বুধবার, ১৭ আগস্ট ২০২২, ১ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বাজারে টিসিবি: দরকার মনিটরিং স্কোয়াড

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২২, ০৬:৪৭

গোটা জাতির মন থেকে ‘পদ্মা’ উত্সবের রেশ কাটতে না কাটতেই ‘বাজারে আগুন’ লাগার খবর আসা শুরু হয়েছে। চাল, ডাল, তেল, নূন, পিঁয়াজ, মরিচ সব জিনিসের দাম বাড়ছে। ফলে সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের মনে আশঙ্কা জাগছে, সামনে কী হবে।

এখন বর্ষাকাল, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়। এমনিতেই দুর্ভোগের শেষ নেই। তার ওপর জিনিসপত্রের দাম বাড়লে মানুষ চলবে কী করে? এ অবস্হায় সাধারণ মানুষ চেয়ে আছে সরকারের দিকে। কিন্তু সরকার সবই পারে, শুধু বাজারে গিয়ে ‘হারে’। কিন্তু কেন? বিগত দিনে ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, মহামারি সবই সামাল দিয়েছে, দিচ্ছে। আগুনসন্ত্রাস বন্ধ করাসহ জঙ্গি দমনেও সরকার সাফল্য পেয়েছে। পরিবহন সেক্টরে এখন আর নৈরাজ্য নেই। গার্মেন্টস সেক্টরে পুরোদমে উত্পাদন চলছে। হাইওয়েগুলো চার থেকে ছয় লেন হচ্ছে, মেট্ট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেস, নদীর তলের ট্যানেল শিগ্গিরই চালু হতে যাচ্ছে।

নিজের টাকায় ‘পদ্মা সেতু’ বানিয়ে সরকার জাতির মর্যাদা ও সক্ষমতা বাড়িয়েছে। কেউ স্বীকার করুক বা না করুক সরকারের আরো অনেক সাফল্য আছে। শুধু ‘বাজার’ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ। কেন পারে না, এ প্রশ্নের সদুত্তর মেলে না। বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতনের ইতিহাস বহুমাত্রিক। উমিচাঁদ, জগৎ শেঠ, রায় দুর্লভ, রাজবল্লভ, ইয়ার লতিফ গং কেউ রাজনীতির লোক ছিল না। তারা ছিল বাজারি। ব্যবসায়ের নামে মুনাফার সন্ধান করত। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বড় মুনাফার লোভ দেখালে তারাই মিরজাফর-মিরমদনদের জন্ম দেয়।

এখন সে যুগ না থাকলেও এ যুগেও উমিচাঁদ, জগত্ শেঠ, রায় দুর্লভ, রাজবল্লভ, ইয়ার লতিফ গংদের প্রেতাত্মারা মিরজাফর-মিরমদনদের জন্ম দেওয়ার অপচেষ্টা থেকে বিরত হয়নি। সামনে কোরবানির ঈদ। এরই মধ্যে খবর বেরিয়েছে বাজারে হুহু করে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। চট্টগ্রামের আড়তদাররা বলছেন, বন্যার কারণে নাকি সরবরাহ কমে গেছে। কী অদ্ভুত যুক্তি! সরকার বলছে বাজারে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। চাল, ডাল, আদা, রসুন, পিঁয়াজ, মরিচ, তেল, নুন, কোনো কিছুর অভাব নেই। 

অন্যদিকে দেশীয় পিঁয়াজ উত্পাদনের অঞ্চলগুলোতে বন্যা নেই। তাহলে দাম বাড়বে কেন? এ দেশে প্রতিটি উত্সব এবং বিশেষ সময়ে একশ্রেণির মুনাফাখোর পকেট কাটে, বাজার লোটে। সরকার হুঁশিয়ারি দেয়, অভিযান চালায়। তাতে জিনিসপত্রের দাম কমে না। গণমাধ্যমে নিয়মিত রিপোর্ট হয়, বাজার নিয়ে রাজনীতি গরম হয়; কিন্তু দাম বাড়তেই থাকে। এর ব্যত্যয় প্রয়োজন। কেন্দ্র থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় এমনকি পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোকেও মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হলে অবস্হার পরিবর্তন ঘটবে। নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা হলে আপনা থেকেই মুনাফাখোর চক্র দমন হয়ে যাবে। সাধারণ মানুষের মনে প্রতিবাদের সাহস বাড়বে, সংযমী হবে।

সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য বিশেষ বাহিনী বানিয়েছে। তাদের তত্পরতায় দেশে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা কমে গেছে। দেশের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে নিয়মিত মনিটরিং করার জন্য সময়ের প্রয়োজনেই একটি বিশেষ বাহিনী করা হলে দোষের কী আছে? নতুন কোনো বাহিনী বানানোয় সমস্যা থাকলে র‍্যাব সদস্যদের মধ্যে থেকেই ‘স্কোয়াড’ করা যেতে পারে। তাদের দেখলেই যেন বোঝা যায় ‘বাজার মনিটরিং স্কোয়াড’। 

ঐ রকম ইউনিফর্মড কোনো বাহিনী থাকলে সাধারণ মানুষ তাদের কাছে কোথায়, কারা জিনিসপত্রের দাম বাড়াচ্ছে জানাতে পারবে। বহু ডিপার্টমেন্ট আছে সারা দেশে যাদের বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে। বলতে গেলে তারা সারা বছর শুধু বসে বসে বেতন খায় আর ভাউচার বানায়। তাদেরকেও কাজে লাগানো যেতে পারে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। ভোগবিলাসী ইউরোপীয় সমাজের ঘরে ঘরে বেকারত্ব। জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বী। তারা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে শরণার্থী কী জিনিস! এই সংকটের মধ্যে দিয়েও একশ্রেণির মানুষ বেশুমার অর্থবিত্তের মালিক হচ্ছে। বাংলাদেশেও মুনাফাখোর শ্রেণি যুদ্ধের বাজারে মুনাফার জন্য আঙুলের কড়া গুনতে শুরু করেছে। তাদের কাছে আমদানি করা পণ্য আর দেশীয় পণ্যের কোনো বাছ-বিচার নেই। টার্গেট হচ্ছে এই সুযোগে পকেট কাটবে, বাজার লুটবে, পাচার করবে।

দেশের প্রকৃত ব্যবসায়ী সমাজকে এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কেননা দুবৃ‌র্ত্তায়নের কারণে দিনকে দিন ব্যবসায়ী সমাজ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু নজির আছে, দুর্ভিক্ষ, মহামারি, যুদ্ধ-বিগ্রহের সময় একশ্রেণির লোক সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে। আন্তর্জাতিক লুটেরা চক্রের ঐ লুটের সম্পদ রক্ষার নিরাপদ রক্ষক ‘সুইস ব্যাংক’। 

সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমানো টাকার পরিমাণ প্রায় ৮ লাখ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে গত এক বছরেই জমা হয়েছে সবচেয়ে বেশি টাকা। এ হিসাব শুধু নগদে জমানো টাকার। এর বাইরে সোনদানা, হীরা, মনি-মুক্তার হিসাব আলাদা। গত দুই বছর দেশ করোনায় আক্রান্ত। ব্যবসায়-বাণিজ্য জীবন ও জীবিকা সবকিছু প্রায় অচল ছিল। তার পরও এত বিপুল পরিমাণ টাকা সুইস ব্যাংকে গেল কীভাবে!

সারা বছর টিসিবি

দেশের ব্যবসায়-বাণিজ্যে কাউকে বাধা দেওয়া বা শাস্তি দিয়ে শত্রুতা বাড়ানোর কোনো দরকার নেই। সরকার সারা দেশে টিসিবির পণ্য বিক্রি শুরু করেছে। বলা হচ্ছে, এটা চলবে ১০ জুলাই পর্যন্ত। কেন, সারা বছর ধরে চলতে সমস্যা কোথায়? সরকার বাজার থেকে ন্যাঘ্য মূল্যে পণ্য কিনে খরচ বাদে সর্বসাধারণের কাছে উন্মুক্ত বাজারে বিক্রি করবে। জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোর অজুহাতে মুনাফাখোররা যুক্তি দেখায় আমদানি মূল্য বেশি হওয়ার কারণে তারা দাম বাড়াতে বাধ্য হয়। 

এ নিয়ে তর্ক করে আখেরে কোনো সমাধান পাওয়া যাবে না। তারা তাদের মতো আমদানিকৃত পণ্যের দাম নির্ধারণ করুক। সরকার নিজে নিত্যপ্রয়োজনীয় জরুরি পণ্য আমদানি করে টিসিবির মাধ্যমে সারা দেশের খোলাবাজারে বিক্রি করলে কারো কিছু বলার থাকবে না। টিসিবির দোকান থেকে সর্বস্তরের মানুষ প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারলে বাজার লুটেরা মুনাফাখোরদের কিছুই করার থাকবে না। 

সাধারণ মানুষের চাহিদা শুধু চাল, ডাল, তেল, নুন, পিঁয়াজ, মরিচ, আদা, রসুনের। এসব পণ্য বেসরকারি খাতের পাশাপাশি সরকার নিজেই আমদানি করে টিসিবির মাধ্যমে বিক্রি করলে সারা বছর বাজার স্হিতিশীল থাকবে। ভোক্তা অধিকারদপ্তরকে আরো বেশি ক্ষমতা ও দায়িত্ব দিয়ে তাদের কার্যক্রম দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করা দরকার।

শুধু ঢাকা বা চট্ট্রগ্রামকেন্দ্রিক না হয়ে সয়াবিন তেল মজুতকারীদের বিরুদ্ধে যেমন অভিযান চলছিল, সারা বছর ধরে সেরকম অভিযান চালানো এখন সময়ের দাবি। কথায় বলে ‘চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনি’। মুনাফাখোর শ্রেণি স্বাভাবিক মানুষ নয়। এরা মানুষের মুখ দেখে না, পকেট হাতায়। তবে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে একক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ এটা প্রমাণিত ‘সরষের মধ্যেই ভূত থাকে’। ভাবতে অবাক লাগে বাংলার ছাত্রী করা একজন মানুষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যা বোঝেন তা এ দেশের বড় বড় ডিগ্রিধারী বাঘা বাঘা ইঞ্জিনিয়াররা কল্পনাও করতে পারেন না। 

সিলেটে বন্যার পানি দ্রুত সরে যাওয়ার জন্য তিনি বললেন, ‘সড়ক কেটে দাও’। পরে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা মেরামতের প্রশ্নে বললেন, ‘সড়কের ভাঙা অংশ মেরামত নয়, ব্রিজ কালভার্ট কর’। আবার রেল ক্রসিংয়ের জায়গায় ‘আন্ডার এবং ওভার ব্রিজ’ করতে বললেন। কত সহজ এবং দীর্ঘস্হায়ী সমাধানের দূরদর্শী নির্দেশনা। এগুলো শুনে আমাদের দেশের ইঞ্জিনিয়াররা কি লজ্জা পান না? আমলাতন্ত্রের মধ্যে যাদের এখনো হুঁশজ্ঞান আছে তাদের উচিত একটু নড়েচড়ে বসা। কেননা সাধারণ মানুষ এখন অনেক কিছুই বোঝে। বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে আমলাতন্ত্রের উচিত হবে কূটচাল না চেলে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া সময়োচিত সিদ্ধান্ত কার্যকর করা। মাত্র একটি বছর সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে তার বহুমাত্রিক সুফল পাবে দেশবাসী তথা রাজনীতি। ‘বাজার’ স্হিতিশীল থাকলে দেশে সব ক্ষেত্রে স্হিতিশীলতা থাকবে। দেশে-বিদেশে দৌড়াদৌড়ি কিংবা লবিং গ্রুপিং করে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করা যাবে না। বাংলাদেশের নির্বাচন কিংবা উন্নয়ন বিষয়ে ‘মোড়লদের’ দেওয়া উদ্দেশ্যমূলক জ্ঞানে কোনো কাজ হবে না।

রাজনীতিতে কোনোদিনও ঐক্য হয় না। সে কারণে সব সময়ই এক দল আরেক দলের প্রতিপক্ষ। নইলে সব দল মিলে এক দল হয়ে যেত। মানবসভ্যতার বিকাশ ঘটেছে যুদ্ধবিগ্রহ মারামারি কাটাকাটি খুনখারাবির মধ্যে দিয়ে। আগের দিনে এক দেশের শাসকরা আরেক দেশ আক্রমণ করে প্রতিপক্ষকে হত্যা করে নিজেদের শাসন কায়েম করত। এই উপমহাদেশে মোগল, পাঠান, ব্রিটিশদের ইতিহাস তার সাক্ষী। তখনকার দিনে নেতৃত্বের ব্যক্তিত্ব ছিল। এখন নেই। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতার পর দেশবাসীর সামনে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নেতৃত্বের কোনো মুখ নেই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমান বিশ্বে সর্বজনস্বীকৃত একজন দূরদর্শী রাজনীতিবিদ। তিনি প্রমাণ করেছেন, মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী বীরের জাতি বাঙালির ‘বাংলাদেশ পারে’। এই সক্ষমতার মর্যাদা ধরে রাখার জন্যই দরকার দেশপ্রেমিক মানুষের জাতীয় ঐক্য। রাজনীতির ফসল ভাগাভাগি বা বেনিফিশিয়ারিদের সমঝোতায় প্রয়োজনে জোড়াতালি দিয়ে সরকার বানানো যায়। কিন্তু সে ধরনের সরকারের ভেতরে ‘শক্তি’ থাকে না। সংযুক্তরা শুধু ‘খাই খাই, নাই নাই, যাই যাই’ করে। সরকারের ভেতরের একেক জন একেক সুরে কথা বলায় বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। তাই দলের নয়, ঐক্য দরকার সাধারণ মানুষের, যা ‘পদ্মা সেতু’র উচ্ছ্বাসে প্রকাশিত হয়েছে। মাত্র একটি বছর বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই আগামীর বাংলাদেশ উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে বিশ্বের মানচিত্রে নিজেদের সক্ষমতায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হবে। দেশের সব শ্রেণি-পেশার সব মানুষের এখন উচ্চ স্বরে সে কথা বলার সময় এসেছে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, বিএফইউজের সাবেক সভাপতি

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন