভাবেই চলবে।

শিল্পোদ্যোক্তাদের সন্তানরা এসে এই শিল্প কারখানাগুলোর হাল ধরবে। শ্রমিকের সন্তানরা এসে সেখানে কাজ করবে। সবাই মিলে পণ্য ও সেবা উৎপাদন করবে। শ্রমের বিনিময়ে প্রাপ্ত অর্থ শ্রমিকেরা পণ্য ও সেবা ক্রয় করতে খরচ করবে। পণ্য ও সেবা বিক্রয়ের সেই অর্থ শিল্পোদ্যোক্তারা পুনরায় উৎপাদন কাজে ব্যবহার করবে।

যদি এভাবেই সবকিছু চলতো তাহলে আজকের লেখার প্রয়োজন হতো না। আমাদের সভ্যতা সত্যিই আজ এক মহা সঙ্কটের মুখে যা আমরা যথাযথ উপলব্ধি করতে পারছি না। সুস্থভাবে বেঁচে থাকাটা এই যুগে মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণটা হল এই যে আমাদের এই পৃথিবী এখন আর সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অনুকূলে নেই। আমাদের প্রকৃতি, আমাদের পরিবেশ প্রতিনিয়ত খারাপের দিকে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তিত হচ্ছে দ্রুত। 

বায়ুমণ্ডলে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক উষ্ণতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্থলভাগের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। নিম্নাঞ্চলের মানুষ বাড়ি ঘর হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে পড়ছে। নদী নালায় প্রবেশ করছে লবণাক্ত পানি। লবণাক্তটায় কৃষিজমি তার উর্বরতা হারাচ্ছে। ফলে ফসল উৎপাদন কমছে। তাপমাত্রার বৃদ্ধির কারণেও বিশ্বব্যাপী ফসল তথা খাদ্য ও শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একদিকে খাদ্য ঝুঁকি অন্যদিকে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে মানুষ। 

বলা যায়, আমরা এখন একটি মানবিক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে। করোনার নামক একটি মহামারি শেষ হতে না হতেই বিশ্বব্যাপী বন্যা-খরার মত নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদেরকে বিপর্যস্ত
করছে প্রতিনিয়ত। এখানেই শেষ নয়। আমাদের শিল্প প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যবস্থা এবং উৎপাদিত পণ্য যথেষ্ট স্বাস্থ্যকর নয়। অস্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ উৎপাদন ব্যবস্থা কর্মীদের মৃত্যু ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। আবার এখানকার উৎপাদিত নিম্নমানের ক্ষতিকারক পণ্যও ভোক্তাদের মৃত্যু ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে পৃথিবীতে মানুষ বাঁচবে কত দিন? আর মানুষ না থাকলে বা ভোক্তা না থাকলে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো কি টিকবে?

আমাদের পূর্ব পুরুষগণ আমাদের জন্য সম্পদে পরিপূর্ণ একটি সুন্দর ও বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে গিয়েছেন। আমরা কি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তা রেখে যেতে পারছি? আমরা তো নিজেদেরকে অধিক সম্পদের মালিক বানানোর জন্য সমস্ত বনজ ও খনিজ সম্পদ ব্যবহার করে সফল শিল্পোদ্যোক্তা সাজছি। বাহবা নিচ্ছি। মেডেল নিচ্ছি। আর সন্তানদের জন্য রেখে যাচ্ছি ইট পাথর আর টাকার পাহাড়। 

এভাবে আমরা যদি সব প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে নিঃশেষ করে ফেলি, তাহলে শিল্পোদ্যোক্তাদের বংশধররা এই শিল্প কারখানাগুলো চালাবে কীভাবে? কাঁচামাল পাবে কোথায়? আর শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের সন্তানরা কোথায় কাজ করেবে? অর্থনীতির সার্কুলার ফ্লু ডায়াগ্রাম থমকে গেলে মানব সভ্যতা কী সচল থাকবে? আর মানব সভ্যতা থমকে গেলে শিল্প-বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ কি?

আজকে আমরা সংকটের যে জায়গায় দাড়িয়ে নিজেদের এবং পরবর্তী প্রজন্মের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছি, সে জায়গায় আসার প্রেক্ষাপটও আমাদের জানা থাকা জরুরী। মূলত আমাদের অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়নই আমাদেরকে এই জায়গায় এনে দাড় করিয়েছে। আমাদের শিল্প বিপ্লবীগণই প্রকৃত পক্ষে এই বৈশ্বিক সংকটের জন্য বহুলাংশে দায়ী। তারা শুধু যুগের পর যুগ মুনাফা ও পারিবারিক সম্পদ বৃদ্ধির চেষ্টা করে গিয়েছেন। ব্যবসায়কে টেকসই করার কথা চিন্তা করেন নি।

সময় বদলেছে। অনেকেই এখন বুঝতে পারছেন যে পিপল অর্থাৎ মানুষ বা কনজ্যুমার বেঁচে না থাকলে ব্যবসায় নিয়ে টিকে থাকা যাবে না। আবার প্লানেট অর্থাৎ পৃথিবী ও তার পরিবেশ যদি ভালো না থাকে তাহলেও ব্যবসায় নিয়ে টিকে থাকা যাবে না। আর মিনিমাম (জাস্টিফাইড) প্রফিট বা মুনাফা তো লাগবেই। অর্থৎ ব্যবসায় দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই করতে হলে ৩পি অর্থাৎ পিপল, প্লানেট ও প্রফিট এর উপর সমান গুরুত্ব দিয়ে ব্যবসায় পরিচালনা করতে হবে। উন্নত বিশ্বে টেকসই উন্নয়ন, টেকসই ব্যবসায় প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে বেশ আগে।

বাংলাদেশেও ব্যবসায়কে টেকসই করার লক্ষ্যে “৩পি” মডেল মাথায় রেখে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শ, সেবা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে “এন্টারপ্রাইজ ৩৬০ লিমিটেড”। স্বাস্থ্যকর পণ্য উৎপাদন, সুলভ মূল্যে ভোক্তার হাতে তুলে দেওয়া, ভোক্তার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার মাধ্যমে কনজ্যুমার লাইফ টাইম ভেল্যু অর্জন, কর্মী বান্ধব স্বাস্থ্যকর উৎপাদন কৌশল প্রয়োগ, পরিবেশের উপর শিল্পায়নের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ, মুনাফা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনগত দক্ষতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ করে প্রতিষ্ঠানটি। 

“এন্টারপ্রাইজ ৩৬০” দেশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যে এন্টারপ্রাইজ অটোমেশন, ডাটা ম্যানেজমেন্ট এবং ইআরপিসহ অন্যান্য অত্যাধুনিক সফটওয়্যার বাস্তবায়নের উপর জোর দেয় যা প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও অযাচিত ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করে মুনাফা বৃদ্ধিতে অবদান রাখে। 

মোটকথা “এন্টারপ্রাইজ ৩৬০” একই ছাতার নিচে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় সমস্যার টেকসই সমাধান প্রদানে কাজ করে। প্রতিষ্ঠানটি একই সাথে বিজনেস ইনকিউবেশন এবং এক্সিলারেশন সেন্টার হিসেবে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলোকে কৌশলগত, পরিচালনগত ও প্রায়োগিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসান এড়াতে অথবা মুনাফা বৃদ্ধিতে এন্টারপ্রাইজ ৩৬০ গ্যারান্টিসহ কাজ করে এবং রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার নিশ্চয়তা প্রদান করে।

লেখক: উদ্যোক্তা অর্থনীতিবিদ ও চেয়ারম্যান, এন্টারপ্রাইজ ৩৬০ লিমিটেড এবং স্কুল অব অন্ট্রুপ্রেনিয়রশীপ ডেভেলপমেন্ট

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন