বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

স্যার, মাফ করবেন আমাদের

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২২, ২০:৫৪

‘মানুষের মতো মানুষ হও’—প্রবীণরা যখন অনুজদের জন্য এই আশীর্বাদ করেন, তখন মানুষ তৈরির দোয়া করেন। জিপিএ-৫ পাওয়ার দোয়া কিন্তু করেন না তারা। এই মানুষ গড়ে তোলার কারিগর শিক্ষক। তবে এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছে জিপিএ-৫ তৈরির কারখানা। 'মানুষের মতো মানুষ' কথাটি প্রবাদেই আটকে আছে।

শিক্ষকদের স্থান সমাজের কতোটা ওপরে, তা তো বিভিন্ন গুণী মানুষের উক্তি পড়লেই বোঝা যায়। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালাম বলেছেন, তিনজন মানুষ পারেন একটি দেশ বা জাতিকে বদলাতে। তারা হলেন বাবা, মা ও শিক্ষক। মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, যদি তুমি জীবনে সাফল্য অর্জন করে থাকো তাহলে মনে রাখবে তোমার পাশে একজন শিক্ষক ছিলো, যে তোমাকে সাহায্য করেছিলো।

শিক্ষকরা সমাজে সম্মানের উঁচুস্থানে অবস্থান করেন। তাদের কাছে থাকে না ভেদাভেদ। শিক্ষার্থীরা তাদের সন্তানসম। যাদের নিয়ে থাকে শিক্ষকদের আকুল প্রচেষ্টা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, (২৯ জুন মানবজমিনে প্রকাশিত) তরুণদের সাংস্কৃতিক কাজের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। এখন কোনো সংস্কৃতির চর্চা নাই। নাটক, গান, বাজনা, বিতর্ক নেই, খেলাধুলা নেই। যার ফলে কিশোররা বীরত্ব প্রকাশের জন্য গ্যাং সৃষ্টি করছে।

কিশোরদের মাঝে বীরত্ব দেখানোর একটা প্রবণতা সবসময়ই থাকে। তাই তারা খেলাধুলা, সংস্কৃতি চর্চায় যেহেতু নিজের বীরত্ব তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে না, তাই জড়িয়ে যাচ্ছেন নানাবিধ অপরাধে। এরই নিদর্শন হয়ত ঢাকা জেলার সাভার উপজেলার আশুলিয়ায় শিক্ষক হত্যা।

এটা কি কোনো বিছিন্ন ঘটনা? না, একদমই না। ধারাবাহিকতা থেকে এসেছে এটি। নারায়ণগঞ্জে কান ধরে ওঠবস করানো হয়েছিল শ্যামল কান্তি ভক্তকে। ২০১৬ সালের ১৩ই মে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে। মুন্সিগঞ্জে হৃদয় চন্দ্র মণ্ডল নামে এক শিক্ষককে মামলার পর কারাগারে যেতে হয়েছিল। গত ২২শে মার্চ তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তিনি মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার বিনোদপুর রাম কুমার উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও গণিতের শিক্ষক। তার বিরুদ্ধেও আনা হয় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ। এই দুটি আলোচিত ঘটনায় সরগরম হয়েছিল আলোচনার টেবিল। কিন্তু শিক্ষক অবমাননা অন্য মাত্রায় পৌঁছে গেছে নড়াইলে। সেখানে শিক্ষার্থীরা প্রধান শিক্ষকের গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেন। জেলার মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজে পরদিন ১৮ জুন ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পরে। এই পোস্টদাতা শিক্ষার্থীর পক্ষ নিয়েছেন প্রধান শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাস। এর জের ধরেই সেই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে গলায় জুতার মালা পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ সদস্যরাও পাশে ছিলেন।

আর সবশেষ একজন শিক্ষককে পিটিয়েই মারলেন তারই ছাত্র। আশুলিয়ায় হাজী ইউনুছ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের বখাটে এক শিক্ষার্থীর মারধরের শিকার আহত শিক্ষক উৎপল কুমার সরকার চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়। ২৪ জুন কলেজে প্রকাশ্যে ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্প দিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে ও খুঁচিয়ে গুরুতর আহত করে ওই প্রতিষ্ঠানেরই দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আশরাফুল ইসলাম জিতু। নানা অভিযোগে অভিযুক্ত ছিল এই জিতু। জিতুকে শাসানোই কাল হয়ে দাঁড়ায় ওই শিক্ষকের জন্য।

দেশের আইন লেখা থাকে ছাপা কাগজে। এরবাইরেও থাকে অঘোষিত আইন। যে আইনের পারদগুলো শ্রদ্ধাবোধ, সহমর্মিতা, ভালোবাসা। এই অঘোষিত আইনের বাস্তবায়নই লিখিত আইন প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু কোথায় আজ অলিখিত সেই আইন? একজন শিক্ষককে যখন পিটিয়ে হত্যা করে শিক্ষার্থী, পায়ের জুতা যখন তোলা হয় শিক্ষকের গলায়; তখন কি একে সমাজের অবনমন বলা যায় না?

শিক্ষকদের এমনিতেই ক্ষোভের শেষ নেই। যথাযথ বেতন মেলে না তাদের। ফলে মেধাবীরা সহসাই আসতে চান না এই মহান পেশায়। এরপর একের পর এক এই ঘটনায় ফল নিশ্চয়ই ভালো প্রভাব ফেলবে না।

শিক্ষকদের বিপক্ষেও অভিযোগ কম নেই। এইতো কতো শিক্ষকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, নির্যাতন, ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে। তাই বলে নিশ্চিয়ই পুরো শিক্ষক সমাজ কলুষিত নয়। আবার শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধেও মিলছে কতো অভিযোগ। এগুলোও পুরো শিক্ষার্থী সমাজের কথা বলে না। কিন্তু এই অবনমন নিশ্চয়ই ভাববার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর অভিভাবকদের উচিত সন্তানকে জিপিএ-৫’র পাগলা ঘোড়া না বানিয়ে সুস্থ, সবল, মানবিক মানুষ হবার শিক্ষা দেয়া। নয়তো এমন খুনের মতো বড় অপরাধে না জড়ালেও ছোট হাজারো অপরাধে জড়াবে সহসাই।

হাতে হাতে মোবাইল ফোন। তাতে গোটা বিশ্ব স্কুল মাঠটায় বল পায়ে গোল দেবার বয়সে শিক্ষার্থীরা খেলছেন ফ্রি ফায়ার গেমস। যে  খেলায় প্রধান কাজটাই হচ্ছে গুলি করে অন্যকে ধ্বংস করা। আবার ঈদ এলেই ছোট শিশুদের হাতে দেখা যায় খেলনা পিস্তল। ছোট শিশুটার বেড়ে উঠছে গুলি করা ইমাজিনেশন থেকে। যুগটা এমন চাইলেই শিক্ষার্থীদের ডিজিটাইলেজশন থেকে দূরে রাখা যাবে না। আর জোড়পূর্বক দুরে রাখলে তা হবে ক্ষতির সামিল। নিশ্চিত করতে হবে সুষ্ঠু ডিজিটাল জ্ঞান।

ছোট বেলায় আমরা অনেকেই স্কুল পালিয়েছি। স্যারের কাছে ধরা পরার পর ভয়ে অস্থির ছিলাম আমরা। স্যার দিয়েছেন শাস্তি। কিন্তু স্কুল শেষে এই স্কুল পালানোই স্মৃতিগুলোই মধুর স্মৃতি হিসেবে ধরা দেয়। তাই শিক্ষককের শাসন আমাদের ভালোর জন্যই। কিন্তু সেই ভালোটা বুঝলো না আশুলিয়ায় সেই শিক্ষার্থী। শরীরে আঘাতই করে বসল। হয়ত স্যারের এই শাসনটুকুই বদলে দিতো তার জীবন। স্যারতো বাবার সমতুল্য। বাবা শাসন করেছেন এটাই কি হতে বাবার অপরাধ? একটু সহনশীল হলেই শুরু হতো নতুন অধ্যায়। ফ্রি ফায়াররে গুলি করে অন্যকে ধ্বংস করার মনমানসিকতাই কি আঘাতের পর্যায়ে নিয়ে গেলো? আর শিক্ষার্থীদের মাঝে মাদকের হানাতো আছেই।

শিক্ষক হত্যার পর অনেকেই বলেছেন হঠাৎ ক্ষেপে গিয়ে এমনটা করে থাকতে পারে। কিন্তু বিষয়টা মোটেও তেমন ছিল না। পূর্ব পরিকল্পিতভাবে আঘাত করে এই শিক্ষার্থী। স্কুলটিতে সরজমিনে গিয়ে জানা যায়, ছোট একটি মাঠে চলছিল মেয়েদের ইনডোর শর্টপিচ ক্রিকেট। আবদ্ধ স্থানে জিতু খুব ভালো করেই জানত পালানো সম্ভব না। তার হয়ত পালানোর তাগাদাটুকুও ছিল না। তারা যে এলাকার স্থানীয়, আছে অর্থবিত্তের সঙ্গে প্রতিপত্তিও। জিতু ‘মেইন সুইচ বন্ধ করে’ বিছিন্ন করে বিদ্যুৎ। যাতে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় হামলা। আর র‌্যাব বলছে, বাড়ি থেকেই স্ট্যাম্প নিয়ে এসেছিল জিতু। আর এলাকায় কিশোর গ্যাং ‘জিতু দাদা’ও ছিল বেশ ভয়ংকর।

জিপিএ-৫ নাকি আদর্শ মানুষ চাই আমরা? তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম দুটাই চাই আমাদের। স্কুল থেকে জিতুর বাড়ি হাঁটা পথে পাঁচ মিনিট। তার কেন দেওয়া হলো মোটরসাইকেল? পরিবারের শাসন কতোটা পেয়েছে জিতু? বাড়ির পাশে প্রকাশ্যে ধুমপান, জানতেন না কি অভিভাবকরা? আর শিক্ষার্থীদের শিক্ষকরা শাসন করবেন এটাই ঘোষিত-অঘোষিত আইন। শিক্ষক তার দায়িত্বটাই পালন করেছেন। একজন দশম শ্রেণি পড়ুয়া শিক্ষার্থী শাসনটা নিতে পারলেন না? শাসনইতো করবেন শিক্ষক। নাকি শুধু টোটকা দেবেন জিপিএ-৫ পাবার?

অনেক প্রবীণ ব্যক্তি প্রায়শই একটা কথা বলে থাকেন— আমরা যখন এলাকায় আমাদের শিক্ষককে দেখতাম, তার আশপাশ দিয়ে হাঁটতাম না। অন্য রাস্তা দিয়ে পালিয়ে যেতাম।

সম্প্রতি একটি ছবি ভাইরাল হয়েছে বেশ। যাতে দেখা যায়, একজন শিক্ষক যাচ্ছেন। আর বিপরীত দিক থেকে সাইকেলে আসছে এক শিক্ষার্থী। শিক্ষককে দেখে ওই শিক্ষার্থী হন্তদন্ত হয়ে নামছে, যা দেখে শিক্ষক বলছেন, আরে থাক থাক পড়ে যাবিতো। এইতো হওয়া উচিত শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক। কিন্তু হলো যে তার উল্টো। স্যার, আপনি আর নেই এই দুনিয়ায়। কিন্তু নিষ্ঠুর এই ঘটনার জন্য মাফ করবেন আমাদের। আমরা আপনাকে যথাযথ সম্মান দিতে ব্যর্থ হয়েছি।

লেখক: স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক মানবজমিন

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন