বুধবার, ১৭ আগস্ট ২০২২, ১ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

মানুষকে অনাহারে রেখে গাড়ির আহার!

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২২, ০৭:১৪

বিশ্বব্যাপী চরম খাদ্যসংকটের মধ্যে মানুষের খাবার কেড়ে তা মেশিনকে খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে! এ ধরনের সিদ্ধান্ত উন্মাদ, কাণ্ডজ্ঞানহীন ও নিষ্ঠুরতার পরিচায়ক। লাখ লাখ মানুষকে ক্ষুধার্ত রেখে খাদ্য অপচয়ের এ জাতীয় সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে উক্ত শব্দগুলোরও ব্যবহার কম হয়ে যায়।

শস্য বা ফসলকে জৈব জ্বালানিতে পরিণত করার মতো ক্ষতিকর কাজের বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। যানবাহনের শক্তি বা বিদ্যুৎ উত্পাদন কিংবা ঘরকে উষ্ণ করার কাজে যদি খাদ্যশস্যকে ব্যবহার করতে হয়, তবে অবধারিতভাবে তা মানুষের মুখ থেকে কেড়েই করতে হবে। অথবা বাস্ত্ততন্ত্রকে পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে ছিনিয়ে নিতে হবে, কেননা অতিরিক্ত চাহিদা মেটানোর জন্য আবাদযোগ্য জমি বাড়তে থাকে। কিন্তু যারা এই নিষ্ঠুর-নির্দয় কাজের পক্ষে, তারা জ্বলজ্যান্ত এই সত্যকে উপেক্ষা করছে। এমনকি তারা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব সম্পর্কেও মিথ্যা সমাধানের কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্তিতে ফেলছে।

শুরু থেকেই আটলান্টিকের উভয় পাশে জৈব জ্বালানির বিস্তারের সুবিধার্থে নানা রকম প্রণোদনা এবং নিয়ম-নীতি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধা হাসিলও এক্ষেত্রে কাজ করছে। এরকম প্রেক্ষাপটে জৈব জ্বালানির হাত থেকে এই এলাকাকে রক্ষা করার জন্য বেশি কিছু করার ছিল না। জার্মান মোটর প্রস্ত্ততকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী জ্বালানি অর্থনীতির স্ট্যান্ডার্ড এড়ানোর সুযোগ করে দিতে ‘ইইউ বায়োফুয়েল ম্যান্ডেট’-এর ওপর জোর দেন অ্যাঞ্জেলা মার্কেল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোও একই কাজ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে তারা একটি নিশ্চিত বাজার সরবরাহ ব্যবস্হার মাধ্যমে কৃষকের থেকে বাড়তি দামে শস্য কিনছে। চলমান ধারাবাহিকতায় মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে বাইডেন প্রশাসনও এই নিষ্ঠুরতার প্রতি সমর্থন জানাতে বাধ্য হচ্ছেন।

‘ট্রান্সপোর্ট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’-এর অনুসন্ধান মতে, ইউরোপে ১৪ মিলিয়ন হেক্টর (৩৫ মিলিয়ন একর) জমি জৈব জ্বালানি উত্পাদনের জন্য ব্যবহূত হয়। এই বিপুল এলাকা গোটা গ্রিসের আয়তনের চেয়েও বেশি। ইউরোপীয় ইউনিয়নে ব্যবহূত মোট সয়া তেলের ৩২ শতাংশ গাড়ি এবং ট্রাকের জ্বালানিতে ব্যবহৃত হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নে ব্যবহূত মোট পাম তেলের ৫০ শতাংশ এবং রাইসরিষা তেলের ৫৮ শতাংশ যায় যানবাহনের জ্বালানিতে। সব মিলিয়ে বিশ্বে উত্পাদিত মোট উদ্ভিজ্জ তেলের ১৮ শতাংশ বায়োডিজেলে পরিণত হয় এবং পেট্রোলের সঙ্গে মেশানোর জন্য বিশ্বের ১০ শতাংশ শস্য ইথানলে রূপান্তরিত হয়।

‘গ্রিন অ্যালায়েন্স’-এর প্রতিবেদন বলছে, জৈব জ্বালানির কাজে শুধু যুক্তরাজ্য যে খাবার ব্যবহার করে তা দিয়ে ৩.৫ মিলিয়ন মানুষকে খাওয়ানো সম্ভব। অনুমান করা হয়, যদি বিশ্বব্যাপী জৈব জ্বালানি উত্পাদন বন্ধ করে দেওয়া যায় তবে সংরক্ষিত খাদ্যশস্যে ১.৯ বিলিয়ন মানুষের ক্ষুধা মেটানো সম্ভব। অর্থাৎ এটা স্পষ্ট যে, জৈব জ্বালানি প্রযুক্তির শুধু একটাই ফলাফল—ক্ষুধা।

কেবল খাদ্যের দামের ঊর্ধ্বমুখী চাপের জন্যই বায়োফুয়েল দায়ী নয়, এর আরো বহু নেতিবাচক দিক রয়েছে। ক্ষুদ্র কৃষক এবং আদিবাসীদের কাছ থেকে জমি দখলের জন্য ‘জৈব জ্বালানির বাজার’ বড় আকারের প্রণোদনা দিয়ে থাকে। স্বায়ত্তশাসিত ফান্ড, করপোরেশন এবং ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীরা ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত আফ্রিকার ১০ মিলিয়ন হেক্টর জমি কিনেছে কিংবা কবজা করে নিয়েছে। যেগুলোর অধিকাংশই চাষের জন্য সেরা জমি। স্হানীয়ভাবে যেসব শস্য উত্পাদিত হতো, তা বাদ দিয়ে তারা সয়া এবং ভুট্টার মতো পণ্য যাকে ‘ফ্লেক্স ক্রপস’ বলা হয় তার ওপর জোর দিচ্ছে। ফ্লেক্স ক্রপসের সুবিধা হলো, এই শস্য খাদ্যপণ্য, পশুখাদ্য বা জৈব জ্বালানি সকল ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়। দামের তারতম্যের বিচারে যার দাম সবচেয়ে বেশি সময় বুঝে সেটির উত্পাদন করা হয়। এভাবে ভূমি বিক্রি বা দখল হয়ে ইচ্ছামতো শস্য উত্পাদনের ফলে অনেকেই নিঃস্ব হচ্ছে, বাড়ছে ক্ষুধা।

এভাবে জৈব জ্বালানির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমির চাহিদা বাড়ার ফলে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ব্রাজিল এবং আফ্রিকার রেইনফরেস্ট, জলাভূমি এবং সাভানা উজাড় করা হচ্ছে। এটা গুরুত্বপূর্ণ কথা যে—‘আমরা কতটা খেতে পারি তার একটা সীমা আছে। কিন্তু আমরা কতটা পোড়াতে পারি, তার কোনো সীমা নেই।’ জরুরি বিষয় হলো, জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে ব্যবহূত বায়োডিজেল তৈরিতে ব্যবহৃত শস্যের উত্সগুলোর পরিবেশ ও জলবায়ুগত ঝুঁকি রয়েছে। গ্লোবাল হিটিংয়ের বিচারে রেপসিড তেল ১.২ গুণ, সয়া তেল দ্বিগুণ, পাম তেল তিন গুণ বেশি। গম থেকে প্রস্ত্তত ইথানলের ক্ষেত্রেও ঘটে একই বিষয়। তবুও এই পরিসংখ্যান বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। উপরন্তু সরকারি প্রণোদনায় বায়ো ইথানল প্ল্যান্ট চালু করা থামেনি। ফলে এসব খাতে লাখ লাখ হেক্টর জমির গম ব্যবহৃত হবে, যা মানুষের ক্ষুধা বৃদ্ধি করবে।

লক্ষণীয় হলো, যখনই একটি নতুন জৈব জ্বালানি ব্যবহারকারী যান বাজারে আসে, জনগণকে বলা হয় বলা হয়, এটি বর্জ্যের দ্বারা চলবে। যেমন: সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো ‘বিপি’ দাবি করছে, তাদের তৈরি বিমানগুলোর জ্বালানি তৈরি হবে ‘টেকসই ফিডস্টক যেমন:ব্যবহৃত রান্নার তেল এবং গৃহস্হালির বর্জ্য’ থেকে। কিন্তু এটা পরিষ্কার যে, বাজার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এর সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য বাড়তি শস্য ফলানো শুরু হবে। ইতিমধ্যে বাস্তবিকভাবে নিষ্কাশন করা যায় এমন বর্জ্য ব্যবহার করা হচ্ছে, যদিও তা ইউ-এর বায়োডিজেলের মাত্র ১৭ শতাংশ এবং এতে বায়োইথানলের পরিমাণ সামান্য। এই পরিসংখ্যানের পাশাপাশি অন্য তথ্যও রয়েছে। এই শিল্পে কর্মরত একজনের দাবি, যেহেতু ‘সবুজ’ বায়োডিজেলের প্রশ্নে পাম তেলের বর্জ্যের চাহিদা বাড়ছে, সেক্ষেত্রে নতুন তেলের চেয়ে বেশি বর্জ্য তেলই মূল্যবান হয়ে উঠছে। এর ফলে বর্জ্য তেলের স্রোতে অব্যবহূত তথা নতুন তেলের মিশে যাওয়ার অভিযোগ উঠবে। অর্থাৎ, জৈব জ্বালানির চাহিদা মেটাতে অতিরিক্ত শস্য জন্মানোর দরকার পড়বেই।

সম্প্রতি কয়েকটি দেশ জৈব জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়েছে। আরো খারাপ সংবাদ হলো, যুক্তরাজ্য দাবি করছে তাদের প্লেনগুলোতে শিগ্গিরই ‘টেকসই’ জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। বুঝতে বাকি থাকে না যে, বাস্তবে এই টেকসই জ্বালানির অর্থ হলো—জৈব জ্বালানি, কারণ অন্য কোনো টেকসই উত্সই বিমান ভ্রমণকে এতটা শক্তি দিতে পারবে না। এভাবে সত্যিই যদি জৈব জ্বালানিতে প্লেন উড়ানোর ব্যবস্হা করা হয়, তবে তা দিয়ে খুব অল্পসংখ্যক প্লেনেকেই আকাশে ওড়ানো যাবে। কেননা, তা বিশ্বব্যাপী অনাহার এবং পরিবেশগত বিপর্যয় দুই-ই বাড়িয়ে তুলবে।

জ্বালানি শক্তি সংস্হা ইকোট্রিসিটি যুক্তরাজ্যের ৬.৪ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে (যা দেশের মোট জমির এক-চতুর্থাংশের বেশি) বায়োগ্যাস প্ল্যান্টের জন্য ফিডস্টকে পরিণত করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ইকোট্রিসিটির প্রতিষ্ঠাতা ডেল ভিন্স বিস্ময়কর দাবি করে বলেছেন, ‘এটি এমন একটি পরিকল্পনা যাতে কোন দুর্বলতা নেই’। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, এই প্রকল্প পরিবেশগতভাবে বিরূপ প্রভাব বয়ে আনবে—কার্বন এবং খাদ্য উত্পাদনে বিপর্যয় বাড়িয়ে তুলবে। অন্য দিকে, ভূমির ব্যবহার হওয়া উচিত শুধু খাদ্য উত্পাদনের জন্য। তা না করে যদি ভূমি ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে তা আরো কার্বন টেনে আনবে এবং বন্যপ্রাণীর আশ্রয়স্হলে পরিণত হয়ে উঠবে। তাছাড়া ইকোটিÌসিটির পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ তথা প্ল্যান্টে ব্যবহূত বর্জে্যর অবশিষ্টাংশ জমিতে ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা ফুটো হওয়া বা ফেটে যাওয়ার কারণে বায়োগ্যাস উত্পাদন মারাত্মক দূষণের ঘটনাও ঘটিয়েছে। সব মিলিয়ে এ জাতীয় পরিকল্পনাকে সবচেয়ে খারাপ ভূমি ব্যবহারের প্রস্তাব হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মোটকথা, যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জলবায়ু সংকটের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। মাটিতে জীবাশ্ম জ্বালানির মজুত রেখে তবেই আমাদের শক্তি ব্যবস্হার পরিবর্তন নিয়ে ভাবতে হবে। ভ্রমণের প্রয়োজনে, পরিবহনের ক্ষেত্রে, বাসাবাড়ির জ্বালানির ক্ষেত্রে, কিংবা ঘর গরম করার ক্ষেত্রে জৈব জ্বালানির ব্যবহার অবান্তর। তুলনামূলক বিচারে তিমির তেল থেকে প্রস্ত্তত পুরোনো জৈব জ্বালানি প্রণালির থেকে আধুনিক জৈব জ্বালানি বেশি টেকসই নয়। কাজেই, আধুনিক জৈব জ্বালানি প্রস্ত্তত করতে গিয়ে বিস্তীর্ণ শস্যজমি বিনষ্ট করাটা বোকামি হবে। এভাবে খাদ্য পোড়ানো মানবিক অবক্ষয়ের নামান্তর।

লেখক: ব্রিটিশ সাংবাদিক

দ্য গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর: সুমৃৎ খান সুজন

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন