শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

‘বুঝিবে সে কীসে, দংশেনি যারে’

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২২, ০৮:১৬

দেশে সরকারি প্রকল্প নির্ধারিত সময় শুরু হইয়া যথাসময়ে শেষ হইবার বিশেষ কোনো নজির নাই। প্রায় সকল প্রকল্পের ক্ষেত্রেই দেখা যায়, দফায় দফায় সময় বৃদ্ধি এক অলিখিত নিয়ম হইয়া দাঁড়াইয়াছে। এই বাস্তবতা দেখিয়া সম্প্রতি সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলিয়াছেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছু কিছু বিষয়ে দুঃখ পাই। তার মধ্যে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) একটি বিষয়। প্রকল্প পরিচালক প্রকল্পের জন্য খুবই অপরিহার্য, কিন্তু তাদের আমরা ম্যানেজ করতে পারছি না।’ তিনি আরো বলিয়াছেন যে, তাহাদের জবাবদিহির আওতায় আনিতে যেই নিয়মকানুন রহিয়াছে তাহা কঠোর নহে। এখন সময় আসিয়াছে আইনকানুন সংস্কারের কিন্তু তাহা পারা যাইতেছে না। ইহার পূর্বেও পরিকল্পনামন্ত্রী একাধিকবার উষ্মা প্রকাশ করিয়াছেন প্রকল্পের অনিয়ম, বিলম্ব এবং একাধিক প্রকল্প এক কর্মকর্তার উপর দেখিয়া।

আমরা জানি, প্রকল্প বিলম্বিত হইবার বেশ কিছু সুস্পষ্ট কারণ রহিয়াছে। এই কারণগুলি বা অন্তরায়গুলি চলিয়া আসিতেছে যুগের পর যুগ ধরিয়া। বেশ কয়েকটি কারণের মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণজনিত জটিলতা, ফাইল প্রসেসিং, প্রকল্পের অর্থছাড়ে বিলম্ব, পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না করা, বারংবার পরিচালক পরিবর্তন, দক্ষ ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনবলের অভাব, ডিপিপি তৈরির সময় দ্রব্যের মান ও মূল্য নির্ধারণে অদূরদর্শিতা, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প গ্রহণ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নূতন নূতন অঙ্গ সংযোজন প্রকল্প বিলম্বের প্রধান অন্তরায়। ইহার মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ উল্লেখযোগ্য প্রধান একটি কারণ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, জেলা প্রশাসক অর্থ লইয়া বসিয়া আছেন, কিন্তু জটিলতার জন্য সেই অর্থ ছাড় করিতে পারেন না। আমরা জানি, দেশে মালিকানার প্রমাণ, স্বচ্ছ দলিলের অভাব রহিয়াছে। বিভিন্ন মালিকানা, খতিয়ানসংক্রান্ত এমন সকল জটিল বিষয় রহিয়াছে, যাহা সুরাহা হইতে এক প্রজন্ম পার হইয়া অন্য প্রজন্ম পর্যন্ত গড়ায়। তবে এই ক্ষেত্রে স্হানীয় জনপ্রতিনিধি, গণ্যমাণ্য ব্যক্তি ও স্হানীয় প্রশাসনের সহায়তা লওয়া যাইতে পারে বলিয়া আমাদের মত। ফাইল প্রসেসিংও কম গুরুত্বপূর্ণ নহে। প্রকল্পের ফাইল অসংখ্য শাখা-প্রশাখায় বিচরণ করে। বিভিন্ন হাত ও টেবিল ঘুরিয়া তাহার পর একটি প্রকল্প পাশ হইয়া থাকে। আর এই হাত ঘুরিতে, টেবিল ঘুরিতে যে বিড়ম্বনা তাহা জানে না কে? ইহার পরও দেখিতে হয় প্রকল্পের জন্য যথেষ্ট অর্থ আছে কি না। যাচাই-বাছাই করিয়া ফেরত পাঠানো হয় অধিদপ্তরে। প্রি-একনেকের পর একনেকে যাচাই-বাছাই হয়। আবার প্রকল্প চলাকালে হুটহাট করিয়া প্রকল্পের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বদলি বা পদোন্নতির বিষয়টিও প্রকল্পকে বাধাগ্রস্ত করিয়া থাকে।

আমাদের পরিকল্পনামন্ত্রী অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি। ইহা প্রশ্নাতীত। কিন্তু বাস্তবতা তো, তিনি নিজেও পরিস্হিতি অবগত রহিয়াছেন। বলিতে হয়, এইখানে কোনো কাজ সঠিকভাবে, সঠিক সময়ে, সঠিক পরিকল্পনায় সম্পন্ন হইবে—এই নিশ্চয়তা কাহারো কাছে নাই। ইহা মন্ত্রী মহোদয়ও জানেন। তবু তিনি তার বক্তব্য দেওয়া লিখিয়া গেলেন। এর সমাধান কোথায় রহিয়াছে, কী ধরনের সমাধান রহিয়াছে তাহাও নিশ্চয়ই পরিকল্পনামন্ত্রীর অজানা নহে। কিন্তু করিবার কী আছে? কবির ভাষায় বলিতে হয়, কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কীসে দংশেনি যারে! আমরা জন্মলগ্ন হইতেই শুনিয়া আসিতেছি দুর্নীতির কথা। দুর্নীতির প্রধান বাহন নিহিত থাকে সরকারের মধ্যেই। যদি সরকার দুর্নীতিমুক্ত হইতে পারে, তাহা হইলে ব্যক্তি পর্যায়ে দুর্নীতির কোনো সুযোগই থাকে না। এখন শুধু আমরা ‘এই ধারা ভাঙিতে হইবে’ বলিতে পারি। যাহারা উপঢৌকন নেন, উপঢৌকন দেন তাহারা আমাদের এই যাতনা বুঝিবেন কী করিয়া? তৃতীয় বিশ্বের একজন রাজনীতিবিদ তাহার মৃতু্যর সময় বলিয়াছিলেন, তাহার দেশটিকে আল্লাহ যেন হেফাজত করেন। এখন বাংলাদেশের জন্য একমাত্র আল্লাহর হেফাজত চাওয়া ছাড়া আমাদের আর কী বলিবার আছে?

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন